প্রথমেই তার প্রশ্ন হয়–ব্যায়াম-ট্যায়াম কর?
আজ্ঞে দুবেলা হাঁটি। দুমাইল, দেড় মাইল, এমনকি আধ মাইল পর্যন্ত–যেদিন যতটা পারি। রাস্তায় বেরলেই হাঁটতে হয়!
হা! হাঁটা আবার একটা ব্যায়াম নাকি! ঘোড়ায় চড়ার অভ্যাস আছে?
না তো! সসংকোচে কই।
ঘোড়ায় চড়াই হল গিয়ে ব্যায়াম। পুরুষ মানুষের ব্যায়াম। ব্যায়ামের মত ব্যায়াম। একটা ঘোড়া কিনে ফেলে চড়তে শেখো–দুদিনে শুকিয়ে তোমার হাড়গোড় বেরিয়ে পড়বে।
ডাক্তারের কথা শুনে আমার রোমাঞ্চ হয়। গোরু থেকে ঘোড়ার পার্থক্য সহজেই আমি বুঝতে পারতাম, যদিও রচনা লিখতে বসে আমার এসেতে ঘোড়া-গরু এক হয়ে এসে মিলে যেত, সেই একতার থেকে ওদের আলাদা করা ইস্কুলের পণ্ডিতের পক্ষে কষ্টকর ছিল। চতুম্পদের দিক থেকে উভয়ে প্রায় এক জাতীয় হলেও বিপদের দিক থেকে বিবেচনা করলে ঘোড়ার স্থান কিছু উঁচু হবে বলতে হয়।
যাইহোক, ডাক্তার ভদ্রলোক গৌহাটির লোক হলেও গৌ গাবৌ গাবঃ না করে, গোড়াতেই গোরাকে বাতিল করে ঘোড়াকেই তিনি প্রথম আসন দিতে চাইলেন–অবশ্য আমার নিচেই। আমিও, ঘোড়র উপরেই চড়ব, এই সংকল্প করে ফেললাম। বাস্তবিক, ঘোড়ায় চড়া সে কী দৃশ্য! সার্কাসে তো দেখেইছি, রাস্তাতেও মাঝে মাঝে চোখে পড়ে যায় বই কি!
আম্বালায় থাকতে ছোটবেলায় দেখেছি পাঞ্জাবিদের ঘোড়ায় চড়া। এখনও মনে পড়ে, সেই পাগড়ী উড়ছে, পারপেন্ডিকুলার থেকে ইষৎ সামনে ঝুঁকে সওয়ারের কেমন সহজ আর খাতির নাদার ভাব আর তার দাড়িও উড়ছে সেই সঙ্গে! যেন দুনিয়ার কোনো কিছুর কেয়ারমাত্র নেই! তাবৎ পথচারীকে শশব্যস্ত করে শহরের বুকের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎবেগে ছুটে যাওয়া। পরমুহূর্তে তুমি দেখবে কেবল ধুলোর ঝড়, তাছাড়া আর কিছু দেখতে পাবে না।
হ্যাঁ ঘোড়ায় আমায় চড়তে হবেই! ঠিক তেমনি করেই। তা না হলে বেঁচে থেকে লাভ নেই, মোটা হয়ে তো নেই-ই।
আশ্চর্য যোগাযোগ। ডাক্তারের প্রেসকৃপশনের পর বিকেলের দিকে বেড়াতে বেরিয়েছি, দেখি সদর রাস্তায় নীলাম ডেকে ঘোড়া বিক্রি হচ্ছে। বেশ নাদুস-নুদুস কালো কালো একটি ঘোড়া–পছন্দ করে সহচর করবার মতই।
বাইশ টাকা! বাইশ টাকায় যাচ্ছে–এক, দুই–
তেইশ রুদ্ধ নিঃশ্বাসে আমি হাঁকলাম।
চব্বিশ টাকা। ভিড়ের ভেতর থেকে একজন যেন আমার কথারই জবাব দিল।
চব্বিশ টাকা। নীলামওয়ালা ডাকতে থাকে, ঘোড়া, জিন, লাগাম মায় চাবুক–সব সমতে মাত্র চব্বিশে যায়। গেল গেল–এক দুই–
বলে ফেলি একবারে সাতাশ।
আটাশ! ভিড়ের ভেতর থেকে আবার কোন হতভাগার ঝগড়া।
আমার পাশে একজন লোক আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যায়–আমি ঘোড়া চিনি, সে বলে, অদ্ভুত ঘোড়া মশাই! এত সস্তায় যাচ্ছে, আশ্চর্য! এর জিনের দামই তো আঠাশ টাকা!
