সঙ্গে সঙ্গে আবার জ্যাঠামশায়ের নাসিকা বাদ্য বেজে উঠল। বড়দির আড়াল দিয়ে আমিও বিপদ-সঙ্কুল কক্ষ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করলাম।
বাইরে এসে হাঁফ ছেড়ে দেখি ভোর হতে আর বাকি নেই–সুদূর আকাশে মুক্তাভা দেখা দিয়েছে। রাত দুটো থেকে এই ভোর পাঁচটা, ওই ঘরে আমি কেবল ঘুরেছি– পায়ে মিটার বাঁধা ছিল না, নইলে জানা যেত কত মাইল মোট ঘুরলাম? তিন ঘন্টায় তিরিশ মাইল তো বটেই।
বড়দি করুণ কণ্ঠে বললেন, তুমি তো থার্মোমিটার আনতে বছর কাটিয়ে দিলে, এদিকে দেখ এসে, খোকা কেমন করছে।
দেখেই বুঝলাম আর না দেখলেও চলে খোকার শেষ-মুহূর্ত সন্নিকট! যে সময়ে আমি এনডিওরেস হামাগুড়ির রেকর্ড সৃষ্টি করছিলাম, আমার ভাগ্নের অদৃষ্টে সেই সময়ে অন্যবিধ এনজিওরেনস পরীক্ষা চলছিল। দেখলাম, বড়দি নিজেই কোনো রকমে স্টোভ ধরিয়ে নিয়েছেন, ইতিমধ্যে। দু-দু বার খোকার বুকে পুলটিস দেওয়া হয়ে গেছে। ওষুধের দিকে তাকিয়ে দেখি গোটা বোতলটা ফাঁক। ওষুধের কি হল জিজ্ঞাসা করতেই বড়দি জানালেন, দশ মিনিট অন্তর এক চামচ করে খাওয়ানো হয়েছে, তবু তো কই কোন উপকার দেখা যাচ্ছে না। আমি বললাম, উপকার দেখা যেত যদি থোকার বদলে তুমি খেতে। হাত টিপে দেখলাম, কিন্তু খোকার নাড়ি পেলাম না। খোকার আর অপরাধ কি, যে এক বোতল হুপিংকাফ একিওর ওকে উদরস্থ করতে হয়েছে, তাতে কি আর ওর নাড়ি-ভুড়ি হজম হতে বাকি আছে? তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন করলাম–আমাদের খোকা মারা যাচ্ছে ।
পায়জামা পরনেই ডাক্তার ছুটে এলেন, পরীক্ষা করে বললেন, না, মারা যাচ্ছে না। তাছাড়া এর হুপিং কাফই হয়নি। দেখি বলে খোকার গলার কাছে সুড়সুড়ি দিতেই খোকা বেদম কাশতে শুরু করল এবং কাশির ধমকে বেরিয়ে এল সুক্ষ্মতম কি একটা জিনিস। হাতে নিয়ে ভাল করে দেখে ডাক্তার বললেন, এ তো পাইন কাঠের টুকরো দেখছি! খোকা বোধ হয় পাইন কাঠের কিছু চিবুচ্ছিল–তার ভগ্নাংশ ভেঙে গলায় গিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।
ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বড়দি বললেন, হুপিংকাশি নয়, তাহলে এটা কি কাশি? বড়দির ক্ষোভের কারণ ছিল, সমস্ত রাত ধরে এক সঙ্গে হুপিংকাফ, নিউমোনিয়া ও সর্দিগর্মির চিকিৎসার পর সেই প্রাণান্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হয়েছে জানলে বার না দুঃখ হয়?
