হর্ষবর্ধনের এক আধুনিকা শ্যালিকা একবার বেড়াতে এসেছিলেন ওঁদের বাড়ি একটা বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে।
ফুটফুটে ছেলেটিকে দেখে কোলে করে একটু আদর করার জন্য নিয়েছিলাম, তারপরে দাঁত গজিয়েছে কিনা দেখবার জন্যে যেই না ওর মুখের মধ্যে আঙুল দিয়েছি উফ। লাফিয়ে উঠতে হয়েছে আমায়।
কি হলো কি হলো? ব্যস্ত হয়ে উঠলেন হর্ষবর্ধনের বউ।
কিছু হয়নি। আমি বললাম : একটু দন্তস্ফুট হল মাত্র। হাতে হাতে দাঁত দেখিয়েছে ছেলেটা।
ছেলের মুখে আঙুল দিলেন যে বড়? রাগ করলেন হর্ষবর্ধনের শালী ও আঙুলটা আপনার অ্যান্টিসেপটিক করে নিয়েছিলেন?
অ্যান্টিসেপকি? ও কথাটায় অবাক হই। সে আবার কি?
লেখক নাকি আপনি? হাইজীনের জ্ঞান নেই আপনার? বলে একখানা টেকসট বই এনে আমার নাকের সামনে তিনি খাড়া করেন। তারপরে আমি চোখ দিচ্ছি না দেখে খানিকটা তার তিনি নিজেই আমায় পড়ে শোনান :
শিশুদের মুখে কোন খাদ্য দেবার আগে সেটা গরম জলে ফুটিয়ে নিতে হবে…
আঙুল কি একটা খাদ্য না কি? বাধা দিয়ে মুধান হর্ষবর্ধন পত্নী।
একদম অখাদ্য। অন্ততঃ পরের আঙুল তো বটেই। গোবরভায়া মখু গোমড়া করে বলে?
নিজের আঙুল কেউ কেউ খায় বটে দেখেছি, কিন্তু পরের আঙুল খেতে কখনো কাউকে দেখা যায় নি।
আঙুল আমি ফুটিয়ে নিইনি সে কথা ঠিক, আমতা আমতা করে আমরা সাফাই গাই : তবে আপনার ছেলেই আঙুলটা আমায় ফুটিয়ে নিয়েছে। কিম্বা ফুটিয়ে দিয়েছে…যাই বলুন। এই দেখুন না।
বলে খোকার দাঁত বসানোর দগদমে দাগ তার মাকে দেখাই। ফুটফুটে বলে কোলে নিয়েছিলাম কিন্তু এতটাই যে ফুটবে তা আমার ধারণা ছিল না সত্যি।
রাম ডাক্তারকে আনবার ব্যবস্থা করুন তাহলে। বললাম হর্ষবর্ধন বাবুকে?
কল দিন তাঁকে এক্ষুনি। ডাকান কাউকে পাঠিয়ে।
ডাকলে কি তিনি আসবেন? তাঁর সংশয় দেখা যায়।
সে কি। বল পেলেই শুনেছি ডাক্তাররা বিকল হয়ে পড়ে না এসে পারে কখনো? উপযুক্ত ফী দিলে কোন ডাক্তার আসে না? কী যে বলেন আপনি।
ডেকেছিলাম একবার। এসেও ছিলেন তিনি। কিন্তু জানেন তো, আমার হাঁস মুর্গি পোর বাতিক। বাড়ির পেছনে ফাঁকা জায়গাটায় আমার কাঠ চেরাই কারখানার পাশেই পোলট্রির মতন একটুখানি করেছি। তা হাঁসগুলো আমার এমন বেয়াড়া যে বাড়ির সামনেও এসে পড়ে এক এক সময়। রাম ডাক্তারকে দেখেই না সেদিন তারা এমন হাঁক ডাক লাগিয়ে দিল যে….
ডাক্তারকেই ডাকছিল বুঝি?
