তুই একটা কুম্ভকর্ণ। নাঃ, বিছানায় কাজ নেই আমার। আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই।
তিনি বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকলেন ঠায়।
সকালে আমরা উঠে দেখি আমি উঠে দেখলাম, তিনি তো আগের থেকেই উঠেছিল। তিনি শুধু দেখলেন কেবল চৌকির ওপর হাজার হাজার মৃতদেহ। ছারপোকার হয়ে যাব চাপে আর চটাপট চাপড়ে ছারপোকাদের ধ্বংসাবশেষ।
ইস, তুই এখানে থাকিস কি করে রে? এই বিছানায় ঘুমোস কি করে তুই একটা রাসকেল। রাবিশ–কুম্ভকর্ণ। নাঃ, আর আমি এখানে নেই। মা কালির দিব্বি আর কখনো এখানে আসছি না বাবা! আমার নাকে খত। বদ্যিনাথের বাসাতেই আমি থাকব। সেখানেই চললাম। সকাল সকাল গিয়ে পাকড়াই তাকে। বলেই তিনি আর দাঁড়ালেন না। ব্যাগহাতে বেরিয়ে পড়লেন, তার ধার দেওয়া দশ টাকার উদ্ধারের বেমালুম ভুলে গিয়ে।
জাহাজ ধরা সহজ নয়
গঙ্গাযাত্রার থেকে শুনেছি, খুব কম লোকই বেঁচে ফেরে। পদ্মযাত্রাও আমার কাছে প্রায় তাই।
যতবার পদ্মযাত্রায় বেরিয়েছি একটা না একটা বিপদ ঘটেছেই। একবার তো আমার খুড়তুতো বোনকে শ্বশুরবাড়ি দিতে গিয়ে ….না, সে দুঃখের কথা কেন আর! ঠিক নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গের মত না হলেও, নাকাল হবার কাহিনী তো বেটই।
পদ্মা আমার কাছে বিপদ-দা! আমার জীবনে বিপদের দান নিয়ে এসেছে বারবার।
সেই বিপদজ্জনক পথেই পা বাড়িয়েছি আবার। সাধের কলকাতা ছেড়ে আমার পদ্মাপারী মামার বাড়ি চলেছি এই গরমের ছুটিতে–আমের আশায়।
শেয়ালদা থেকে লালগোলার ঘাট–রেলগাড়ির লম্বা পাড়ি। সেখানে নেমে, পদ্মার ধারে গিয়ে গোদাগাড়ির ইস্টিমার ধরতে হয়। লালগোলার ঘাটে ইস্টিমারে চেপে পরপারে গোদাগাড়ির ঘাটে গিয়ে নামো, তারপর গোদাগাড়িরতে আবার চাপো রেলগাড়িতে। তারপরে প্রথম ইষ্টিশনই বুঝি
আমনুরা। ইষ্টিশনের নাম শুনেই সজল জিভে সেই আমের কথাই মনে পড়বে তোমার।
আমের রাজ্যের শুরু সেই আমনুরা থেকেই। তুমি মালদহের আমরাজ্যে এসে পড়লে–রাজ্যের আম যে যোগায় সেই মালদা। সারা বাংলায় যার সাম্রজ্য!
আমি অবিশ্যি আমনুরাতেই থামব না। আমনুরা ছাড়িয়ে–আরো কি কি সব পার হয়ে– ইংরেজবাজার পেরিয়ে–আরো কয়েক স্টেশন পরে পৌঁছব গিয়ে সামশিতে। আমের রাজ্য ভেদ করে–আমসত্ত্ব দেশের ওপর দিয়ে–অনেক-অনেক পরে নিজের গাঁয়ের ইষ্টিশনের গায়ে ভিড়ব গিয়ে–প্রায় আমসি হয়েই।
সামসি থেকে ফের এক হাঁটার পাল্লা-পাক্কা দশ মাইলের ধাক্কা–সারা পথটা পায়দলে যাও! ঘন্টা তিন-চার পায়দল যাবার পর তবেই আমাদের আমার মামাদের গ্রাম-চঞ্চল! আর সেই মামাতো–আমবাগান! ভাবতেই, ট্রেন থেকে নামতেই প্রাণে চাঞ্চল্য জাগল। লালগোলাতেই লালায়িত হয়ে উঠলাম–নিজেকে যেন একটু সজীব বোধ করলাম।
সুটকেশটা হাতে করেই পা চালালাম পাড়ের দিকে। শোনা ছিল, লালগোলার ইস্টিমারদের চালচলন সুবিধের নয়। কখন আসে, কখন যায়, তার কোন হদিস পাওয়া যায় না। খুশি মতন আসে, খেয়ালমাফিক ছাড়ে। কিছু তার ঠিকঠিকানা নেই, কাজেই সব–আগে ঘাটে গিয়ে তার পাত্তা নেওয়া ভাল।
চলেছিলাম হনহন করে! মাঝপথে থামাল এক মেঠাইওয়ালা।
আরে বাবু এতো দৌওয়াচ্ছেন কেন? আইসন, গরম পুরী খাইয়ে যান!