আমি উত্তর দিলাম, এক রকমের কাষ্ঠ-হাসি আছে জানো তো বড়দি? এটা হচ্ছে তারই ভায়রা ভাই কাষ্ঠ-কাশি।
গোখলে, গান্ধিজী ও গোবিন্দবাবু
মহাত্মা বলে সর্বসাধারণে পরিচিত ও পুজিত হবার ঢের আগে থেকেই গান্ধীজি যে যর্থাথ অর্থে মহান আত্মা, তার পরিচয় এই গল্পে তোমরা পাবে। যিনি এই গল্পের জন্য নায়ক, এক গৌণ চরিত্র, তার নিজের মুখ থেকে এ কাহিনীটি শোনা আমার।
গোবিন্দবাবু সেই সময়ে কলকাতার একজন সাধারণ আপিসের কেরানী। তার আসল নাম অবশ্য গোপন রাখলাম। এখন তিনি বড় পদে প্রতিষ্ঠিত যে তার নাম করলে অনেকেই তাকে চিনতে পারবেন।
বহুদিন আগেকার কথা। গোখলে সেই সময়ে ভারতবর্ষের নেতা। সেই গোখলের কলকাতাবাসের সময়ে তাকে পছন্দসই বাসা খুঁজে দিয়েছিলেন, এই সূত্রে গোখলের সঙ্গে আমাদের গোবিন্দবাবুর ঘনিষ্ঠতা গজায়।
ঘনিষ্ঠতা দিনদিনই দারুণতর হয়ে উঠছিল। কেন না, গোখলের দেশ থেকে যখনই তার আত্মীয়-গোষ্ঠীর কেউ আসে, গোখলে তাঁকে কলকাতা দেখবার ভার গোবিন্দবাবুর ওপর দেন। গোবিন্দবাবুকে গোখলের অনুরোধ রাখতে হয়। অত বড় দেশমান্য ব্যক্তির ভাড়াটে বাড়ি যোগাড় করে দেবার সুযোগ লাভ করে তিনি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করেছিলেন, এখন তার দেশোয়ালিদের কলকাতা দেখিয়ে আপনাকে কৃতার্থ বোধ করেন।
তাঁর ফরমাস খাটতে পেলে গোবিন্দবাবু যে আপ্যায়িত হন এটা বোধ করি গোখলে বুঝতে পেরেছিলেন। তাই গোবিন্দুবাবুকে বাধিত করবার সামান্য সুযোগও তিনি অবহেলা করতেন না। যখনই পোরবন, কি পুণা, কি ভুসাওয়াল থেকে কোন অতিথি আসত, গোখলে বলতেন, গোবন্দবাবু ইনকো কলকাত্তা তো কুছ দেখলা দিজিয়ে!
গোবিন্দবাবু অত্যন্ত উৎসাহের সহিত ঘাড় নাড়তেন। কিন্তু সেই অদৃষ্ট পূর্ব্ব অপরিচিত অভ্যাগতকে কলকাতায় দৃশ্য ও দ্রষ্টব্য দেখিয়ে বেড়াতে সেই উৎসাহের কতখানি পরে বজায় থাকত তা বলা কঠিন।
সেই সময়ে গান্ধীজি আফ্রিকা থেকে সবে স্বদেশে ফিরেছেন, তাঁর কীর্তি- কাহিনী সমস্ত শিক্ষিত ভারতবাসীর মনে শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের সঞ্চার করেছে। যদিও আপামর সাধারণের কাছে তার নাম তখন পৌঁছেনি, তবু তাঁর অদ্ভুত চরিত্র, জীবনযাত্রা ও কর্ম-প্রণালীর কথা ক্রমশ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল। ভারতবর্ষে ফিরেই গান্ধীজি গুজরাট থেকে কলকাতায় এলেন গোখলের সঙ্গে দেখা করতে।
সেই তাঁর প্রথম কলকাতায় আসা। কাজেই গোখলের স্বভাবতই ইচ্ছা হল গান্ধীজিকে কলকাতাটা দেখানোর। এ কাজের ভার আর কার ওপর তিনি দেবেন? এই কাজের উপযুক্ত আর কে আছে ওই গোবিন্দবাবু ছাড়া? এতএব গোবিন্দবাবুকে ডেকে অনুরোধ করতে তার বিলম্ব হল না।
মোহনদাসকো কলকাত্তা তো দেখলা দিজিয়ে!–শুনে গোবিন্দবাবু কিন্তু নিজেকে এবার অনুগৃহীত মনে করতে পারলেন না। গান্ধীজির পুরো নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যদিও গোবিন্দবাবুর কানে গান্ধীজির খ্যাতি পৌঁছেছিল, তবু কেবল মোহনদাস থেকে তিনি বুঝতে পারলেন না যে তিনি সেই বিখ্যাত ব্যক্তিটিরই গাইড হবার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তাছাড়া গোখলের কথায় তিনিই সকালে গিয়ে লোকটাকে স্টেশন থেকে এনেছেন–থার্ড ক্লাসের যাত্রী, পরণে মোটা কাপড়)–তাও আবার আধময়লা, পায়ে জুতো নেই, মলিন অপরিচ্ছন্ন চেহারা–এ সব দেখে লোকটার ওপর তার শ্রদ্ধার উদ্রেক হয়নি। সেই লোকটাকে সঙ্গে নিয়ে সারা কলকাতা ঘুরতে হবে ভেবে গোবিন্দবাবুর উৎসাহ উপে যাবার যোগাড়!
