অবশেষে একদিন এক কাণ্ড হয়ে গেল। ক্ষুধাতুর রামভরত থাকতে না পেরে বাগানের এক কাঁদি মর্তমান কলা চুরি করে খেয়ে বসল। শ্যামভরত ভাইকে বারণ করেছিল কিন্তু ফল হয়নি। তখন থেকে শ্যামভরতের মনে বিবেকের দংশন শুরু হয়ে গেছে।
কর্তা তাকে পাহারা দেবার কাজে বহাল করেছেন। চুরি-চামারি যাতে না হয়, তা-ই দেখাই তো তার কর্তব্য। কিন্তু এ চুরি যে কেবল তার চোখের সামনেই হয়েছে তা নয়, সে একে বাধা দেয়নি, দিতে পারেনি; এমন কি একরকম প্রশ্রয়ই দিয়েছে বলতে গেলে। তার কি, এতে কর্তব্যের ক্রটি হয়নি? এ কি বিশ্বাসঘাতকতা নয়? কে বড়? ভাই, না বর্তমান কলা?
অবশেষে আর থাকতে না পেরে, শ্যামভরত চুরির কথাটা কর্তার কাছে বলেছে। কর্তা হুকুম দিয়েছেন–চোরকে পাকড় লেয়াও।
চোর পাকড়ানো অবস্থাতেই ছিল, সুতরাং তাকে ধরতে বেশি বেগ পেতে হয়নি। কর্তা তৎক্ষণাৎ রামভরতকে শ্যামভরতের সাহায্যে থানায় ধরে নিয়ে পুলিশের হাতে সমর্পণ করেছেন।
সাতদিনে ধরে বারাসতের আদালতে এই চুরির বিচার চলেছিল। রামভরত আসামী, শ্যামভরত সাক্ষী। রামভরত আসামীর কাঠগড়ায়, তার হাতে হাতকড়া–শ্যামভরত ভায়ের কাছে দাঁড়িয়ে। আবার শ্যামভরত যখন জবানবন্দী দেয় তখন রামভরতকে ভায়ের সঙ্গে সাক্ষীর কাঠগড়ায় আসতে হয়।
অবশেষে রামভরতের একমাস জেলের হুকুম দিলেন হাকিম। রামভরতকে জেলে নিয়ে গেল, কিন্তু শ্যামভরতকেও সেই সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। অথচ শ্যামভরতের জেল হয়নি। মহা মুশকিল ব্যাপার। নির্দোষের অকারণ সাজা হতে পারে না। অগত্যা রামভারতকে জেল থেকে খালাস দিতে হল।
খালাস পাওয়া মাত্র রামভরত বলা নেই কাওয়া নেই, ভাইকে ঠ্যাঙাতে শুরু করে দেয়। তাদের জীবনে প্রথম ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব। শ্যাম রামকে ঘুসি মেরে ফেলে দেয় সঙ্গে সঙ্গে নিজেও গিয়ে পড়ে তার ঘাড়ে, তারপর দুজনে জোড়াজড়ি, হুটোপাটি, তুমুল কাণ্ড।
রাস্তার লোকেরা মাঝে পড়ে বাধা দেয়। দুজনকে আলাদা করবার চেষ্টা করে। কিন্তু আলাদা করতে পারে না। অল্পক্ষণেই বুঝতে পারে,দুজনকে তফাৎ করা তাদের ক্ষমতার অসাধ্য। কাজেই তাদের ছেড়ে দেয় পরস্পরের হাতে। তারাও মনের সুখে মারামারি করে। অবশেষে দুজনেই জখম হয়, তখন দুজনকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়–একই স্ট্রেচারে।
হাসপাতাল থেকে ক্ষতস্থান ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দেবার পর দুজনে বেরিয়ে আসে। পাশাপাশি চলে, কিন্তু কেউ একটি কথা বলে না। রামভরত গুরুগম্ভীর, শ্যামভরত ভারি বিষণ্ণ। রামভরত আস্তে হাঁটে, মাঝে-মাঝে কপালের ঘাম মোছে। শ্যামভরত থেকে-থেকে ঘাড় চুলকোয়। সেই ফাঁকে আড়চোখে ভায়ের মুখের ভাব লক্ষ্য করার চেষ্টা করে।
