পার্কের ওধার একটা গ্যাসের বাতি খারাপ হয়ে দপদপ করছিল। প্রায় নিভবার মুখেই আর কি। বাতির অবস্থা দেখে দাদুর অবস্থা ওর মনে পড়ে। তার জীবন প্রদীপও হয়তো ওই বাতির মতোই–ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে টুসি।
সর্বনাশ। পোকার–সে যে জ্যাঠামশায়ের ঘরে।
আমি তা জানতাম। তাহলে কি হবে? যাও তুমি নিয়ে এসগে। নইলে তো স্টোভ ধরবে না।
বাবা। জ্যাঠামশায়ের ঘরে আমি যাব না, তার চেয়ে আমি চ্যাচাব।
না না, তোমায় চাচাতে হবে না। আমিই যাচ্ছি।
ওই সঙ্গে তাক থেকে থার্মোমিটারও এনে, জ্বর দেখতে হবে।
খোকার গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, বেশ গরম। পোকার আনি আর না আনি, থার্মোমিটার দেখা দরকার। নিঃশব্দ পদসঞ্চারে জ্যাঠামশায়ের কক্ষে ঢুকলাম, দরজা খোলাই ছিল। অন্ধকার ঘরের মধ্যে জীবন্ত একমাত্র নাসিকা কাজে ব্যাঘাত না ঘটিয়েই যদি থার্মোমিটার বাগিয়ে আনতে পারি, তাহলেই আজ রাত্রের ফাড়া কাটল।
কাছাকাছি এক বেড়াল শুয়েছিল, অন্ধকারে তো দেখা যায় না, পড়বি তা পড় তার ঘাড়েই দিয়েছি এক পা। সঙ্গে সঙ্গে হতভাগা চেঁচিয়ে উঠেছে মাও।
শুনেছি বেড়ালের দৃষ্টি অন্ধকারেই ভাল খেলে, ওরই আগে থেকে আমাকে দেখা উচিত ছিল। আমার পথ থেকে অনায়াসেই সরে যেতে পারতো। নিজে দোষ করে নিজেই আবার তার প্রতিবাদ–আমার এমন রাগ হল বেড়ালটার উপর, দিলেম ওকে কষে এক শুট, মহামেডান স্পোর্টিং এর সামাদের মতন।
আমার শুটটা গিয়ে লাগল চেয়ারে, সেখানেই সে সেটা দাঁড়িয়েছিল জানতাম না। পাজি বেড়ালটা এবার ঠিক নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। শুটের প্রতিক্রিয়া থেকে কোনো রকমে আমি টাল সামলে নিলাম কিন্তু চেয়ারটা চিৎপাত হল।
এই সব গোলমালে নাসিকা গর্জ্জন গেল থেমে, কিন্তু আমার হৃৎকম্প আরম্ভ হল সেইসঙ্গে। ভাবলাম, নাঃ, হামাগুড়ি দিয়ে চার-পেয়ের মতো চলি, তাতে ধাক্কাধুকি লাগবার ভয় কম, সাবধানেও চলা যাবে, জ্যাঠামশায়ের নিদ্রা এবং নাসিকা গর্জনের হানি না ঘটিয়ে নিঃশব্দে থার্মোমিটারটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারব। একটু পরেই আবার নাক ডাকতে লাগল–আমিও নিশ্চিন্ত হয়ে হামাগুড়ি প্র্যাকটিস শুরু করলাম।
প্রথমেই একটা বস্তুর সংঘর্ষে দারুণভাবে মাথা ঠুকে গেল হাত দিয়ে অনুভব করলাম ওটা চেয়ার। সব জিনিসেরই দুটো দিক আছে– সুবিধার দিক এবং অসুবিধার দিক; অন্ধকার হামাগুড়ি অভিযানে পা সামলানো যায় বটে, কিন্তু মাথা বাঁচানো দায়। যাক, গোল টেবিলটা এতক্ষণে পেয়েছি, এবার হয়েছে, ঘরের মধ্যিখানে পৌঁছে গেছি–এখানে থেকে সোজা উত্তরে গেলেই সেই তাক যেখানে থার্মোমিটার আছে। না তাকালেও পাবো।
অনেকটা তো গুঁড়ি দেওয়া হল– কিন্তু তাক কই? ভাল করে তাক করতে গিয়ে টেবিলটাকে পুনরাবিষ্কার করলাম–এবার মাথা দিয়ে-এবং রীতিমতন ভড়কে গেলাম। একি, এখনো আমি ঘরের মধ্যিখানেই ঘুরছি? আহত মাথায় হাত বুলোত বুলোতে ভাবতে লাগলাম কি করা যায়?
