আমার মনে বৈরাগের উদয় হল, বললাম–বেশ আমার কথার চেয়ে বিজ্ঞাপনেই যখন তোমার বেশি বিশ্বাস তখন আজই আমি এক ডজন ছড়ির অর্ডার দিচ্ছি, তুমি রোজ একটা করে থোকাকে খাওয়াও। আহার ওষুধ দুই হবে। বলে বিনা ছড়ি হাতেই বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির থেকে।
জীবনটা বিড়ম্বনা বোধ হতে লাগল। সারা দিন আর বাড়ি ফিরলাম না। ওয়াই, এম, সি. এ-তে সকালের লাঞ্চ সারলাম, তারপর সোজা কলেজে গেলাম, সেখান থেকে এক বন্ধু বাড়ি বিকেলের জলযোগ পর্ব সেরে চলে গেলাম খেলার মাঠে। মোহনবাগান ম্যাচ জেতায় যে ফুর্তিটা হল, ক্লাবে গিয়ে ঘন্টা দু ব্রিজ খেলায় হেরে গিয়ে সেটা নষ্ট করলাম। সেখান থেকে গেলাম সিনেমার সাড়ে নটার শোয়ে।
রাত বারোটায় বাড়ি ফিরে সদর দরজা খোলাই পেলাম। হাঁকডাক করতে হল না, হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। জ্যাঠামশাই ভারি বদরাগী মানুষ, তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত হলে আর রক্ষা নেই। পা টিপে টিপে নিজের ঘরের অভিমুখে যাচ্ছি বড়দি কোথায় ওৎ পেতে ছিলেন জানি না, অকস্মাৎ এসে আক্রমণ করলেন।
শিবুরে, খোকা বুঝি আর বাঁচে না।
বড়দির অতর্কিত আক্রম, তার পরেই এই দারুণ সুঃসংবাদ–আমি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লাম।-কেন, কেন, কি হয়েছে? ছড়িটা গিয়ে ফেলেছে না কি?
বিপদের মুহূর্তে সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের কথাই আগে মনে পড়ে। ছড়িটার দুর্ঘটনা আশঙ্কা করলাম।
না না, ছড়ির কিছু হয়নি।
স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞাসু নেত্রে বড়দির দিকে দৃষ্টিপাত করলাম যাক, ছড়ির কোন অঙ্গহানি হয়নি তো। বাঁচা গেছে।
না, ছড়ির কিছু হয়নি, তবে সন্ধ্যে থেকে খোকা ভারি কাশছে– ভয়ানক কাশছে। হুপিংকাফ হয়েছে ওর–নিশ্চয়ই হুপিংকাফ। কি হবে ভাই?
এতক্ষণে মুরব্বি চাল দেবার সুযোগ এসেছে আমার। গভীরভাবে ঘাড় নেড়ে বললাম, তখনই তো বলেছিলাম সকালে। তা তুমি গ্রাহ্যই করলে না। তখন পাইনের হাওয়ায় কত কি উপকারিতার কথা আমায় শুনিয়ে দিলে। এখন ঠেলা সামলাও।
লক্ষ্মি দাদাটি, তোমাকে একবার ডাক্তার বাড়ি যেতে হবে এখুনি।
এত রাত্রে? অসম্ভব, ডাক্তার কি আর জেগে বসে আছে এখন? তার চেয়ে এক কাজ কর না বড়দি?
ব্যগ্রভাবে বড়দি প্রশ্ন করলেন, কি, কি?
পাইনের হাওয়ায় যক্ষ্মা সারে, আর হুপিং সারবে না? ছড়িটা দিয়ে থোকা কষে হাওয়া কর না কেন?
বড়দি রোষ কষায়িত নেত্রে আমার দিকে দৃকপাত করলেন–না তোমাকে যেতেই হবে ডাক্তারের কাছে। নইলে জ্যাঠামশাইকে জাগিয়ে দেব। এই ডাক ছাড়লাম–ছাড়ি?