কে জানে। তাদের আবার ডাক্তার ডাকার দরকর কি মশাই? তারা কি চিকিচ্চের কিছু বোঝে? মনে তো হয় না। হয়ত তার বিরাট ব্যাগ দেখেই ভয় খেয়ে ডাকাডাকি লাগিয়েছিল তারা, কিন্তু হাঁসদের সেই ডাক শুনেই না, গেট থেকেই ডাক্তারবাবু বিদায় নিলেন, বাড়ির ভেতরে এলেনই না আর। রেগে টং হয়ে চলে গেলেন একেবারে।
বলেন কি? শুনে আমি অবাক হই।
হ্যাঁ মশাই। তারপর আরো কতবার তাঁকে কল দেয়া হয়েছে মোটা ফীয়ের লোভ দেখিয়েছি। কিন্তু এ বাড়ির ছায়া মাড়াতেও তিনি নারাজ।
আশ্চর্য তো। কিন্তু এ পাড়ায় ভাল ডাক্তার বলতে তো উনিই। রাম ডাক্তার ছাড়া তো কেউ নেই এখানে আর…
দেখুন, যদি বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোনো রকমে আপনি আপতে পারেন তাঁকে… হর্ষবর্ধন আমার অনুনয় করেন।
দেখি চেষ্টা চরিত্র করে, বলে আমি রাম ডাক্তারের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সত্যি একেকটা ডাক্তার এমন অবুঝ হয়। এই রাম ডাক্তারের কথাই ধরা যাক না।
সেবার পড়ে গিয়ে বিনির একটু ছড়ে যেতেই বাড়িতে এসে দেখবার জন্যে তাঁকে ডাকতে গেছি, কিন্তু যেই না বলছি, ডাক্তারবাবু, পড়ে গিয়ে ছড়ে গেছে যদি এসে একটু দয়া করে…
ছড়ে গেছে? রক্ত পড়ছে?
তা একটু রক্তপাত হয়েছে বই কি।
সর্বনাশ। এই কলকাতা শহরে পড়ে গিয়ে ছড়ে যাওয়া আর রক্তপাত হওয়া ভারি ভয়ংকর কথা, দেখি তো…
বলেই তিনি তার ডাক্তারি ব্যাগের ভেতরে থেকে থার্মেমিটারটা বার করে আমার মুখের মধ্যে গুঁজে দিলেন।
এবার শুয়ে পুড়ন তো চট করে। বলে আমার একটি কথাও আর কইতে না দিয়ে ঘাড় ধরে শুইয়ে দিলেন তার টেবিলের ওপরে।
শুয়ে পড়ুন। শুয়ে পড়ুন চট করে। আর একটি কথাও নয়।
মুখগহ্বরে থার্মোমিটার নিয়ে কথা বলব তার উপায় কি। প্রতিবাদ করার যো-ই পেলাম না। আর তিনি সেই ফাঁকে পেল্লায় একটা সিরিঞ্জ দিয়ে একখানা ইনজেকশন ঠুকে দিলেন আমায়।
ব্যাস। আর কোন ভয় নেই। অ্যানটি টিটেনাস ইনজেকশন দিয়ে দিলাম। ধনুষ্টঙ্কারের ভয় রইল না আর। বলে আমার মুখের থেকে থার্মোমিটার বার করলেন, করে দেখে বললেন জ্বরটরও হয়নি তো। নাঃ। ভয় নেই কোন আর। বেঁটে গেলেন এ যাত্রা।
মুখ ভোলা পেতে তখন আমি বলবার ফুরসত পেলাম–ডাক্তারবাবু; আমার তো কিছু হয়নি। আমি পড়ে যাইনি, ছড়ে যায়নি আমার। আমার বোন বিনিই পড়ে গিয়ে ছড়ে গেছে। কথাটা আপনি না বুঝেই…
ওঃ তাই নাকি? তা বলতে হয় আগে। যাক, যা হবার হয়ে গেছে। চলুন তাকেও একটা ইনজেকশন দিয়ে আসি তাহলে। ছড়ে যাবার পর ডেটল দেওয়া হয়েছিল? ডেটল কি আইডিন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তবে তো হয়েইছে। তবু চলুন, ইনজেকশনটা দিয়ে আসি গে। সাবধানের মার নেই, বলে কথায়।
বিবেচনা করে বিনির ইনজেকেশনের বিনিময়ে তিনি আর কিছু নিলেন না, আমারটার দাম দিতে হলো অবিশ্যি। প্লাস তার কলের দরুণ ভিজিট।