দু-ভাই চুপ-চাপ হেঁটে চলে।
অবশেষে রামভরত আফিমের দোকানের সামনে এসে পৌঁছয়। একটা টাকা ফেলে দেয় দোকানে। এক ভারি আফিম কেনে, কিনেই মুখে পুরে দেয় তৎক্ষণাৎ।
শ্যামভরত ব্যস্ত হয়ে ওঠে, রামভরত কিন্তু উদাসীন। শ্যামত মাথা চাপড়ায়, রামভরত এক ঘটি জল খায়। শ্যামভরত চায় ভাইকে নিয়ে তখুনি আবার হাসপাতালের দিকে ছুটতে। রামভরত কিন্তু দেওয়াল ঠেস দিয়ে একটা খাঁটিয়ায় বসে পড়ে। শ্যামভরত তখন কেঁদে ফেলে–একী করলি ভাইয়া।
রামভরত ভারী গলায় জবাব দেয়–কলা খেলে আফিম খেতে হয়।
আচ্ছা এবার তুই যত খুশি কলা খাস, আমি আর বলব না। শ্যামভরত লুটিয়ে পড়তে চায় মাটিতে।
রামভরত গম্ভীর হয়ে ওঠে–আফিম খেলে আর কলা খেতে হয় না।
এই কথা বলে সে খাঁটিয়ার ওপর সটান হয়। দেখতে দেখতে রামভরত মারা যায়।
আর শ্যামভরত?
শ্যামভরতকে যেতে হয়ে সহমরণে।
ডাক্তার ডাকলেন হর্ষবর্ধন
বউয়ের ভারী অসুখ মশাই। কোন ডাক্তারকে ডাকা যায় বলুন তো? হর্ষবর্ধন এসে শুধোলেন আমায়।
কেন, আমাদের রাম ডাক্তারকে? বললাম আমি। তারপর তাঁর ভারী ফিজ –এর কথা ভেবে নিয়ে বলি আবার : রাম ডাক্তারকে আনার ব্যয় অনেক, কিন্তু ব্যায়রাম সারাতে তাঁর মতন আর হয় na।
বলে বৌয়ের আমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি, আমি কি এখন টাকার ভাবছি নাকি। তিনি জানান- বউয়ের আমার আরাম হওয়া নিয়ে কথা।
কি হয়েছে তার? আমি জানতে চাই।
কী যে হয়েছে তাই তো বোঝা যাচ্ছে না সঠিক। এই বলছে মাথা ধরেছে, এই বলছে দাঁত কনকন, এই বলছে পেট কামড়াচ্ছে…..
এসব তো ছেলেপিলের অসুখ, ইস্কুলে যাবার সময় হয়। আমি বলি–তবে মেয়েদের পেটের খবর কে রাখে। বলতে পারে কেউ?
বউদির পেটে কিছু হয়নি তো দাদা। জিজ্ঞেস করে গোবরা। দাদার সাথে সাথেই সে এসেছিল।
পেটে আবার কি হবে শুনি? ভায়ের প্রশ্নে দাদা কুঞ্চিত করেন : পেটে তো লিভার পিলে হয়ে থাকে। তুই কি লিভার পিলের ব্যামো হয়েছে, তাই বলছিস?
আমি ছেলেপিলের কথা বলছিলাম।
ছেলেপিলে হওয়াটা কি একটা ব্যামো নাকি আবার?
হর্ষবর্ধন ভায়ের কথায় আরো বেশি খাপপা হন : সে হওয়া তো ভাগ্যের কথা রে। তেমন ভাগ্য কি আমাদের হবে? বলে তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন।
হতে পারে মশাই। গোবরা ভায়া ঠিক আন্দাজ করেছে হয়ত। ওর সমর্থনে দাঁড়াই : পেটে ছেলে হলে শুনেছি অমনটাই নাকি হয় মাথা ধরে, গা বামি করে, পেট কমড়ায়…ছেলেটাই কামড়ায় কি না কে জানে।
ছেলের কামড়ের কথায় কথাটা মনে পড়ে গেল আমার…
