প্রতুত্তরে সিপাই পা না সরিয়ে মৃদু একটু হাসল কেবল।
এরূপ অদ্ভুত ব্যাপার সাহেব জীবনে কখনো দেখিনি। সাহেবের হুমকিতে ভয় খায় না, অথচ পদাঘাতের প্রতিশোধ নেবারও চেষ্টা করে না, ভয়ও নেই ক্রোধও নয়–অপমান ও লাঞ্ছনার হাস্যতর এমন সমন্বয়ের সাক্ষাৎ এর আগে সে পায়নি। বিস্ময়ে এবং পরাজয়ে তার স্পর্ধা স্বভাবতই সঙ্কুচিত হয়ে এল। সে এবার গোবিন্দবাবুকে ইংরেজিতে বলল–তোমার বন্ধুকে পা তুলে নিতে বল।
গোবিন্দবাবুর আত্মসম্মানে আগাত লাগল। সেই সামান্য সিপাইটা তাঁর বন্ধু! দস্তরমত রাগ হল তার। তিনি গোবিন্দবাবু, হাকিমের দক্ষিণ হস্ত, আর এই সিপাইটা কিনা তার সমকক্ষ। ফিরিঙ্গির ওপর গোড়া থেকেই তিনি চটেছিলেন, এখন তার এই অমূলক সন্দেহে তিনি অসম্ভব ক্ষেপে গেলেন। দ্বিরুক্তি না করে উঠেই রাগের মাথায় তিনি ফিরিঙ্গিটার নাকের গোড়ায় এক ঘুসি কষিয়ে দিয়েছেন।
সারা ট্রামে হৈ-চৈ পড়ে গেল। ফিরিঙ্গিও আস্তিন গুটিয়ে দাঁড়াল। সেই গাড়িতে হিন্দু স্কুলের জনকতক ছাত্র যাচ্ছিল, তারা গোবিন্দবাবুর পক্ষ নিল। ফিরিঙ্গিটিকে হিড়হিড় করে রাস্তায় নামিয়ে তুলো ধুনাবার উদ্যোগ করল তারা।
যে সিপাইটি নিজের লাঞ্ছনায় এতক্ষণ নিরুদ্বিগ্ধ ও নির্বিকার ছিল, সাহেবের প্রতি অত্যাচারের সম্ভাবনায় সে এবার ব্যস্ত হয়ে Oh my boys বলে ছেলেদের সমোধন করে বক্তৃতা শুরু করে দিল। সেই বক্তৃতার মর্ম হচ্ছে সাহেবের কোন দোষ নেই। তাকে মারবার কোন অধিকার নেই আমাদের। কারকেই মারবার আমাদের অধিকার নেই। মানুষ যেন মাকে আঘাত না করে। তোমরা অন্যায় আচরণকারীকে ক্ষমা করতে শেখ, ভালবাসতে শেখ। ভালবাসার দ্বারাই অন্যায়কে জয় করা যায়। অহিংসা পরম ধর্ম–ইত্যাদি ইত্যাদি।
সিপাইয়ের মুখে ইংরেজির চোস্ত বুলি শুনে গোবিন্দবাবু তো হতভম্ব। এ যদি এমন চমৎকার ইংরেজি জানে তবে এতক্ষণ তা বলেনি কেন? তাহলে কি তাকে সারাদিন এমন হিন্দি কসরৎ করে এমন গলদঘর্ম হতে হয়? আহা, আগে জানলে ডারউইনের বিবর্তনবাদ কত ভাল করেই না একে বোঝান যেত। ছেলেরা নিরস্ত হল কিন্তু গোবিন্দবাবুর উন্মা যায় না। তিনি বললেন–ও কেন আমাদের পাশে বা তুলে দিল?
