বিল এনেছ, আমার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে যাও। মনে বলি।–খাল বিল এক হয়ে যাক আমার।
এবার ছোট সহিসটা শুরু করে–তারপর ঘোড়ায় বাড়ি ভাড়া বাবদে গেল দশ টাকা–
ঘোড়ার জন্যে আবার একটা বাড়ি? আমি অবাক হয়ে যাই।
আজ্ঞে একটা গোটা বাড়ি নিয়ে একটা ঘোড়া করবেই বা কি? ওদের তো খাবার ঘর কি শোবার ঘর, বৈঠকখানা কি পায়খানা আলাদা লাগে না। এক জায়গাতেই ওদের সব কাজ–কিন্তু হুজুর, ঐ জায়গটার ভাড়াই হচ্ছে মাসে দশ টাকা
আমার কথা বেরোয় না। সহিসটা সরু মোলায়েম করে বলে, তারপ হুজুরেরা ঘোড়ার খিদম খেটেছি, আমাদের মজুরি আছে। আমরাই দশ পনের টাকা কি না আশা করি হুজুরের কাছে?
হুজুরের অবস্থা তখন মজুরের চেয়েও কাহিল। তবু মনে মনে হিসাব করে অঙ্ক খাড়া করি–তা হলেও সব মিলিয়ে বাষট্টি বারো আনা হয়। আর দশ টাকা দুপয়সা কিসের জন্যে?
ছোট সহিসটা চটপট বলে–আজ্ঞে ও দুপায়সা আমাকে দিবেন। খৈনির জন্যে।
ঘোড়ায় খৈনি খায়? আশ্চর্য তো!
আজ্ঞে ঘোড়ায় খায়নি। আমিই খাবার জন্য বলছিলাম, ওটার মুখের কছেই। কিন্তু যেমনি না ফটফটিয়েছি অমনি হারমীটা হেঁছে দিয়েছে–বিলকুল খৈনিটাই বরবাদ।
তখনই পকেট থেকে দুটো পয়সা বের করে ওকে দিয়ে দিই। যতটা পাতলা হওয়া যায়। দেনা আর শত্ৰু কখনও বাড়াতে নেই।
বড় সহিস বলে–আর বাকি দশ টাকার হিসাব চান? জানোয়ার এমন পাজী আর বলব কি হুজুর! একদিন বাড়ির মালিকের পাকিটের মধ্যে নাক ডুবিয়ে একখানা দশ টাকার নোট বেমালুম মেরে দিয়েছে। একদম হজম।
অ্যাঁ, বল কি?–আমি বিচলিত হই–একেবারে খেয়ে ফেলল নোটখানা? কড়কড়ে দশ-দশটা টাকা?
এক্কেবারে। আমরা আশা করলাম পরে বেরুবে, কিন্তু না, পরে অনেক আস্ত ছোলা পেলাম, সেগুলো ঘুগনিওয়ালাদের দিয়েছি, কিন্তু নোট বিলকুল গায়েব। এ টাকাটাও ঘোড়ার খোরাকীর মধ্যে ধরে নেবেন হুজুর।
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ি। দশ-দশটা টাকা ঘোড়ার নস্যি হয়ে গেল ভাবতেই আমার মাথা ঘুরতে থাকে।
সহিসটা আশ্বাস দেয়–চাবুকের দামটা তো ধরা হয়নি হুজুর, যদি মর্জি করেন তা হলে ওটার কয় আনা জুরে পুরো তেয়াত্তর টাকাই দিয়ে দিবেন। আর আমাদের দুজনকে ওই দুটো টাকা, বিনয়ের বাড়াবাড়িতে জড়ীভূত হয়ে বলে সে–আপনাদের মতো আমীর লোকের কাছেই তো আমাদের বকসিসের আশা-প্রত্যাশা হুজুর!
প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে সহিস বিদায় করি। মামার দেওয়া যা উপসংহার থাকে তার থেকে হোটেলের দেনা চুকিয়ে, হয়তো মালগাড়িতে বামার হয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। যাই হোক, ঘোড়াকে আর আস্তাবলে ফিরিয়ে নিতে দিই না। সামনেই একটা খুঁটোয় বেঁধে রাখতে বলি, রাস্তাই আমার ঘোড়ার আস্তানা এখন থেকে। সেই উপকারী ভদ্রলোককে ডেকে দিতে বলি, সহিসদের, যিনি কেবল ঘোড়া চিনিয়েই নিরস্ত হননি, আস্তাবলও দেখিয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোককে ঘোড়াটা উপহার দিয়ে তাঁর উপকারের ঋণ পরিশোধ করব।
অভিলাষ প্রকাশ করতেই বড় সহিত বলে–ওকে কি দেবেন হুজুর! ওঁর ভগ্নীপতিরই তো ঘোড়া।
আমার দম ফেলতে দেরি হয়। সেই নীলামওয়ালা ওর ভগ্নীপতি? সে ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই ছোটটা যোগ দেয়–আর ওনারই তো আস্তাবল হুজুর!
