তা তো আছে। কিন্তু তাই বলে হাতির মতন এমন কিছু লম্বা নাক নয় যে ইচ্ছে করলেই আমি শুঁড় খেলাতে পারবো? কিন্তু কথাটা আর মুখ খুলে বলার দুশ্চেষ্টা করি নে। মনে মনেই বলে বিমুখ হয়ে দিদির কাছে চলে যাই।
দিদি তখন ডেকের মেয়েলী এলাকায় রেলিঙের ধার ঘেষে পদ্মার শোভা দেখছিলেন। ইস্টিমারের দাঁত কেমন ঢেউ কেটে চলেছে, দেখছিলেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। দেখতে-দেখতে–
দেখতে না দেখতে তক্ষুণি আবার ছুটে আসতে হয়েছে তার বরের–সেই বর্বরের কাছেই আবার।
দি-দি-দি-দি-দি-দি…।
দিদির কথাটা ভাল করে বলতেই তার বাগড়া এল।–না, কিছু তোমার দিতে হবে না কিছু আমার চাইনে।
দি-দিচ্ছেনে তো–বলছি কি যে, তো-তো-তো-তো-তো।
অবার তোতলাতে লেগেছো? কি বললাম একটু আগে?
যা বললাম গান করে বলতে বলিনি? তিনি বেঁকিয়ে উঠলেন।
বলো, গান গেয়ে বলো! প্রাণ খুলে গাও, গান খুলে বাতলাও। আমি কান খুলে শুনি! শুনে আমার জন্ম সার্থক করি।
তখন বাধ্য হয়ে আমায় বাল্মীকি হতে হয়। তিনি যেমন ক্রৌঞ্চ বিরহে কাতর হয়ে তাঁর প্রথম শ্লোক ঝেড়েছিলেন, আমিও তেমনি মুখে-মুখে আমার গান বাঁধি–মনের দুঃখে :
ইস্টিমারে চেন থাকে না বলছিলে না মশায়,
কিন্তু থাকলে ভাল হতো এখন এরূপ দশায়।
বাঃ বাঃ বেশ! এই তো! এই তো খাসা বেরুচ্ছে। তিনি বাহবা দেন, বেশ সুরেলা হয়েই বেরুচ্ছে তো! তোফা!
ভগ্নকণ্ঠে আবার আমায় সুর নাড়তে হয়?
আমার দিদি, তোমার বৌ গো–
বলতে ব্যথা লাগে!
মরি হায় রে—
মরি হায় রে! মরে যাই–মরে যাই! বড়-বড় ওস্তাদের মতোই টিটকিরি মারতে শিখেছো দেখছি? তিনি টিটকিরি মারেন।
কিন্তু ওস্তাদি কাকে বলে জানি না, আমার গানের সুরগুলি নাকের থেকে- gun থেকে গুলির মতই শেষ পর্যন্ত না দেখে থামা যায় না–
মরি হায় রে!…
তোমার যে বৌ–আমার যে বোন–
বলতে বেদন জাগে।
জলে পড়ে গেছেন তিনি
মাইল তিনেক দূরে
মরি হায় হায় রে!!!
দুঃস্বপ্ন ভাঙতেই খাঁটিয়া ছেড়ে লাফিয়ে উঠেছি। কখন সকাল হলো? ইস, বড্ডো বেলা হয়ে গেছে যে! ইস্টিমার ধরতে পারলে হয় এখন!
সুটকেসটা তুলে নিয়েই ছুটলাম। পথে নামতেই সেই সদালাপী মেঠাইওয়ালা সামনে এল–আরে বাবু! জাহাজ ছোড়তে আবি বহু দেরি! জাহাজ আখুনো আসেই নাই! গরমাগরম পুরী ভাজিয়েছে–খাইয়ে যান!
তোমার পুরী আমার মাথায় থাক! বলে আমি মাথা নাড়ি : তোমার আর কি? তুমি খাইয়ে যাও, আর আমি খুইয়ে যাই! কালকেও তুমি ঐ কথাই বলেছিলে। ঐ বলে সারারাত তোমার ছারপোকা আর মশার কামড় খাইয়েছে। কিন্তু আর না!
