তাঁর ‘রুগী’ দেখার তাগাদা, অপেক্ষা করার অবসর নেই। ঘাড় নেড়ে আমাকে উৎসাহ দিয়েই তিনি চলে যান। দর্শকদের মধ্যে তাঁকে গণনা না করেই আমার অভিনব ব্যয়ামপর্ব শুরু হয়।
সহিসরা বশে কষে তাকে ধরে থাকে, আমি আস্তে আস্তে তার পিঠের উপর বসি; বেশ যুত করেই বসি; শ্ৰীযুত হয়ে।
কিন্তু যেমনি না তাদের ছেড়ে দেওয়া, ঘোড়াটা চারটে পা একসঙ্গে জড়ো করে, পিঠটা দুমড়ে ব্যাখারির মতন বেঁকিয়ে আনে। এবং করে কি, হঠাৎ পিঠটা একটু নামিয়েই না, ওপরের দিকে এক দারুণ ঝাড়া দেয়–ধনুকে টঙ্কার দেওয়ার মতই। আর তার সেই এক ঝাড়াতেই আমি একেবারে স্বর্গে-ঘোড়ার পিঠ ছাড়িয়ে প্রায় চার পাঁচ হাত উঁচুতে আকাশের বায়ুস্তরে বিরাজমান।
শূন্যমার্গে চলাচল আমার ন্যায় স্কুল জীবের পক্ষে সম্ভব নয়, তাই বাধ্য হয়েই আমাকে নামতে হয়, ঐ ঘোড়ার পিঠেই আবার। সেই মুহূর্তেই আবার যথাস্থানে আমি প্রেরিত হই, কিন্তু আমার অধঃপতন। এবার জিনের মাথায়। আবার আকস্মিক উন্নতি, এবার নেমে আসি ঘোড়ার উপর। আবার আমাকে উপরে ছুঁড়ে দেয়; এবার যেখানে নামি সেখানে ঘোড়ার চিহ্নমাত্র নেই। অশ্ববর আমার আড়াই হাত পেছনে দু পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তখন, আমাকে লুফে নেবার জন্যই কিনা কে জানে।
ঘোড়ার মতলব মনে মনে টের পেতেই, তার ধরবার আগেই আমি শুয়ে পড়ি। জানোয়ারটা ততক্ষণে আমাকে উন্মুক্ত গৌহাটির পথ ধরে টেলিগ্রামের মতো দ্রুত ছুটে চলেছে।
আস্তে আস্তে উঠে বসি আমি। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলি, ঘোড়ায় চড়ার বিলাসিতা পোষাল না আমার। একটা হাত কপালে রাখি, আর একটা তলপেটে। মানুষের হাতের সংখ্যা যে প্রয়োজনের পক্ষে পর্যাপ্ত নয় এ কথা এর আগে এমন করে আমার ধারণাই হয়নি কখনও। করাণ তখনও অরো কয়েকটা হাতের বিলক্ষণ অভা বোধ করি। ঘাড়ে পিঠে কোমরে, পাঁজরায় এবং শরীরের আরো নানা স্থানে হাত বুলোবার দরকার ছিল আমার।
কেবল যে বেহাতই হয়েছি তাই নয়, বিপদ আরো;–উঠতে গিয়েই সেটা টের পাই। দাঁড়াবার এবং দাঁড়িয়ে থাকার পক্ষে দুটো পা-ও মোটেই যথষ্টে নয়, বুঝি তখন। সহিসরা ধরে বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেয়, কিন্তু যেমনি না ছাড়ে অমনি আমি সটান। তখন সবাই মিলে, সহানুভূতিপরবশ হয়ে ধরাধরি করে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারেও আমার নিজের হাত পা নিজের কোন-ই কাজে লাগে না, লাগে না, এক ওদের হ্যাঁন্ডেল হওয়া ছাড়া….নিজের চ্যাংদোলায় নিজে চেপে আসি।
তারপর প্রায় এক মাস শয্যাশায়ী। সবাই বলে ডাক্তার দেখাতে কিন্তু ডাক্তার ডাকার সাহস হয় না আমার। মামার বন্ধু-তিনিই তো? এই অবস্থাতেই আবার ঘোড়র চড়ার ব্যবস্থা দিয়ে বসবে কিনা কে জানে। অশ্বচিকিৎসা ছাড়া আর কিছু তো জানা নেইকো তার। সেই পলাতক ভূটানী টাটুকে যদি খুঁজে না-ও আর পাওয়া যায়, একটা নেপালী গাঁট্টার যোগাড় করে আনতে কতক্ষণ? ডাক্তার? নাঃ। মাতৃপুরুষানুক্রমে সে আমাদের ধাতে সয় না।
বিছানা ছেড়ে যেদিন প্রথম বেরুতে পারলাম সেদিন হোটেলের বড় আয়নায় নিজের চেহারা দেখে চমকে গেলাম। অ্যাঁ এতটা কাহিল হয়ে পড়েছি নাকি? নিজেকে দেখে চেনাই যায় না যে; মুখের দিকে তাকাতেই ইচ্ছা করে না।–বিকৃতবদনে বাইরে বেরিয়ে আসি।
রাস্তায় পা দিতেই আস্তাবলের বড় সহিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ।–হুজুর আপনার কাছে আমাদের কিছু পাওনা আছে।
পাওনা? আবার আমাকে চমকাতে হয়–কিসের পাওনা?
