কিন্তু কি করবেন? গোখলের অনুরোধ। আগের দিনই তিনি গোখলের দূর সম্পর্কীয় এক আত্মীয়কে কলকাতা দর্শন করিয়েছেন। সে লোকটি গুজরাটের কোন এক তালুকের দারোগা। সে তবু কিছু সভ্য-ভব্য ছিল, হাজার হোক দারোগা তো! কিন্তু এ লোকটা? গান্ধীজির দিকে দৃষ্টিপাত করে গোবিন্দবাবু বিরক্তি গোপন করতে পারলেন না। বোধহয় কোন সিপাই-টিপাই কি দারোয়ানই হবে বোধ হয়! গোভলের আত্মীয়স্বজন, ভাই-বন্ধু-তাঁর প্রদেশের তাবৎ লোকের ওপর গোবিন্দবাবু বেজায় চটে গেলেন। তাদের কলকাতা আসার প্রবৃত্তিকে তিনি কিছুতেই মার্জনা করতে পারছিলেন না।
যাই হোক, নিতান্ত অপ্রসন্নমনে সিপাইকে লেজে বেঁধে গোবিন্দবাবু নগর ভ্রমণে বার হলেন। এই ভেবে তিনি নিজেকে সান্তনা দিলেন যে রাস্তার লোকে এও তো ভেবে নিতে পারে যে, এ তাঁর নিজেরই সেপাই। গোবিন্দবাবু আজ বডি গার্ড সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছেন তাদের এই সাময়িক ভুল বোঝার ওপর কিঞ্চিৎ ভরসা করে তিনি কিঞ্চিৎ আত্মপ্রসাদ পাবার চেষ্টা করলেন।
পরেশনাথ মন্দিরের কারুকার্য্য, সেখানকার মাছের লাল, নীল ইত্যাদি রং বেরং হবার রহস্য, মনুমেন্ট কেন অত উঁচু হয়, কলকাতার গঙ্গা কোন কোন প্রদেশ পেরিয়ে এসেছে, হাওড়া-পুল কেন জলের ওপর ভাসে আর ভাসা পুল কেন যে ডুবে যায় না তার বৈজ্ঞানিক কারণ ইত্যাদি কলকাতা শহরের যা কিছু দ্রষ্টব্য ও জ্ঞাতব্য ছিল লোকটাকে তিনি ভাল করে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন।
ওকে ক্রমশই তার ভাল লাগছিল। এমন সমঝদার শ্রোতা তিনি বহুদিন পাননি। এমন কি কালকের সেই দারোগাটিও এমন নয়। দারোগাটি তবু মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করার প্রয়াস পেয়েছে বলেছে অত বড় মনুমেন্ট কেবল ইটের বাজে খরচ, মানুষ যদি না থাকল ত অত উঁচ করার ফায়দা কি! বলেছে মাছের ঐ লাল, নীল রং সত্যিকার নয়, রাত্রে লুকিয়ে রং লাগিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। এই সিপাইটি সে রকম না; তিনি যা বলেন তাতেই ঘাড় নেড়ে এ সায় দেয়। তবে অসুবিধার কথা এই যে কালকের দারোগাটি তবু কিছু ইংরেজি বুঝত, ইংরেজির সাহায্যে তাকে বোঝানো সহজ ছিল কিন্তু এ সিপাই ত ইংরেজির এক বিসর্গও বোঝে না। অথচ হিন্দিতে সমস্ত বিষয়ে বিশদ করতে গিয়ে গোবিন্দবাবুর এবং হিন্দি ভাষায় প্রাণান্ত হচ্ছিল।
