আমি তখন আরো গোটাকয়েক মণ্ডা ঠাসি! মন ঠাণ্ডা করে।
তারপর হালকা-মনে হেলতে-দুলতে ইস্টিমার-ঘাটের দিকে এগোই। ঘাট পেরিয়ে জেটির ডেকে পা দিয়ে দেখি–ওমা একি! আমার ইষ্টিমার যে মাঝপদ্মায়! আমার জন্যে অপেক্ষা না করে নিজেই জেটির মায়া কাটিয়েছে!
সর্বনাশ! আবার কখন আসবে ইস্টিমার? খালাসীদের কাছে জানা গেল যে কাল সকালের আগে নয়। শুনে নিজের ওপর যতো না, তার চেয়ে বেশি রাগ হলো মিঠাইওয়ালার ওপর। সে কেন তার মিঠে বুলিতে এমন করে আমায় মজাল? মজা পেয়েছে?
তাকে পাকড়ালাম গিয়ে তক্ষুণি।
আমার গালাগাল সে অম্লানবদনে হজম করলো। তারপরে নিজের গালে হাত দিলো ঈস! হামকো ভি তো খেয়াল ছিলো না বাবু! আজ হাটবার ছিল যে! হাট-কা আদমি যেতো ফিরোৎ গিলো না? উসি—বাস্তে–জাহাজ জলদি ভোরে গিলো আর ছেড়ে ভি দিলো জলদি।
কিন্তু এই জলদিতে আমার আগুন নিভলো না।–তব-তব-তুম কাহে এইসা ঝুটমুঠ বাতলায়কে আমাকে তকলিফ দিলে?
তকফিল কেনো হোবে বাবু? একঠো একরাত কো বাত তো? আপনি হামার দু-কানে আইসুন ওহি হামার দুকান! মেঠাইওয়ালা অদূরে পথের ধারে তার খেড়োঘরের আটচালার দিকে আঙুল ছোঁড়ে–উখানে হামি থাকে। হামি আউর হামার বিটিয়া–লছমি। আজ রাতঠো হামার ঘরে থাকে, কাল সবেরে জাহাজমে চলিয়ে যান–পুরী-কাচৌরি খাকে নিদ যান খুশীসে-কুনো কসটো হোবে না। হামার পুরী-কছৌরিভি খুব উমদা চীজ আছে বাবু! লালগোলাকে কেতনা আমীর আদমী–
তোমার পুরীকচুরী খায়কে আধমরা হয়ে আছে। এই তো বলছো? তা আমি বুঝতা হ্যায়। কিন্তু বোঝা উচিত ছিলো অনেক আগে। কে জানে, তোমার ঐ সব গেলাবার মতলবেই তুমি আজ আমায় ইস্টিমার ফেল করাবে!
গজরাতে গজরাতে তার পিছু পিছু যাই। ঘরের সামনে গিয়ে সে হাঁক ছাড়ে–লছ মি? আরে বিটিয়া, এই বাবুকো–বাস্তে ই-ঘরমে হামরা খাঁটিয়াঠো…
দোকানের পাশের ঘরটিতে খাঁটিয়া পেতে আমার শোবার ব্যবস্থা সব সেই লছমিই করে দিলো, মেঠাইওয়ালার সেই মুখ-বুজে থাকা বাচ্চা মেয়েটি। আর সে নিজে তুলসীদাসী রামায়ণ পেড়ে তার লালটিম জ্বালিয়ে রামভজন গান করতে লাগল। নামেই লালটিম, আসলে কারো টি টিম্।
আর আমি আরেক দফা তার লাড্ডু-পেঁড়ার সঙ্গ রফা করে আমার খাঁটিয়ায় লম্বা হলাম। আর তার পরেই শুরু হল আমার দফা রফা! কী মশা রে বাবা সেখানে। আর যেমন মশা, তেমনই কি ছারপোকা। পদাতিকবাহিনী আর বিমানবহরে যেন যুগপৎ আমাকে আক্রমণ করল। ওপর থেকে–নীচের থেকে–এক সঙ্গে কামড়াতে লাগল আমায়। আগাপাশতলার কোথাও আর আস্ত রাখল না।
হাত পা ছুঁড়ে–এলোপাথাড়ি লাগলাম মশা তাড়াতে। কিন্তু কতো আর তাড়াবো? তাড়াবো কোথায়? পিন-পিন করে কোত্থেকে যে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে! আর সেই সঙ্গে লাখে লাখে ছারপোকাও! পিন পিন করে না এলেও, তাদের জাহাজে আলপিন নিয়ে আসার কসুন নেই। আর এদের রামভোজনের সঙ্গে তাল রেখে….. সেই সঙ্গে চলেছে মেঠাইওয়ালার রামভোজন।
ভোরের দিকে সারা গায়ে চাদরমুড়ি দিয়ে একটু ঘুমের মতো এসেছিলো বুঝি! তন্দ্রার ঘোরে আরেক দিনের ছবি দেখছিলাম! এই পদ্মাতেই আরেক যাত্রার ওই ইস্টিমারের বুকেই যে-কাণ্ডটা ঘটেছিল, তার ছবি কেমন করে জেগে উঠে আবার যেন আমার স্বপ্নালু চোখের ওপর ভাসছিল!