আজ্ঞে, সেই ঘোড়ার দরুন।
কেন, তার দাম তো চুকিয়ে দিয়েছি। হ্যাঁ, চাবুকের দরুন ক-আনা পাবে বটে তোমরা। তা চাবুক তো আমার কাজেই লাগেনি, ব্যবহারই করতে হয়নি আমায়। ও ক-আনাও কি দিতেই হবে নেহাৎ?
আজ্ঞে কেবল ক-আনা নয় তো হুজুর। বাহাত্তর টাকা সাড়ে বারো আনা মোট পাওনা যে। এই দেখুন বিল।
বাহাত্তর টাকা সাড়ে বারো আনা? আমার চোখ কপালে ওঠে। কেন, আমার অপরাধ?
আজ্ঞে আপনার ঘোড়ায় খেয়েছে এই এক মাসে সাড়ে বাইশ টাকার ছোলা সোয়া পাঁচ টাকার ঘাস—
আমি বাধা দিয়ে বলি– কেন, সে তো পালিয়ে গেছে গো।
আপনার ঘোড়া? মোটেই না। খাবার সময়েই ফিরে এসেছিল, আর তার পর থেকে আস্তাবলে ঠিক রয়েছে। সেই ছোট সহিসকে হুকুম দেয়–নিয়ে আয়তো ভূটানী টাট্ট হুজুরের সামনে।
বলতে বলতে সহিসটা ঘোড়াকে এনে হাজির করে। ঘোড়াটা যে ভাল খেয়েছে দেয়েছে তার আর ভুল নেই, বেশ একটু মোটাসোটাই হয়েছে বলে আমার বোধ হোলো।
আমরা তো তবু ওকে কম খেতে দিয়েছি, দিতে পারলে ওর ডবল, আট ডবল খেতে পারত। কিন্তু সাহস করে খাওয়াতে পারিনি, হুজুর বেঁচে উঠবেন কিনা ঠিক ছিল না তো। এর আগের–সহিসটা হঠাৎ থেমে যায়, আর কিছু বলতে চায় না।
পরবর্তী বাক্যটি প্রকাশ করার জন্য আমি পীড়াপীড়ি লাগাই। ছোট সহিসটা বলে ফেলে-ওকে চেপে এর আগে আর কেউ বাঁচেনি হুজুর।
বড় সহিসটা বলে–এই তো ঘাস আর ছোলাতেই গেল সওয়া পাঁচ আর সাড়ে বাইশ। একুনে সাতাশ টাকা বারো আনা। ভুট্টা খেয়েছে মোট দশ টাকার। ভুটানী টাট্ট কিনা, ভুট্টা ছাড়া ওদের চলে না। এই গেল সাঁইত্রিশ টাকা বারো আনা দেখুন না বিল।
এর ওপর আবার বজরা–ছোট সহিসটি বলতে যায়।
থাম তুই। বলে বড় সহিসটা তাকে বাধা দেওয়ায় আমাকে আর বজরাঘাতটা সইতে হয় না।