গোবিন্দবাবু সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়লেন মিউজিয়ামে গিয়ে। চিড়িয়াখানায় তেমন কিছু দুর্ঘটনা হয়নি, কেন না, জন্তু জানোয়ারের অধিকাংশই উভয়ের কাছে অজ্ঞাতকুলশীলে নয়। ই হাঁথি, বান্দর–এই বলে তাদের পরিচিত করার পরিশ্রম গোবিন্দবাবুকে করতে হয়নি! কিন্তু মিউজিয়ামে গিয়ে বাঁদরের পূর্ব্বপুরুষ থেকে কি করে ক্রমশ মানুষ দাঁড়াল তার বিভিন্ন জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত দেখিয়ে ডারুইনের বিবর্তনবাদ বোঝাতে গোবিন্দবাবুর দাঁত ভাঙবার যোগাড় হল। কিন্তু সিপাইটির ধৈর্য ও জ্ঞান-তৃষ্ণা আশ্চর্য বলতে হবে। গোবিন্দবাবু যা বলেন তাতেই সে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, আর–সমঝাতা হ্যায়, সমঝাতা হ্যায়।
সমস্ত দিন কলকাতা শহর আর হিন্দি বাতের সঙ্গে রেষারেষি করে গোবিন্দবাবু পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মাঝে মাঝে ছ্যাকরা গাড়ির সাহায্যে নিলেও অধিকাংশ পথ তাদের হেঁটেই মারতে হয়েছিল। ফিরবার পথে গোবিন্দুবাবু স্থির করলেন আর হাঁটা নয়, এবার সোজা ট্রামে বাড়ি ফিরবেন। সারাদিনের ধস্তাধস্তিতে গোবিন্দবাবু কাবু হয়ে পড়লেও সিপাইটির কিছুমাত্র ক্লান্তি দেখা গেল না।
অশ্ব-বাহন ছেড়ে কলকাতায় তখন প্রথম বিদ্যুৎ বাহনে ট্রাম চলছে। গোবিন্দবাবু ট্রামে উঠলেন বটে, কিন্তু সিপাইটি যে তার পাশে বসে এটা তাঁর অভিরুচি ছিল না। যদি চেনাশোনা লোকের সঙ্গে দৈবাৎ চোখাচোখি হয়ে যায়। কিন্তু সিপাইটির যদি কিছুমাত্র কান্ডজ্ঞান থাকে। সে আম্লানবদনে কিনা তার পাশেই বসল। তার আস্পর্ধা দেখে গোবিন্দবাবু মনে মনে বিরক্ত হলেন এবং সংকল্প করলেন আর কখনও গোখলের বাড়ির ছায়া মাড়াবেন না।
তাঁদের মুখোমুখি আসনে একজন ফিরিঙ্গি বসেছিল, তার কি খেয়াল হল, সে হঠাৎ গোবিন্দবাবু এবং সিপাইয়ের মধ্যে যে জায়গাটা ফাঁক ছিল, সেইখানে তার বুটসুদ্ধ পা সটান চাপিয়ে দিল।
গোবিন্দবাবু বেজায় চটে গেলেন। ফিরিঙ্গিটার অভদ্রতার প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা থাকলেও ওর হোকা চেহারার দিতে তাকিয়ে একা কিছু করবার উত্সাহ তাঁর হচ্ছিল না। সিপাইটির দিকে বক্র কটাক্ষ করলেন, কিন্তু তার রোগাপটকা শরীর দেখে সেদিক থেকেও বড় একটা ভরসা পেলেন না। অগত্যা তিনি নীরবে অপমান হজম করতে লাগলেন।
কিন্তু একটু পরে তিনি যে প্রভাবিত দৃশ্য দেখলেন তাতে তার চক্ষু স্থির হয়ে গেল। সিপাইটি করেছে কি, তার ধূলিধূসারিত চরণযুগল সোজা সাহেবের পাশে চাপিয়ে দিয়েছে। বাবাঃ সিপাইটির সাহস তো কম নয়, তিনি মনে মনে তার তারিফ করলেন। সামান্য নেটিভের সুঃসাহস দেখে ফিরিঙ্গিটাও বুঝি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তার ফেরঙ্গ স্বভাব চাড়া দিয়ে উঠল। সে রুক্ষ স্বরে হুকুম করলে- এইও! গোর হঠা লেও!
সিপাইটি কোন জবাবও দেয় না, পাও সরায় না; যেন শুনতেই পায়নি সে।
সাহেব সিপাইয়ের পাজরায় বুটের ঠোক্কর মেরে বলল–এই! তুম! শুনতা নেহি?