না না, রক্ষে কর–দোহাই। যাচ্ছি ডাক্তারের কাছে।
খোকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলাম। হ্যাঁ, হুপিংকাফ, নিশ্চয়ই তাই, ছড়ি খেলে হুপিংকাফ হবে, জানা কথা। কি কাশিটাই না কাশছে, নিজের নাক ডাকার আওয়াজে শুনতে পাচ্ছে না তাই, নইলে এই কাশির ধ্বনি কানে গেলে জ্যাঠামশাই নিশ্চয় ক্ষেপে উঠতেন। কিম্বা উঠে ক্ষেপতেন।
গেলাম ডাক্তারের কাছে–ভাগ্যক্রমে দেখাও হল। কাল সকালে তিনি খোকাকে দেখতে আসবেন। এখন এক বোতল পেটেন্ট হুপিংকাফ-কিওর দিলেন, ব্যবস্থাও বাতলে দিলেন। বড়দিকে বললাম, এই ওষুধটা এক চামচ তিন ঘন্টা বাদ বাদ খাওয়াতে হবে।
তিন ঘন্টা বাদ বাদ? ওতে কি হবে? অসুখটা কতখানি বেড়েছে দেখছ না? ঘন্টায় ঘন্টায় খাওয়ালে যদি বাঁচে থোকা।
বেশ, তাই খাওয়াও। আমি এখন ঘুমুতে চললাম।
ঘন্টাখানেক চোখ বুজেছি কি না সন্দেহ, বড়দির ধাক্কায় জেগে উঠলাম।
আঃ, কি ঘুমুচ্ছিস মোষের মতো? এদিকে খোকার যে নাড়ি ছাড়ে।
ধড়মড়িয়ে উঠলাম–তাই নাকি? যতটুকু নাড়ি জ্ঞান তাই ফলিয়েই বুঝলাম নাড়ি বেশ টন টন করছে। বড়দিকে সে কথা জানাতেই তিনি আগুন হয়ে উঠলেন, জ্যাঠামশায়ের ভয়ে চাঁচাতে পারলেন না এই যা রক্ষা। জিজ্ঞাসা করলাম, ওষুধ খাইয়েছে?
হ্যাঁ দু চামচ।
এক ঘণ্টায় দু চামচ? বেশ করেছ।
শিবু, খোকার বুকে সেই পুলটিসটা দিলে কেমন হয়? অন্টি ফুজিস্টিন– যেটা জ্যাঠামশায়ের নিউমোনিয়ার সময় দেওয়া হয়েছিল–এখনো তো এক কৌটো রয়ে গেছে। দেব সেটা?
আমি বললাম, ডাক্তার তো পুলটিস দিতে বলেনি।
বড়দি বললেন, ডাক্তার তো জানে। সেটা দিয়ে কিন্তু জ্যাঠামশায়ের খুব উপকার হয়েছিল, আমি নিজে দেখেছি। তুই স্টোভ জ্বাল, আমি ফ্লানেল যোগাড় করি।
আমি ইতস্তত করছি দেখে বড়দি অনুচ্চ-চিল্কারের একটা নমুনার দ্বারা জানিয়ে দিলেন, স্টোভ না ধরালেই তিনি অকৃত্রিম আর্তনাদে জ্যাঠামশায়ের নিদ্রাভঙ্গ ঘটাবেন। আমি ভারি সমস্যার মধ্যে পড়লাম–যদি বা খোকা বাঁচতে, বড়দির চিকিৎসার ঠেলায় সকাল পর্যন্ত–মানে ডাক্তার আসা পর্যন্ত–টেকে কিনা সন্দেহ। অথচ বড়দির চিকিৎসায় সহায়তা না করলে আরেক বিপদ। ওদিকে খোকার মৃত্যু, এদিকে আমার অপঘাত-আমি স্টোভ ধরাতেই স্বীকৃত হলাম।
পুলটিসের হাত থেকে থোকার পরিত্রাণের একটা ফন্দি মাথায় এল। স্টোভ ধরাতে গিয়ে বলে উঠলাম–এই যে, ধরচে না তো। যা ময়লা জমেছে বানারে। পোকারটা দাও তো বড়দি?
ঘেউৎকারে গলা ফাটিয়ে, নিরাপদ বেষ্টনীর মধ্যে শিকার এখন। শিকের রেলিং ডিঙিয়ে, কি তার কায়দার দরজা খুলে-ভেজিয়ে ভেতরে ঢোকার কৌশল তো ওর জানা নেই। বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিতান্তই জিহ্বা-আস্ফালন এবং ল্যাজ-নাড়া ছাড়া আর উপায় কি।