হ্যাঁ, বসে-বসে তোমার পুরী খাই, আর এদিকে আমার ইস্টিমার ছেড়ে দিক!
জাহাজ ছাড়তে আখুন ঢের দেরি আছে। জানায় মিঠাইওয়ালা : আখুন তো সজ ভি হোয়নি। সাত বাজবে, আট বাজবে, সওয়া-দশ-ভি বাজ যাবে, বহুৎ পাসিনজর আসবে–ডেক-উক সোব ভরতি হোবে, তব তত ছোড়বে জাহাজ!
ওমা! এমনি ধারাই জাহাজ নাকি? জাহাজের গতিবিধি বুঝি ওই রকম? তা হয়ত হতেও পারে। এমনটাই যে হবে তার একটা আন্দাজও ছিল আমার …মামাদের মুখে শুনে শুনেই। শুনেছিলাম যে, গোদাগাড়ির ইস্টিমারের গদাইলস্কলি চাল! তবে আর হন্যে হয়ে ছুটে কি হবে? আমিও এদিকে জাহাজী কারবার লাগাই না কনে? জাহাজের হন্যে হয়ে ছুটে কি হবে? আমিও এদিকে জাহাজী কারবার লাগাই না কেন? জাহাজের অনুকরণে নিজের পেটের খোল ভর্তি করতে লাগি। আমার উদরও তো বলতে গেলে জাহাজের মতই উদার।
মিষ্টি-টিষ্টি আছে কিছু?
আছে না? কি চাহি আপনার? রসগুলা, পেঁড়া, বরফি, জিলাবি–সবকুছ। বহুৎ বাঢ়িয়া বাঢ়িয়া মিটাই বাবু!
তা বেশ তো? দেখলাও কেইসা বাঢ়িয়া? সব চীজ দেও দো–চারঠো। ইস্টিমার যতক্ষণ না ছাড়ে ততক্ষণ তোমার মিষ্টি মারা যাক। ইস্টিমারকে সামনে রেখে আমার ইষ্টের সাধনায় লাগি। দহিবড়া থেকে শুরু করে, বরফি রসগোল্লা জিলাবি সাবড়ে, এমনকি, লাড্ড পর্যন্ত পান করতে বাকি রাখি না কিছুই। পেঁড়াও গোটা-চার পাচার করি।
খাবার মাঝখানে ইস্টিমারের বাঁশি কানে বাজে। চমকে উঠি–অ্যাঁ। ছাড়লো নাকি ইস্টিমার? মেঠাইওয়ালা কিন্তু ভরসা দেয়–ঘাবড়াইয়ে মৎ বাবু! উ তো পহলী আওয়াজ। ওই রোকম চার-চার দফে ভোঁ-ভো কোরবে তব তো ছাড়বে জাহাজ। দশ-দশ মিনিট যাবে, অউর এক-এক ভোঁ ছোড়বে।
ও, তাই নাকি? শুনে একটু ভরস পাই। তা-তাতো হতেই পারে ইস্টিমার তো ইংরেজি ব্যাকরণে স্ত্রীলিঙ্গই? প্রোনাউনে She! আর মেয়েরা কি একবার আসি বলে বিদায় নিতে পারে? নিয়েছে কখনো? বিনিকেই তো দেখছি, আসি ভাই, আসি ভাই, অন্ততঃ বিরাশীবার না বলে কিছুতেই নড়বে না!
