ডুকরে উঠল মনের থেকে ধন্যবাদ বিধাতার উদ্দেশ্যে ইস্টিমারের উদ্দেশ্যে আমার নিজের উদ্দেশ্যে মুখর হয়ে ডেকের উপর নিজেকে রেখে হাঁপাতে থাকলাম।
নাঃ, আর না–আর ককখনো না। কদাপি আর এমন বিপজ্জনক কাজে হাত দেবো না–হাত পা কোনাটাই নয়। শপথ করি নিজের মনে। মা দুর্গার দয়ায় বড্ডো বেঁচে গেছি এ-যাত্রা।
হুঁশ হতে দেখলাম, এক-জোড়া চোখ আমার দিকে তাকিয়ে।
নীল পোশাকে এক খালাসী।
ঈস! ইস্টিমার–ধরা কি চাট্টিখানি? হাঁপ ছেড়ে আমি বলি কিন্তু ধরতে পেরেছি শেষ পর্যন্ত। কি বল খালাসী সায়েব?
খালাসীটা হাসল-–কি দরকার ছিল বাবু এত মেহনতের? জাহাজ তো আমরা ভেড়াচ্ছিলাম জেটিতেই। খানিক পরে এমনি আসতেন–হেঁটেই আসতেন সোজা। সবুর করলেই পারতেন একটু।
অ্যাঁ? তাই নাকি? তখন আমার খেয়াল হলো। হ্যাঁ, তাও হতে পারে। পাটাতন তুলছিল না, নামাচ্ছিলই খালাসীরা। নামিয়ে জেটির গায়ে লাগানো হচ্ছিল–বুঝতে পারলাম তখন।
তাকিয়ে দেখলামও তাই। গোদাগাড়ির সোরগোল করে লালগোলার জেটির কোলে এসে ভিড়েছে। জ্যেঠতুতো সম্পর্কের আত্মীয়তা সুনিবিড় হয়েছে এতক্ষণে।
ওপারে যাত্রীদের নিয়ে ইস্টিমারটা এসে পৌঁছল সেই মাত্তর!
জোড়া ভরতের জীবন কাহিনী
বেশ কিছুদিন আগের কথা। গত শতাব্দীর শেষের দিকে, তখন তোমরা আসোনি পৃথিবীতে। আমিও আসব কিনা তখনো আন্দাজ করে উঠতে পারছিলাম না। সেই সময়ে বারাসতে এই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটেছিল। অবশ্য তারপর আমিও এসেছি, তোমারাও এসেছ। আমি আসার কিছুদিন পরেই দিদিমার কাছে গল্পটি শুনি। তোমাদের দিদিমারা নিশ্চয়ই বারাসতের নন, কাজেই তোমাদের শোনাবার ভার আমাকে নিতে হল।
সেই সময় একদা সুপ্রভাতে বারাসতে রামলক্ষ্মণ ওঝার বাড়িতে যমজ ছেলে জন্মালো। যমজ কিন্তু আলাদা নয়–পেটের কাছটায় মাংসের যোজক দিয়ে আশ্চর্য রকমে জোড়া। সেই অদ্ভুত লক্ষণ রামলক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেন, তারপর গম্ভীরভাবে বললেন–আমার বরাতের জোর বলতে হবে। লোকে একেবারে ছেলেই পায় না, আমি পেলাম দু-দুটো–একসঙ্গে এবং একাধারে।
ডাক্তার এসে বলেছিল–কেটে আলাদা করার চেষ্টা করতে পারি কিন্তু তাতে বাঁচবে কিনা বলা যায় না।
রামলক্ষ্মণ বললেন–উঁহু-হুঁ! যেমন আছে তাই ভাল। ভগবান দিয়েছেন, কপালের জোরে ওরা বেঁচে থাকবে।
ছেলেদের নাম দিলেন তিনি রামভরত ও শ্যামভরত।
পৌরাণিক যুগে জড়ভরত ছিল, তার বহুকাল পরে কলিযুগে এই বিস্ময়কর আবির্ভাব জোড়াভরত।
জোড়াভরত প্রতিদিনই জোরালো হয়ে উঠতে লাগল। ক্রমশ হামাগুড়ি দিতেও শুরু করল। চার হাতের চার পায়ের সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। কে একজন যেন মুখ বেঁকিয়েছিল–ছেলে না তো, চতুস্পদ! রামলক্ষ্মন তৎক্ষণাৎ তার প্রতিবাদ করেছেন–চতুর্ভুজও বলতে পার।সাক্ষাৎ ভগবান! সকালে উঠেই মুখ দেখি, মন্দ কি! তারপর পুনশ্চ জোড় দিয়েছেন–হ্যাঁ, নেহাত মন্দ কি?