বলেন কি! আমার চোখ বড় হয়ে ওঠে, তা হলে আরো উঠতে পারি–কী বলেন?
নিশ্চয়! ভাবছেন বুঝি দিশী ঘোড়া? মোটে তা নয়, আসল ভুটানী টাট্টু–যাকে বলে!
ভুটানী বলতে কি বোঝায় তার কোন পরিচয়ই আমার জানা ছিল না, কিন্তু ভদ্রলোকের কথায় ভঙ্গিতে এটা বেশ বুঝতে পারলাম যে এ যেন একটা জানোয়ারের মালিক না হতে পারলে ভূভারতে জীবনধারণই বৃথা!
আকুতোভয়ে ডাকছাড়ি–তেত্রিশ।
চৌৎ-আমার পাশের এক ব্যক্তি ডাকার উদ্যম করে। উৎসবের পুত্রপাতেই ওকে আমি দমিয়ে দিই–সাইত্রিশ! তারপর আমি হন্যে হয়ে উঠিপর পর ডেকে যাই–উনচল্লিশ, তেতাল্লিশ, সাতচল্লিশ, ঊনপঞ্চাশ।
পর পর এতগুলো ডাক আমি একাই ডেকে যাই! ঊনপঞ্চাশে গিয়ে ক্ষান্ত হই।
উনপঞ্চাশ-উনপঞ্চাশ! এমন খাসা খোঁড়া মাত্র ঊনপঞ্চাশে যায়! গেল—গেল–চলে গেল। এক-দুই–
তারপর আর কেউ ডাকে না। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিরস্ত হয়ে পড়েছে তখন। এক দুই তিন।
নগদ ঊনপঞ্চাশ টাকা গুনে ঘোড়া দখল করে পুলকিত চিত্তে বাড়ি ফিরি। সেই পার্শ্ববতী অশ্ব সমঝদার ভদ্রলোক আমার এক উপকার করেন। একটা ভাড়াটে আস্তাবলে ঘোড়া রাখবার ব্যবস্থা করে দেন। তারাই ঘোড়ার খোরপোশের, সেবা শুশ্রূষার যাবতীয় ভার নেবে। সময়ে-অসময়ে এক চড়া ছাড়া কোনো হাঙ্গামাই আমাকে পোহাতে হবে না। অবশ্য এই অশ্ব সেবার জন্য কিছু দক্ষিণা দিতে হবে ওদের।
ভদ্রলোককে সন্দেশের দোকানে নেমন্তন্ন করে ফেলি তক্ষুণি।
পরের দিন প্রাতঃকালে আমার অশ্বারোহনের পালা। ভাড়াটে সহিসরা ঘোড়াটাকে নিয়ে আসে। জনকতক ধরছে ওর মুখের দিকে, আর জনকতক ওর লেজের দিকটায়। মুখের দিকের যারা, তারা লাগাম, ঘোড়ায় কান, ঘাড়ের চুল অনেক কিছুর সুযোগ পেয়েছে কিন্তু লেজের দিকে লেজটাই কেবল সম্বল। ও ছাড়া আর ধর্তব্য কিছু ছিল না। আমি বিস্মিতই হইয়া কিন্তু বিস্ময় প্রকাশ করি না, পাছে আমায় আনড়ি ভাবে। ঘোড়া আনার এই নিয়ম হবে হয়তো, কে জানে।
সেই ডাক্তার ভদ্রলোক বাড়ির সামনে দিয়ে সেই সময় যাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে থামেন। এই যে। একটা ঘোড়া বাগিয়েছে দেখছি। বেশ বেশ। কিনলে বুঝি? কতয়? উনপঞ্চাশে? বেশ সন্তাই তো। খাসা-বাঃ।
ঘোড়ার পিঠ চাপড়ে নিজের প্রেসকৃপশনকেই বড় করেন–হ্যাঁ, হাঁটা ছাড়ো। হ্যাঁ-টা ছাড়ো। হাঁটা ব্যায়াম নাকি আবার। মানুষে হাঁটে? ঘোড়ায় চড়তে শেখো। অমন ব্যায়াম আর হয় না। দুদিনে চেহারা ফিরে যাবে। এত কাহিল হয়ে পড়বে যে তোমার মামারাই তোমাকে চিনতে পারবেন না। হুম।
