সেই অবুঝ রাম ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে আজ। বেশ ভয়ে ভয়েই আমি এগোই…বলতে কি।
বুঝে সুঝে পাড়তে হবে কথাটা, বেশ বুঝিয়ে সুঝিয়ে…যা অবুঝ ডাক্তার বাবা।
চেম্বারে ঢুকে দূর থেকেই তাঁকে নমস্কার জানাই।
ডাক্তারবাবু। আপনাকে কল দিতে এসেছি। কিন্তু নিজের জন্য নয়। আমার কোন অসুখ করেনি, কিছু হয়নি আমার। পড়ে যাইনি, ছড়ে যায়নি। আমাকে ধরে আবার ছুঁড়ে টুড়ে দেবেন না যেন সেই সেবারের মতন…।
বলে হর্ষবর্ধন বাবুর কথাটা পাড়লাম।
শুনেই না তিনি, আমাকে তেড়ে এসে ছুঁড়ে না দিলেও এমন তেড়ে খুঁড়ে উঠলেন যে আর বলবার নয়।
নাঃ, ওদের বাড়ি আমি যাব না। প্রাণ থাকতে নয়, এ জন্মে না। ওরা ভারি অভদ্দর
হর্ষবর্ধনবাবু অভদ্র। এমন কথা বলবেন না। ওঁর শত্রুতেও এমন কথা বলে না বলতে পারে ।
অভদ্র না তো কি? বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান করাটা কি দ্ৰতা না কি তাহলে?
আপনাকে বাড়িতে ডেকে এনে অপমান করেছেন উনি? বিশ্বাস হয় না, মশাই। আপনি ভুল বুঝেছেন। আপনি যা অ-বলতে গিয়ে অবুঝ কথাটা আমি চেপে যাই একেবারে।
উনি নিজে না করলেও ওঁর পোষা হাঁসদের দিয়ে করিয়েছেন। সে একই কথা হলো।
হাঁসদের দিয়ে অপমান? আমার বিশ্বাস হয় না।
হা মশাই। মিথ্যে বলছি আপনাকে? আমাকে দেখেই না তার সেই পাজী হাঁসগুলো এমন গালাগালি শুরু করল যে কহতব্য নয়।
হাঁসেরা গাল দিল আপনাকে? আরে মশাই, হাঁসকেই তো লোকে গাল দেয়। আমার বোন পুতুল এমন চমৎকার ডাক-রোস্ট রাধে যে কী বলব। গালে দিলে হাতে স্বর্গ পাই।
সে যাই বলুন, হর্ষবর্ধনবাবুর হাঁসগুলো তেমন উপাদেয় নয়। বিলকুল বিষতুল্য। আমাকে দেখেই না তারা কোয়াক কোয়াক বলে এমন গাল পাড়তে শুরু করল যে– বলতে বলতে তিনি রাঙা হয়ে উঠলেন ও কেন, আমি–আমি কি কোয়াক? আমি কি হাতুড়ে ডাক্তার নাকি? লোকে বললেই হলো?
ও। এই কথা। আমি ওঁকে আশ্বাস দিই? না মশাই না, হাঁসগুলো আপনার কোন গুপ্ত কথা ফাস করেনি, এমনিই ওরা হাঁসফাঁস করছিল। হর্ষবর্ধনবাবুর ওগুলো বিলিতি হাঁস কিনা, তাই ওই রকম ইংরেজী ভাষায় কথা বলে। ইংরেজীতে কোয়াক বলতে যা বোঝায় তা ঠিক ওর অর্থ নয়, বাঙালী হাঁস বলে ওই কথাটার মানে হতো মানে, বঙ্গ ভাষায় ওর অনুবাত করলে হবে, প্যাক, প্যাক।
প্যাঁক প্যাঁক? ঠিক বলছেন? তাহলে আর কোন কথা নেই। চলুন তবে।
বলে তিনি রাজি হলেন যেতে। দাঁড়ান, আমার ব্যাগটা গুছিয়ে নিই আগে এই ব্যাগ নিয়েই হয়েছে আমার যত হাঙ্গামা। এটাকে ব্যাগে নেওয়াই দায়। একেক সময় এমন মুশকিলে পড়তে হয় মশাই–
ব্যাগাড়ম্বর বেশি না করে–আমি বলতে যাই, বাধা দিয়ে তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন ও ব্যাগাড়ম্বর? বৃথা ব্যাগাড়ম্বর করছি আমি?
