রামলক্ষ্মণ সেদিন স্পট্টই বলে দিলেন–না তোরা আর মানুষ হবি না। যা, তবে ইস্কুলেই যা তাহলে।
ইস্কুলে গিয়ে দু-ভায়ের অবস্থা আরো সঙ্গীন হল। একসঙ্গে ইস্কুলে যায়, ইস্কুল থেকে আসে। কিন্তু সেকথা বলছি না। মুশকিল হল এই, এক ভাই লেট করলে আরেক ভায়ের লেট হয়ে যায়। সেই অপরাধের সাজা দিতে এক ভাইকে কনফাইন করলে আরেক ভাই তাকে ফেলে বাড়ি চলে আসতে পারে না, তাকেও আটকে থাকতে হয়। বিনা দোষেই। একজন যদি পড়া না পারে এবং তাকে মাষ্টারমশাই বেঞ্চির ওপর দাঁড় করিয়ে দেন, তখন অন্য ভাইকে নিখুঁত ভাবে পড়া দেওয়া সত্ত্বেও, সেইসঙ্গে বেঞ্চে দাঁড়াতে হয়। সবচেয়ে হাঙ্গামা বাধল সেইদিন যেদিন দুজনের কেউই পড়া পারল না আর মাষ্টার বললেন একজনকে বেঞ্চে দাঁড়াতে, আরেকজনকে মেঝেতে নিলডাউন হতে। মাষ্টারের হুকুম পালন করতে দুজনেই প্রাণপণ চেষ্টা করল খনিকক্ষণ। কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। ধুত্তোর বলে সেইদিন তারা ইস্কুল ছাড়ল–ও মুখোই হল না আর।
বাড়িতে বাবাকে এসে বলল–মানুষ হবার তো আশা ছিলই না, তুমিই বলে দিয়েছ! অমানুষ হবার চেষ্টা করলাম, তাও পারা গেল না।
শ্যামভরত ভায়ের কথায় সায় দিয়েছে–অমানুষিক কাণ্ড আমাদের দ্বারা হবার নয়। নিলডাউন আর বেঞ্চে দাঁড়ানো। দুটো একসঙ্গে আবার।
তারপর থেকে রামলক্ষ্মণ ছেলেদের আশা একেবারেই ছেড়েছেন।
ওরা যখন যুবক হয়ে উঠল তখন ওদের মধ্যে এক-একটু গরমিলের সূত্রপাত দেখা গেল। রামভরত ভোরের দিকটায় ঘুমাতেই ভালবাসে। তার মতে সকালবেলায় ঘুমটাই হচ্ছে সবচেয়ে উপাদেয়। কিন্তু শ্যামভরতের সেই সময়ে প্রাতভ্রমণ না করলেই নয়। ভোরের হাওয়ায় নাকি গায়ের জোর বাড়ে। বাধ্য হয়ে আধ-ঘুমন্ত রামভরতকে ভায়ের সঙ্গে বেরুতে হয়।
মাইল-পাঁচেক হেঁটে হাওয়া খেয়ে শ্যামভরত ফেরে, ক্লান্ত রামভরত তখন শুতে পারলে বাঁচে। ঘুমোতে ঘুমোতে ভায়ের সঙ্গে বেরিয়েছে সেই কখন, আর দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরল এই এখন এরকম অবস্থায় কার না পা জড়িয়ে আসে, কে না গড়াতে চায়? কিন্তু শ্যামভরত তখন-তখনই আদা ছোলা চিবিয়ে ডনবৈঠক করতে লাগবে–কাজেই রামভরতের আর গড়ানো হয় না, ভাইয়ের সঙ্গে ওঠবোস করতে হয়।
ব্যায়াম সেরেই শ্যামভরত স্নান সারবে। রামভরত বিছানার দিকে করুণ দৃষ্টিপাত করে তেল মাখতে বসে–কী করবে? স্নান সেরেই শ্যামভরতের রুটির থালার সামনে বসা চাই–সমস্ত রুটিন বাঁধা। ব্যায়াম করেছে, ভোরে হেঁটেছে, তার চো চো খিদে। বেচারা রামভরতের রাত্রে ঘুম হয়নি, ভোরেও তাকে জাগতে হয়েছে, দারুণ হাঁটাহাঁটি। তারপর ফিরে এসেই এক মুহূর্ত পায়নি–গরহজম হয়ে এখন তার চোঁয়া ঢেকুর উঠছে।
সে বলেছে–এখন খিদে নেই, পরে খাবো।
ভাই ঝাঁ ঝাঁ করে উঠেছে–পরে আবার খাবি কখন? পরে আমার আবার কখন সময় হবে? আমার কি আর? অন্য কাজ নেই?