ক্রমশ তারা বড় হল। ভায়ে-ভায়ে এমন মিল কদাচ দেখা যায় না। পরস্পরের প্রতি প্রাণের টান তাদের এত প্রবল ছিল যে কেউ কাউকে ছেড়ে একদণ্ডও থাকতে পরে না। তাদের এই অন্তরঙ্গতা যে-কেউ লক্ষ্য করেছে সেই ভবিষয়দবাণী করেছে যে, এদের ঘনিষ্ঠতা বরাবর, থাকবে, এদের ভালবাসা চিরদিনের। সকলেই বলেছে যে, ভাই ভাই ঠাই ঠাই একটা প্রবাদ আছে বটে, কিন্তু যে রকম ভাবগতিক দেখা যাচ্ছে তাতে এদের দু-ভাইয়ের মধ্যে কখনো ছাড়াছাড়ি হবে, দুঃস্বপ্নেও এমন আশঙ্কা করা যায় না। এদের আত্মীয়তা কোনেদিন যাবার নয়, নাঃ বাঙলা দেশে আদর্শ ভ্রাতৃত্বের জন্যে মেডেল দেবার ব্যবস্থা সে সময়ে থাকলে সে মেডেল যে ওদেরই কুক্ষিগত হত একথা অকুতোভয়ে বলা যায়।
দু ভায়ে একসঙ্গেই খেলা করত, একসঙ্গে বেড়াত, একসঙ্গে খেত, আঁচাত এবং ঘুমোত অন্য সব লোকের সঙ্গ তারা একেবারেই পছন্দ করত না। সব সময়েই তারা কাছাকাছি থাকত, একজনকে ছেড়ে আরেকজন খুব বেশি দূরে যেত না। রামলক্ষ্মণের গিন্নি তাদের এই সুগুণের কথা জানতেন, এই কারণে যদি কখনো কেউ হারিয়ে যেত, স্বভাবতই তিনি অন্যজনের খোঁজ করতেন। তাঁর অটল বিশ্বাস ছিল যে একজনকে যদি খুঁজে পান তাহলে আরেকজনকে অতি সন্নিকটেই পাবেন। এবং দেখা গেছে তার ভুল হত না।
আরও বড় হলে রামলক্ষ্মণ ওদের গরু দুইবার ভার দিলেন। রামলক্ষ্মণের খাটাল ছিল। সেই খাটালে গরুরা বসবাস করত, তাদের দুধ বেচে ওঝা মহাশয়ের জীবিকা নির্বাহ হত। রামভরত গরু দুইত, শ্যামভরত তার পাশে দাঁড়িয়ে বাছুর সামলাতে–কিন্তু সবদিন সুবিধে হয়ে উঠত না। এক একদিন দুরন্ত বাছুরটা অকারণ পুলকে লাফাতে শুরু করত। শ্যামভরতকেও তার সঙ্গে লাফাতে হত, তখন রামভরতের না লাফিয়ে পরিত্রাণ ছিল না। রামভরতের হাতে দুধের বালতিও লাফাতে ছাড়ত না এবং দুধের অধঃপতন দেখে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে রামলক্ষ্মণ স্বয়ং লাফাতেন।
এত লাফালাফি সহ্য করতে না পেরে রামলক্ষ্মণের গিন্নি একদিন বলেই ফেললেন–দুধের বাছা, ওরা কি দুধ দুইতে পারে?
রামলক্ষ্মণ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন–নাঃ, কিছু হবে না ওদের দিয়ে। ইস্কুলেই দেব, হ্যাঁ।
ইস্কুলের নামে দু-ভায়ের মুখ শুকিয়ে একটুকু হয়ে গেল।
একদিন তো বাছুরটা শ্যামভরতকে টেনে নিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল। রামভরতকে তখন দুধ দোয়া স্থগিত রেখে, অগত্যা বাছুর এবং ভায়ের সঙ্গে দৌড়তে হল।