না না, সে কথা না। বলছিলাম যে—
কি বলছিলেন?
বলছিলাম, একটু ব্যগ্র হবেন দয়া করে। রোগীণীর অবস্থা ভারী কাহিল ছিল কিনা।
ব্যগ্রই হচ্ছি তো। ব্যাগ না হলে কি ব্যগ্র হই? এই ব্যাগের মধ্যেই তো আমার থামোমিটার, স্টেথিস্কোপ, রক্তচাপ মাপার যন্তর, ওষুধপত্তর যাবতীয় কিছু।
বলে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে সব্যাগ হয়ে তিনি সবেগে আমার সাথে বেরিয়ে পড়লেন।
কিন্তু এক কদম না যেতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন একদম। পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে বকতে লাগলেন আমায় :
নাঃ, আমি যাব না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যে আপনার ঐ কোয়াক কোয়াকই হোক আর পেঁক কেই হো, ওই হাঁসরা থাকতে ও বাড়িতে আমি পা দেব না প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। আমার শপথ আমি ভাঙতে পারব না। মাপ করবেন আমায়।
বলে তিনি বেঁকে দাঁড়ালেন।
এবং আর দাঁড়ালেন না। তারপর আর না এঁকে বেঁকে সোজা তিনি এগুলেন নিজের বাড়ির দিকে।
রাম ডাক্তার এমন অবুঝ, সত্যি।
অগত্যা, কী আর করা? সব গিয়ে খোলসা করে বললাম হর্ষবর্ধনকে। বললাম বউকে যদি বাঁচাতে চান তো বিদেয় করে দিন আপনার হাঁসদের। শুনে হর্ষবর্ধন খানিকক্ষণ গুম হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেলেন ।
কাতব কান্তা কস্তে পুত্র। দারা পুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার-এ কে কার?…হাঁস কি আমার? হাঁসের কি আমি? হাঁস কি আমার সঙ্গে যাবে? দুনিয়ায় হাঁস নিয়ে কেউ আসে না, যদিও সবাই হাঁস ফাস করে মরে। হাঁস নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাবো? যাক গে হাঁস। রাখে রাম মারে কে? মারে রাম রাখে কে কার হাঁস কে পোষে। বলতে বলতে তিনি যেন পরমহংসের পরিহাস হয়ে উঠলেনঃ টাকা মাটি, মাটি টাকা যাক গে হাঁস। যেতে দাও। বিস্তর টাকায় কেনা হাঁসগুলো। বহুৎ টাকা মাটি হলো এই যা।
বলে খানিকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে কী যেন ভাবলেন, তারপর ককিয়ে উঠলেন আবার : নাঃ বৌকে আমি হাসপাতালে পাঠাতে পারব না। তার চেয়ে হাঁসগুলোই বরং রসাতলে যাক।
তারপর গিয়ে তিনি পোলট্রির আগল খুলে দিয়ে খেদিয়ে দিলেন হাসদের। পাড়ার ছেলেদের সমবেত উল্লাসের মধ্যে তারা ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে চলে গেল।
হংসবিদায়ের খবরটা চেম্বারে গিয়ে জানাতে তারপরে ব্যাগ হস্তে ব্যগ্র হয়ে বেরুলেন আবার রাম ডাক্তার।
এলেন রাম ডাক্তার।
আসতেই হর্ষবর্ধন তার হাতে ভিজিট হিসেবে করকরে দুখানা একশ টাকার নোট ধরে দিয়ে তাকে নিয়ে গৃহিনীর ঘরে গেলেন। আমরাও গেলাম সাথে সাথে।
কি কষ্ট হচ্ছে আপনার বলুন তো? রোগীণীর শয্যাপার্শ্বে দাঁড়িয়ে শুধালেন রাম ডাক্তার।