সে জবাব দিয়েছে–আমার খিদে নেই এখন।
শ্যামভরত চটে গেছে–খিদে নেই, কেবল খিদে নেই! কেন যে খিদে হয় না আমি তো বুঝি না। কেন, তুমিও তো ব্যায়াম করেছ বাপু! তবে? খিদেয় আমি মরে যাচ্ছি, আর তোমার খিদে নেই–এ কেমন কথা?
কাজেই রামভরতকে গরহজমের ওপরেই আবার গলাধঃকরণ করতে হয়েছে।
খাওয়া-দাওয়া সেরে, প্রথম সুযোগেই ভাইকে বিছানার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। এবার একটু শুলে হয় না?
শোয়া আর শোয়া! দিনরাত কেবল শোয়া! কী বিছানাই চিনেছ বাবা!–শ্যামভরত গম্ভীরভাবেই ছিপ হাতে নেয়।
এই দুপুর রোদে দারুণ গরমে তুমি মাছ ধরতে যাবে?–রামভরত ভীত হয়ে ওঠে।
যাবই তো।–শ্যামভরত বলে–কেবল শুয়ে শুয়ে হাড় ঝরঝরে হবার জোগাড় হল। তোমার ইচ্ছে হয় তুমি পড়ে ঘুমোও, আমি মাছ ধরতে চললুম।
শ্যামভরতের গায়ে জোর বেশি, টানও প্রবল। কাজেই কিছু পরেই দেখা যায়, শ্যামভরত মাছ ধরতে আর রামভরতকে তার কাছে চুপটি করে বসে থাকতে হয়েছে।
বেলা গড়িয়ে আসছে, এক ভাই মাছ ধরে, আরেক ভাই পাশে বসে ঢুলতে থাকে।
এইভাবে দু-ভাই ক্রমশ আরো বড় হয়ে ওঠে।
একদা বাপ রামলক্ষ্মণ বললেন–বড় হয়েছিস, এবার একটা কাজকর্মের চেষ্টা দ্যাখ। বসে বসে খাওয়া কি ভাল?
বসে বসে, দাঁড়িয়ে, শুয়ে কিম্বা দৌড়তে দৌড়তে কী ভাবে খাওয়াটা সবচেয়ে ভাল সে সম্বন্ধে জোড়া ভরত কোনদিন ভাবেনি,কাজেই অনিচ্ছাসত্ত্বে বাপের কথা মেনে নিয়েই চাকরির খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
গাট্টা-গোট্টা চেহারা দেখে একজন ভদ্রলোক শ্যামভরতকে দারোয়ানির কাজে বহাল করলেন। কিন্তু রামভরতকে কাজ দিতে তিনি নারাজ। শ্যামভরত দিনরাতক পাহারা দেয়, রামভরতও ভায়ের সঙ্গে গেটে বসে থাকে।
ভদ্রলোক শ্যামভরতের খোরাকি দেন। রামভরতকে কেন দেবেন? রামভরত তো তার কোনো কাজ করে না। সে যে গায়ে পড়ে, উপরন্তু তাঁর বাড়ি পাহারা দিয়ে দারোয়ানির কাজে বিনে-পয়সায় অমনি পোক্ত হয়ে যাচ্ছে তার জন্যে যে তিনি কিছু চার্জ করেন না এই যথেষ্ট।
তিন দিন না খেয়ে থেকে রামভরত মরিয়া হয়ে উঠল, বললে–আমি তাহলে গাড়োয়ানিই করব।
এই না বলে গরুর গাড়ির একজন গাড়োয়ানের সঙ্গে, কেবল খাওয়া- পরার চুক্তিতে অ্যাপ্রেনটিস্ট নিযুক্ত হয়ে গেল।
এরপর রামভরত গাড়োয়ানি করতে যায়। শ্যামভরতকেও ভায়ের সঙ্গে যেতে হয়। উক্ত সদর দ্বারা বিনা রক্ষণাবেক্ষণে পড়ে থাকে। কোনদিন বা শ্যামভরত দরজা কামড়ে পড়ে থাকে সেদিন আর রামভরতের গাড়োয়ানিতে যাওয়া হয় না।
