বাড়ি যাবে এক্ষুনি? বোসো, চা খাও।
বাড়ি? আজ সারাদিন নয়। খুব গভীর রাত্রে ফিরব বাসায়। আমি ভাই এখন যাই।
হরেকেষ্টদার ভয়ে বাসাতেই ফিরবে না আজ? সারাদিন থাকবে কোথায় শুনি? আমি জিজ্ঞেস করি।
হরেকেষ্ট হরেকেষ্ট কেষ্ট কেষ্ট হরে হরে–করে ঘুরে বেড়াব রাস্তায় বাস্তায়। বলে সে আর দাঁড়ায় না।
দাড়ি কামিয়ে মুখ না–ধুতে হরেকেষ্টদা হাজির।
আসুন আসুন হরেকেষ্টদা! আস্তাজ্ঞে হোক! আমি অভ্যর্থনা করি, আমার কী ভাগ্যি যে আজ আপনার পায়ের ধুলো পড়ল।
বদ্যিনাথকে বাসায় পেলাম না, তাই তোর কাছেই চলে এলাম। ব্যাগ নামিয়ে তিনি বললেন।
আসবেন বইকি! হাজারবার আসবেন। আপনি হলেন হরেকেষ্টদা। আমাদের গায়ের মাথা। আমরা কি আপনার পর?
তা নয়। তবে বদ্যিনাথ ছেলেটি ভালো। তার ওখানেই উঠি। আমাকে পেলে সে ভারী খুশি হয়।
আমিই কি অখুশি? বসুন, চা খান। চা আনাই, জিলিপি শিঙারা কচুরি–কি খাবেন বলুন?
যা হচ্ছে আন। চা-টা খেয়ে চান করে দুটি ভাত খেয়ে বেরুব একটু। কলকাতায় এসেছি, এবার তোর এখানেই থাকব ভাবছি। বদ্যিনাথকে পেলুম না যখন….
তা, থাকুন না যদ্দিন খুশি। দাঁড়ান,–আনাই, পোর্টম্যানটো খুলে পয়সা যার করি। ওমা, কী, বাকসর চাবি কোথায়? খুঁজে পাচ্ছি না তো। চাবিটা কোথায়! ভাঙতে হবে দেখছি বাকসটা! চাবিওয়ালা কোথায় পাই এখন? ভাবতে হবে দেখছি।
না, না, ভাঙবি কেন বাকসটা? দুবেলা চাবিওয়ালা হেঁকে যায় রাস্তায়। চাবি করিয়ে নিলেই হবে। বে পোর্টম্যানটোটি! ভাঙবি কেন? আমায় দিয়ে দিস বরং। দেশে নিয়ে যাব! শুনে আমি হাঁ হয়ে যাই নিজের চাবি নিজেই চাবি নিজেই সারিয়ে ভাল করলাম কিনা খতিয়ে দেখি।
এখন টাকার দরকার তোর বল না? দিচ্ছি না-হয়!
গোটা পাঁচেক দাও তাহলে।
পাঁচ টাকা! ব্যাগ খুলে তিনি বলেন, পার্ট টাকা তো নেই রে দশ টাকার নোট আছে।
তাই দাও তাহলে। পরে বাক্স খুলে দেব ধন তোমায়।
হরেকেষ্টদার পয়সায় চা কচুরি শিঙাড়া জিলিপি জিবেগজা রাজভোগ দরবেশ বসানো যায় বেশ মজা করে।
দুপুরের আহার সেরে হরেকেষ্টদা বললেন, যাই, এবার একটু বদ্যিনাথের বাসা থেকে ঘুরে আসি। সে আমাকে একটা আলমারি দেবে বলেছিল। আধুনিক ডিজাইনের আলামারিটা! দেখতে খাসা। তার ওপরে রবিঠাকুরের বই ঠাসা। আমাকে উপহার দিতে চেয়েছিল বদ্যিনাথ। মুটের মাথায় চাপিয়ে নিয়ে আসি গে।
সেই যে বেরিয়ে গেলেন হরেকেষ্টদা, ফিরবেন সেই রাত দশটায়।
হায় হায় করতে করতে এলেন কোথায় গেছে বদ্যিনাথটা সরাদিন দেখা নেই। বাসায় লোক বলল সকালে বেরিয়েছে, কিন্তু এই রাত সাড়ে দশটা অপেক্ষা করে…করে….করে…
এতক্ষণ বদ্যিনাথের বাসাতেই ছিলেন তাহলে?