ও আরামের জন্য পা তুলেছে, আমিও আরাম পেয়েছি, পা তুলে দিয়েছি। শোধ-বোধ হয়ে গেছে।
আমি তো সেজন্য ওকে কিছু বলছি না।
লাঞ্ছনার হাত তেকে রক্ষা পেয়ে, এই অদ্ভুত লোকটির কথায় ও ব্যবহারে সাহেব চমৎকৃত হয়ে গেছল। সে সিপাইটির করমর্দন করে ধন্যবাদ জানিয়ে চলতি একজনের মোটরে চড়ে চলে গেল। সিপাইটি গোবিন্দবাবু ও ছেলেদের হয়ে সাহেবের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে।
ঠেঙাবার এমন দুর্লভ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় গোবিন্দবাবু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। তিনি সারা পথ আর বাক্যব্যয় করলেন না, সিপাইয়ের দিকে তাকালেন না পর্যন্ত। ভীতু কোথাকার। যদিও ভাল ইংরেজি বলতে পারে তবু তার কাপুরুষতাকে তো মার্জনা করা যায় না। তাকে গোখলের আস্তানায় পৌঁছে দিয়ে তিনি সটান বাড়ি ফিরলেন। সিপাইয়ের সঙ্গে বিদায়সম্ভাষণ পর্যন্ত করলেন না।
পরদিন গোখলের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি বললেন–আপনার সিপাই কিন্তু খাসা ইংরেজি বলতে পারে।
সিপাই কৌন? আরে মোহনদাস। তুমি সিপাহি বন গিয়া। বলে গান্ধীজীকে ডেকে গোখলে একচোট খুব হাসলেন। গান্ধীজীও হাসতে লাগলেন।
এত হাসাহাসির মর্মভেদ করতে না পেরে গোবিন্দবাবু অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন, কিন্তু তার পরমুহূর্তেই যখন রহস্যভেদ হল, সিপাহির যথার্থ পরিচয় তার অজ্ঞাত রইল না, তখন তিনি আরো কত বেশি অপ্রস্তুত হয়েছিলেন তা অনুমান করতে পার। বোধহয় পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোন মানুষ এতখানি অপ্রস্তুত হয়নি।
ঘোড়ার সঙ্গে ঘোরাঘুরি
আর কিছু না, একটু মোটা হতে শুরু করেছিলাম, অমনি মামা আমার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বললেন–সর্বনাশ! তোর খুড়তুতো দাদামশাই–কী সর্বনাশ!
কথাটা শেষ করবার দরকার হয় না। আমার মাতুলের খুড়ো আর জ্যেঠা স্থূলকায়তায় সর্বনাশের জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। নামের উল্লেখেই আমি বুঝতে পেরে যাই।
খুড়তুতো দাদামশায়ের বুকে এত চর্বি জমে ছিল যে হঠাৎ হার্টফেল হয়েই তাঁকে মারা যেতে হল, ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন হয়নি। জ্যেঠতুতো দাদামশাইয়ের বেলা ডাক্তার এসেছিলেন কিন্তু ইনজেকশন করতে গিয়ে মাংসের স্তর ভেদ করে শিরা খুঁজে না পেয়ে, গোটা তিনেক উঁচ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গচ্ছিত রেখে, রাগে-ক্ষোভে-হতাশায় ভিজিট না নিয়েই রেগে প্রস্থান করেছিলেন। রেগে এবং বেগে।
যে বংশের দাদামশায়দের এরূপ মর্মভেদী ইতিহাস, সে বংশের নাতিদের মোটা হওয়ার মতো। ভয়াবহ আর কী হতে পারে? কাজেই আমার নাতিবৃহৎ হওয়ার লক্ষণ দেখে বড়মামা বিচলিত হয়ে পড়েন।
প্রতিবাদের সুরে বলি কি করব! আমি কি ইচ্ছে করে হচ্ছি?
উঁহু, আর কোনো অসুখে ভয় খাই না। কিন্তু মোটা হওয়া–বাপস! অমন মারাত্মক ব্যাধি আর নেই। সব ব্যায়রামে পার আছে, চিকিচ্ছে চলে; কিন্তু ও রোগের চিকিচ্ছেই নেই। ডাক্তার কবরেজ হার মেনে যায়। হুঁ!
অগত্যা আমাকে চেঞ্জে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, রোগা হবার জন্য। লোকে মোটা হবার জন্যেই চেঞ্জে যায়, আমার বেলায় উল্টো উৎপত্তি। গৌহাটিতে বড় মামার জানা একজন ভালো ডাক্তার থাকেন; তার কাছেই যেতে হয়। তিনিই আমায় রোগা-রোগা করে আরোগ্য করার ভার নেন–।