কী বিপদেই না পড়েছিলাম সেদিন-সেদিন এমনি এই পদ্মাতেই। সেই দুর্ঘটনার ঠেলাতেই না আমার ছোটবেলাকার তোতলামি সেরে গেল একবেলায়। একদিনেই জন্মের মতন। সেরকম দুর্দৈব যেন কারুর কখনো না হয়!….
সে-ই আরেক ইস্টিমারযাত্রা। পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে চলেছি, পূর্ব্ব বাংলার মুলুকে– খুড়তুতো দিদির শ্বশুরবাড়িতে–দিদি আর জামাইবাবুর সঙ্গে। এইতো কবছর আগের কথা?
সেই প্রথম চেপেছি ইস্টিমারে। চেপে ফূর্তি হয়েছে এমন! ঘুরে-ঘুরে দেখছি চারদিকে। ইস্টিমার কেমন করে জল কেটে-কেটে যাচ্ছে! আঃ সে কী মজা!
আর, কী জোর হাওয়া রে বাব! উঠিয়ে নিয়ে যায় যেন। পদ্মার জলবায়ুর কী উপকারিতা কে জানে! গঙ্গার আর সমুদ্রের হাওয়া খেলে যেমন চেঞ্জের কাজ করে- জোর হয় গায় পদ্মার এই জোরালো-হাওয়ায় তেমনি হয়ে থাকে কিনা জানবার আমার কৌতূহল হয়।
জিজ্ঞাসু হয়ে জামাইবাবুর কাছে যাই। ব-বলি ও জা-জা-জা জাম-, বলতে গিয়ে কথাটা জাম হয়ে যায় গলায়।
ব-ব-বলছিলাম কি যে, এই চে-চে-চে-চে-চেঁ
এই চেঁচাচ্ছো কেন, হয়েছে কি? চেঁচিয়ে ওঠেন উনি নিজেই।
চে-চে-চেঁচাব কেন? ব-ব-বলছি যে, চে-চে-চে-চেইন…!
ঐ পর্যন্তই রইল। চেইন-কে আর ওর বেশি টানা গেল না।
না ইস্টিমারের চেইন থাকে না। ইস্টিমার কি রেলগাড়ি যে চেন থাকবে?
জবাব দিলেন জামাইবাবু।আর চেনের কথাই-বা কেন? চেন টেনে ইস্টিমার থামাবার কি দরকার পড়ল তোমার হঠাৎ, শুনি?
না-না, চে-চেইন না। চে-চে-চে-চে–জবাবদিহি দিতে গিয়ে আমার চোখ-মুখ কপালে উঠে যায়। কিন্তু ঐ চে-কারই সার, তার বেশি আর বার করা যায় না। তখন ভাবলাম যে, চেঞ্জ-কথাটা এই পাপ গলা দিয়ে যদি না গলতে চায়, তার বদলে বায়ু পরিবর্তনকেই না হয় নিয়ে আসি। কিন্তু শোনার ধৈর্য থাকলে তো জামাইবাবুর! চে-চে-চেন্না! ব-বলছি কি, যে বা-বা-বা-বা বা-বা-বাবা … কিন্তু মাঝ পথেই তিনি বাধা দিয়েছেন–বাবা রে-বাবা! পাগল করে দেবে নাকি?…বলেছি না তোমাকে? কতবার তো বলেছি যে তোমার যা বলবার তা গান করে বলবেশ করে সুরে ভেঁজে নিয়ে গাও? গানই হচ্ছে তোতলামির একমাত্র দাবাই। যদি সারাতে চাও তোমার এই তোতলামো তো গানের সাহায্য নাও। কেন, সুর খেলিয়ে বলতে কি হয়? আর সুর বার করা এমন কিছু শক্তও না। স্বরটা নাকের ভেতর দিয়ে বার করলেই সুর হয়। আর কিছু না থাক, নাক তো আছে?