না, বাসায় থাকব কোথায়? ওর ঘরে তো চাবি বন্ধ। কার ঘরে থাকতে দেবে? বাসার সামনের একটা চায়ের দোকানে বসে বসে এতক্ষণ কাটালাম।
সেই দুপুরবেলার থেকে এতক্ষণ!
শুধু শুধু কি বসতে দেয়? বসে বসে চা খেতে হল। তিনশো কাপ চা খেয়েছি। এনতার খেলাম। খান পঞ্চাশেক টোস্ট। আড়াই ডজন আমলেট। সব বদ্যিনাথের অ্যাকাউন্টে। খেয়েছি আর নজর রেখেছি বাসার দরজার, কখন সে ফেরে। কিন্তু নাঃ, এতক্ষণেও ফিরল না।…
তাহলে আর কী করবেন। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ুন এবার।
না কিছু খাব না। যা খেয়েছি তাতেই অম্বল হয়ে গেছে। তিনশো কাপ চা বাপ জীবনে কখনো খাইনি।….না, কিছু আর খাব না। শুয়ে পড়ব সটান। মেজেয় আমার বিছানা করে দে। আছে তোর বাড়তি বিছানা? আমি তো বেডিং-ফেডিং কিছু আনিনি। বদ্যিনাথের বাসায় উঠব ঠিক ছিল। এই মেজেয়…এইভেনেয়…মাদুর-টাদুর যা হোক কিছু পেতে দে না হয়।
তুমি মেজেয় শোবে? তুমি বলছ কী হরেকেষ্টদা? অমন কথা মুখে এনো না, পাপ হবে আমার। তুমি আমার চৌকিতেই শোবে। আমি ঐ কম্বলটা বিছিয়ে সোবখন মেজেয়….
বলে আমি ফিলাইল-লাঞ্ছিত কম্বলট বিছানার থেকে তুলে নিয়ে মাটিতে বিছোই। আর চৌকিতে তোশকের ওপর ধবধবে চারদ পেড়ে হরেকেষ্টদার জন্যে পরিপাটি বিছানা করে দিই।
হরেকেষ্টদা শুয়ে পড়েন। আমিও আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ি। শুতে না–শুতে হরেকেষ্টদা নাক ডাকতে থাকে। রাত বোধ হয় বারোটা হবে তখন, দারুণ একটা চটপটে আওয়াজে আমার ঘুমস ভেঙে যায়।
কী ব্যাপার? হরেকেষ্টদা নাক আর ডাকছে না! খালি মাঝে মাঝে চটাস টচ চটাচট চটাপট চটাপট চটাপট….শুনতে পাচ্ছি কেবল।
ওরে, ওরে শিবু! আলোটা জ্বাল তো!
আলো জ্বালা যাবে না হরেকেষ্টদা। এগারটার পর মেন পর সুইচ অফ করে দেয়।
কি কামড়াচ্ছে রে? ভয়ঙ্কর কামড়াচ্ছে। দেশলাই আছে তোর?
দেশলাই কোথায় পাব দাদা? আমি কি সিগ্রেট খাই?
তাহলে মোমবাতি?
বাজারে।
কী সর্বনাশ! টর্চ আছে? টর্চ?
রাতে দুপুরে কেন এই টর্চার করছেন হরেকেষ্টদা? চুপচাপ ঘুমোন!
ঘুমোব কী রে? জ্বালিয়ে যাচ্ছে যে! বাঁ পাশটা যে জ্বলে গেল রে-বাঁ–পাশে ছুঁয়েছিলাম…পা থেকে ঘাড় পর্যন্ত জ্বলছে।
পাশ ফিরে শোন।
পাশ ফিরে শোব কী রে? শুতে কী দিচ্ছে? উঠে বসেছি। বসতেও দিচ্ছে না। ভীষণ কামড়াছে রে?
কে জানে! আমি নিস্পৃহ কণ্ঠে বলি? কি আবার কামড়াবে?
এ তো দেখছি খুন করে ফেলবে আমায়। একদম তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না। কী পুষেছিস তুই জানিস। ছারপোকা নয় তো রে?।
ছারপোকা? অসম্ভব। আমি অ্যাদ্দিন ধরে শুচ্ছি, আমি কি তাহলে আর টের পেতুম না
