গোবর্ধন হাসে–রুমালকে আর প্যারাসুট বানাতে হয় না। তুমি হাসালে দাদা! বলে রুমালটাও সে হাতিয়ে নেয়।
এখন কোনো ভূমিকম্পটম্প হবে না তো রে? সে রকম কোনো সম্ভাবনা নেই, কী বলিস?
একদম না। এ ধারটায় অনেকদিন ও-সব হয়নি আমি শুনেছি।
তাহলে তুই এবার রিভলভার বাগিয়ে দাঁড়া, আমি লোকটাকে ছুটে গিয়ে জোরসে এক ধাক্কা লাগাই।
ওই কমমোটি কোরো না দাদা! দোহাই! তাহলে ও তোমায় জড়িয়ে নিয়ে পড়বে, আর পড়তে পড়তেই, কায়দা করে আকাশে উলটে গিয়ে তোমাকে তলায় ফেলে তোমার ওপরে গিয়ে পড়বে তারপর। তোমার দেহখানি দেখহ তো! ওই নরম গদির ওপরে পড়লে ওর কিছুই হবে না। লাগবে
একটুও। তুমিই ছাতু হয়ে যাবে দাদা মাঝ থেকে। গৌহাটি এসে আমাকে এমন ভাবে দাদৃহারা কোরো না তুমি রক্ষে করো দাদা!
ঠিক বলেছিস! আমার চেয়ে বেশি পড়াশুনা তোর তো। আমি আর ক-খানা গোয়েন্দাকাহিনী পড়েছি বল! পড়বার সয়ম কই আমার। ভাইয়ের বুদ্ধির তারিফ করেন হর্ষবর্ধন–দাঁড়া, তাহলে একটা গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে আসি। তাই দিয়ে দূর থেকে গোত্তা মেরে ফেলে দিই লোকটাকে কী বলিস?
তারপর হর্ষবর্ধনের গোঁত্তা খেয়ে কল্কেকাশি পাহাড়ের মাথা থেকে বেপাত্তা! কল্কেকাশির কল্কেপ্রাপ্তি ঘটে গেলো দাদা! তোমার কৃপায়।
একটা পাপ কমলো পৃথিবীর। একটা বদমাইশকে দুনিয়া থেকে দূর করে দিলাম। আরামের হাঁফ ছাড়লেন হর্ষবর্ধন।
একেবারে গোটুহেল করে দিয়েছে লোকটাকে। এতক্ষণ নরকের পথ ধরেছে সটান। গোবর্ধন বলেঃ খাদের তলায় দেখবো নাকি তাকিয়ে একবার? কিরকম ছরকুটে পড়েছে দেখবো দাদা?
দরকার নেই। পাহাড়ের থেকে পড়ে পায়ের হাড় পর্যন্ত হয়ে গেছে। বিলকুল ছাতু! সে-চোহারা কি আছে নাকি আর? তাকিয়ে দেখবার কিছু নেই। দাদা বলেন, এবার আস্তে আস্তে ফিরে চলি আমরা। ইস্টিশনের দিকে এগুনো যাক। বড়ো রাস্তার থেকে একটা বাস ধরলেই হবে।
পাহাড়তলীর পথ ধরে এগিয়ে চলেন দু-ভাই।
যেতে যেতে হঠাৎ পেছন থেকে সাড়া পান যেন কার–হাত তুলে দাঁড়ান। দুজনেই।
পিছন ফিরে দেখেন স্বয়ং সাক্ষাৎ কঙ্কোকাশি। হাতে পিস্তল নিয়ে খাড়া।
আপনারা টের পাননি প্যান্টের পকেটে আরেকটা পিস্তল ছিল আমার। কৈফিয়তের মতই বলতে যান কল্কেকাশি।
তা তো ছিলো। কিন্তু আপনি ছিলেন কোথায়? হতভম্ব হর্ষবর্ধনের মুখ থেকে বেরোয়।
আকাশে। আবার কোথায়! হেলির নাম শুনেছেন কখনো? বাতলাম কল্কেকাশিঃ তার দৌলতেই বেঁচে গেলাম এ-যাত্রা।
হেলিই আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, বলছেন আপনি? মানে, জাহান্নামের পথ থেকেই ফিরে আসছেন সটান?