সেই সঙ্গে সঙ্গীত–সুধা পানের কথাটা আর পাড়লাম না। পা বাড়ালাম। মনে মনেই বললাম, একবার নিজের পুরীতে গিয়ে যদি পৌঁছুতে পারি–আমনুরার গাড়ি ধরতে পারি যদি–তাহলে আসল মেঠাই খাবো আমার মামার বাড়ি। আমের চেয়ে মিঠে কিছু আর আছে নাকি? ঝুড়িখানেক আম আর এক গামলা ক্ষীর নিয়ে বসে যাও, খোসা ছাড়িয়ে ক্ষীরে ডুবিয়ে খোস মেজাজে থাকো। এক পয়সা খরচা নেই আমের পেছনে। আরামসে খাও। তারপর বিকেলে ছুরি হাতে বেরিয়ে পড়ো বাগানে, আমগাছের ডালে উঠে আমোদ করে! হনুমানদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লাগো। আমের জন্যে কোন ব্যয় নেই। যা কিছু ব্যায়াম তা শুধু খাওয়ার। হাতের আর মুখের।
ছুটতে-ছুটতে ঘাটের কিনারায় পৌঁছই। পৌঁছেই দেখি–আঃ ঐ যে আমার ইস্টিমার সামনেই খাড়া! ধড়ে আমার প্রাণ এল এতক্ষণে। এক দৌড়ে জেটির কোলে গিয়ে পড়লাম।
জেটিতে ইস্টিমারে চারধারেই তাড়া। ভীষণ হৈ-চৈ। এ-খালাসী ডাকছে ও খালাসীকে ভাইয়া হো! ইস্টিমারও ডাকছে কাকে তা বলা কঠিন। কিন্তু তার দারুণ ভেঁয়েজ কানে তালা ধরিয়ে দেয়।
জেটির কিনারে ইস্টিমারের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। ওমা, ইস্টিমার যে জেটির বাঁধ কেটেছেন! ইস্টিমারে আর জেটিতে তখন বেশ কিছুটা ফারাক! ইস্টিমারের পাটাতন ইস্টিমার ভিড়লে যেটি জেটির গায়ে এসে লাগে-সেতুবন্ধের মতই–যার ওপর দিয়ে যাত্রীরা ওঠে নামে–যায় আসে–গটগট করে হাঁটে– কুলীরা যতো মাল তোলে, নামায়–যার সঙ্গে ইস্টিমারের জ্যেঠতু্তো সম্পর্ক–সেই সম্পর্ক আর নেই।
সে-সম্বন্ধ ছিন্ন হয়েছে আমার আসার আগেই। ইস্টিমারের খালাসীরা তাদের পাটাতন তুলে নিতে যাচ্ছে…
এখন বুকের পাটা চাই। লালগোলায় ইস্টিমার ধরতে বেগ পেতে হবে বেশ–আমায় জানানো হয়েছিল বার-বার। সেই বেগ পেতে হলো এখন। আমি আগু-পিছু করি বেগ পাবো কি পাবো না? তারপর মারি একলাফ সবেগে। মরিয়া হয়ে পড়ি গিয়ে পাটাতনের ওপর পদ্মার ভগ্নাংশ পার হয়ে। গিয়ে বসে পড়ি। আমার কাণ্ড দেখে সবাই হৈ-হৈ করে ওঠে!
ইস্টিমারে–জোটির যতো লোক। কিন্তু কে কী বলছে, তা শোনার তখন কি আমার হুশ আছে! না কিছু দেখছি–না শুনছি! পায়ের তলায় পাটাতন পেয়েছি এই ঢের। মুহূর্তটাক বসে থাকি, তারপরে টলতে-টলতে উঠি-উঠে দাঁড়াই! সুটকেস আমার হাতে। তারপর আমার নজর, নীচের দিকে। পাটাতনের তলায়–ওমা, এ যে থৈ-থৈ জল! দেখে আবার আমি বসে পড়ি। পাটাতনের নীচেই পদ্মার বিস্তার! আমার মাথা ঘুরতে থাকে।
উপুড় হয়ে পড়ি আবার–পাটাতনের উপর হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটি…আস্তে আস্তে এগুতে থাকি…সুটকেস টানতে টানতে। দিচ্ছি তো দিচ্ছিই হামাগুড়ি। যেন এর শেষ নেইকো। ইস্টিমারের ডেক মনে হয়, মাইল দেড়েক দূরে। যাই হোক, যত দেরিই হোক, গুঁড়ি মেরে মেরে পৌঁছালাম গিয়ে। উঠলাম ডেকে। তখন দেহের সাথে সাথে সারা মনও যেন আমাকে ডেকে উঠল–পেয়েছি! পেয়ে গেছি!!