আমি আর কিছু বলি না, কেবল এই সংকল্প স্থির কির, যদি আমি গৌহাটিতে থাকতে থাকতেই সেই উপকারী ভদ্রলোকটি মারা যান, তাহলে আমার যাবতীয় কাজকর্ম গল্পের বই পড়া, বায়স্কোপ দেখা, চপকাটলেট খাওয়া এবং আর যা কিছু সব স্থগিত রেখে ওঁর শবযাত্রায় যোগ দেব। সব আমোদ-প্রমোদ ফেলে প্রথমে ঐ কাজ। সেদিনকার অ্যামিউজমেন্ট ঐ।
সহিসরা চলে যায়। আমি ঘোড়র দিকে তাকাই আর মাথা ঘামাই–কি গতি করব ওর? কিংবা ও-ই আমার কি গতি করে? এমন সময়ে ডাক্তারের আবির্ভাব হয় সেই পথে। আমাকে দেখে এক গাল হাসি নিয়ে তিনি এগিয়ে আসেন–এই যে! বেশ জীর্ণশীর্ণ হয়ে এসেছ দেখছি! একমাসেই দেখলে তো? তখনই বলেছিলাম! গোড়ায় চড়ার মতন ব্যায়াম আর হয় না। পায়ে হেঁটে কি এত হালকা হতে পারতে? আরও মুটিয়ে যেতে বরং। যাক, খুশি হলাম তোমার চেহারা দেখে! বাড়ি ফিরে মামাকে বোলো, মোটা রকম ভিজিট পাঠিয়ে দিতে আমায়।
মামা কেন, আমিই দিয়ে যাচ্ছি! সবিনয়ে আমি বলি, এই ঘোড়াটাই আপনার ভিজিট।
খুশি হলাম, আরো খুশি হলাম। ডাক্তারবাবু সত্যিই পুলকিত হয়ে ওঠেন, তা হোলে এবার থেকে আমার রুগী দেখার সুবিধেই হল।
ডাক্তারবাবু লাফিয়ে চাপেন ঘোড়ার পিঠে, ওঠার কায়দা দেখেই বুঝতে পারি এককালে ওই বদঅভ্যাস দস্তুরমতই ছিল ওঁর। পর মুহূর্তের তাকে আর দেখতে পাইনা। বিকালে হোটেলের সামনে আস্তে আস্তে পায়চারি করছি, তখন দেখি, মুহ্যমানের মতো তিনি ফিরছেন, হেঁটেই আসছেন সটান।
আপনার ঘোড় কি হল? ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করি। আমার দিকে বিরক্তিপূর্ণ দৃকপাত করেন তিনি।–এই হেঁটেই ফিরলাম। কতটুকুই রা পথ! চার মাইল তো মোটে। ঘোড়ায় চড়া ভালো ব্যায়াম বটে, কিন্তু বেশি ব্যায়াম কি ভালো? অতিরিক্ত ব্যায়ামে অপকারই করে, মাঝে মাঝে হাঁটতেও হয় ভাই! বলে তিনি আর দাঁড়ান না।
খানিক বাদে ডাক্তাবাবুর চাকর এসে বলে–গিন্নীমা আপনার ঘোড়া ফিরিয়ে দিলেন।
কিন্তু ঘোড়া কই? ঘোড়াকে তোমার সঙ্গে দেখছি না তো?
ঘোড়া যে কোথায় তা চাকর জানে না, ডাক্তারবাবুও জানেন না, তবে তার কাছ থেকে যা জানা গেছে তাই জেনেই কর্তার অজ্ঞাতসারেই গিন্নী এই মোটা ভিজিট প্রত্যার্পণ করতে দ্বিধা করছেন না। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গিন্নীপক্ষ যা জেনেছেন আমি তা কর্মবাচ্যের কাছ থেকে জানাবার চেষ্টা করি। যা পঙ্কোদ্ধার হয় সংক্ষেপে তা এই–অশ্বপৃষ্ঠে যত সহজে ডাক্তারবাবু উঠতে পেরেছিলেন নামটা ঠিক ততখানি সহজসাধ্য হয়নি, এবং যথাস্থানে তো নয়ই। দুচার মাইলের কথাই নয়, পাক্কা নয়, পাক্কা পনের মাইল গিয়ে ঘোড়াটা তাকে নামিয়ে দিয়েছে বললেও ভুল বলা হয়, ধরাশায়ী করে পালিয়েছে। কোথায় গেছে বলা কঠিন, এতক্ষণে একশ মাইল, দেড়শ মাইল কি এক হাজার মাইল চলে যাওয়া অসম্ভব না। কর্তা বলেণ একশ, গিন্নীর মতে দেড়শ, এক হাজার হচ্ছে চাকরের ধারণায়।