নতুন উদ্যমে আবার যাত্রা শুরু করলাম। এই তো টেবিল–এই একটা চেয়ার, এটা? এটা জ্যাঠামশায়ের পিকদানি–ছিঃ। যাকগে, হাতে সাবান দিলেই হবে–এই তো দেয়াল, এই আরেকখানা চেয়ারঃ এই গেল গিয়ে সোফা-–এ কি? ঘরে তো একটা সোফা ছিল বলেই জানতাম, নাঃ, এবার হতভম্ব হতে হল আমাকে। যে ঘরে দিনে দশবার আসছি যাচ্ছি, তাতে এত লুকোনো সম্পত্তি ছিল জানতাম না তো। আরেকটু এগিয়ে দেখতে হল–আরো কি অজ্ঞাত ঐশ্বর্য উদ্ধার হয়। এই যে দেখছি আরেকখানা চেয়ার ঘরে আজ এত চেয়ারের আমদানি হল কোত্থেকে। এই যে ফের আরেকটা পিকদানি–ছিঃছি, এ-হাতটাতেও সাবান লাগাতে হল আবার। ছ্যাঃ।
নাঃ, এবার এগুতে সত্যিই ভয় করছিল। ঘরে আজ যে করম পিকদানির আমদানি তাতে আর বেশি পরিভ্রমণ নিরাপদ নয়। দরজাটা কোন দিকে? এবার বেরুতে পারলে বাঁচি আর থার্মোমিটারে কাজ নেই বাবা। উঠতে গিয়ে মাথায় লেগে গেল–এ কোনখানে এলাম? টেবিলের তলায় নাকি? টেবিলটা তো ছোট এবং গোল বলেই জানতাম–এ যে, যেখানে যত ঘুরে ফিরেই উঠতে যাই মাথায় লাগে। ঘরের ছাদ নোটিস না দিয়ে হঠাৎ এত নীচে নেমে আসবে বলে তো মনে হয় না। তবে আমার দণ্ডায়মান হবার বাধা এই দীর্ঘ-প্রস্থ বস্তুটি কি? এটাকে নিয়ে ঠেলে উঠব, যাই থাক কপালে।
যেই চেষ্টা করা, অমনি সহসা জ্যাঠামশায়ের নাসিকাধ্বনি স্থগিত হল। ক্ষণপরেই তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন–চোর চোর। ডাকাত। খুনে! ভূমিকম্প! ভূমিকম্প! খুন করলো।
ও বাবা। আমি জ্যাঠামশায়ের তক্তপোশের তলায়–কী সর্বনাশ। তাঁকে শুদ্ধ নিয়ে উঠবার চেষ্টায় ছিলাম। এখন তাঁকে অভয় দেওয়া দরকার। বোঝান দরকার চোর নয়, ডাকাত নয়, ভূমিকম্প নয়–অন্য কিছু নগণ্য কিছু। মিহি সুরে ডাকলাম–মিঁয়াও।
জ্যাঠামশাই যে খুব ভরসা পেয়েছেন এমন বোধ হল না। এবার গলা ফুলিয়ে ডাকতে হল–ম্যাঁ–ও।
বড়দি হ্যারিকেন হাতে ঢুকলেন। জ্যাঠামশাই ভীতিবিহ্বল কণ্ঠে বললেন, দেখতে সুশী, আমার তক্তপোশের তলায় কি?
বড়দি আমাকে পর্যবেক্ষণ করে আশ্বাস দিলেন, ও কিছু না, জয়ঠামশাই, একটা ইঁদুর, আপনি ঘুমান!
জ্যাঠামশাই সন্দিগ্ধস্বরে বললেন, ইঁদুর আমার চৌকি ঠেলে তুলবে? ইঁদুরের এত জোর–একি হতে পারে?
বড়দি বললেন, ধাড়ি ইঁদুর যে।
ধাড়ি ইঁদুর! একটু আগে বেড়ালের ডাক শুনলাম যেন। বেড়াল ইঁদুর এক সঙ্গে ওরা যে খাদ্য খাদক বলেই আমার জানা ছিল। যাকগে আলোটা নিয়ে যা আমার সামনে থেকে–ঘুম পাচ্ছে।