না। অদুর যেতে হয়নি অবশ্যি। হেলি–মানে হেলির ধূমকেতুর নাম শোনেননি নাকি কখনো? নিরানব্বই বছর অন্তর অন্তর একবার করে পৃথিবীর পাশ কাটিয়ে যায় সেটা। সেই সময়টায় তার বিকর্ষণে কয়েক মুহূর্তের জন্যেই, মাধ্যকর্ষণ শক্তি লোপ পায় পৃথিবীর। তাই অমি তখন ঘড়ি দেখছিলাম বার বার–হেলির ধূমকেতু কখন যায় এ ধার দিয়ে। আজ তার ফিরে আসার নিরানব্বইতম বছর তো! আর ঠিক সেই সময়েই ফেলেছিলেন আপনার আমায়। আমাকে আর মাটিতে পড়তে হয়নি আছড়ে। আকাশের গায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ঠায়। আর আপনারা পেছন ফিরতেই, পাখির মতন বাতাস কেটে সাতরে এসে উঠেছি ওই পাহাড়ে। তারপর থেকেই এই পিছু নিয়েছি. আপনাদের। রিভলভার দুটো লক্ষ্মী ছেলে মতন ফেলে দিন তো এইবার। ব্যস, এখন হাত তুলে চলুন দুজনে গুটিগুটি। সোজা থানার দিকেই সটাং!
নিরানব্বই বছর অন্তর হেলির ধূমকেতু পাশ দিয়ে যায় পৃথিবীর? জানতাম না তো! কখনো শুনিওনি এমন আজগুবি কথা।
অবাক লাগে হর্ষবর্ধনের।
এখন তো জানলেন! পাক্কা নিরানব্বই বছর বাদ ধূমকেতুর আসার ধুমধাড়াক্কার মুখেই আপনার ধাক্কাটা এলো কিনা, তাই দুই ধাকায় কাটাকাটি হয়ে কেটে গেলো। বুঝলেন এখন?
এর নামই নিরানব্বইয়ের ধাক্কা, বুঝলে দাদা? বললো গোবরা।
কাষ্ঠকাশির চিকিৎসা
বড়দির আদুরে থোকাকে একটি কথা বলার কারু জে নেই। বলেছ কি খোকা তো বাড়ি মাথায় করেছেই, বড়দি আবার পাড়া মাথায় করেন। প্রতিবেশীদের প্রতি বেশি রাগ আমার নেই–তাই যতদূর সম্ভব বিবেচনা করে বড়দি আর খোকাকে না ঘাঁটিয়েই আমি চলি।
কালই মিউনিসিপ্যাল মার্কেট থেকে পছন্দ করে কিনে এনেছি, আজ সকালেই দেখি খোকা সেই দামী পাইনের ছড়িটা হস্তগত করে অম্লানবদনে চর্বণ করছে। খোকার এইভাবে ছড়িটি আত্মসাৎ করার প্রয়াস আমার একেবারেই ভাল লাগল না, ইচ্ছা হল ওকে বুঝিয়ে দিই ছড়ির আস্বাদ নয়, পিঠে। কিন্তু ভয়ানকভাবে আত্মসংবরণ করে ফেললাম।
ভয়ে ভয়ে বড়দির দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম–দেখছ, খোকা কি করছে?
সঙ্গে সঙ্গে বড়দির খান্ডমার্কা জবাব–কে তোমার পাকা ধানে মই দিচ্ছে? ও তো ছড়ি টিবচ্চে।
আমি আমতা আমতা করে বললাম, তা চিবুক ক্ষতি নেই কিন্তু যত রকমের কাঠ অছে, তার মধ্যে পাইন কাঠ খাদ্য হিসেবে সব চেয়ে কম পুষ্টিকর, তা জানো কি? তাছাড়া এখন চারধারে যে রকম হুপিংকাফ হচ্ছে–
বড়দি ঝামটা দিয়ে উঠলেন–যাও যাও, তোমাকে আর বাকা বুঝাতে হবে না। সেদিন আমি একটা ওষুধের বিজ্ঞাপনে পড়লাম পাইন গাছের হাওয়া যক্ষ্মকাশি পর্যন্ত সারে–যার হাওয়ায় যক্ষ্মা সেরে যায়, তাতেই কি না হুপিং কাশি হবে? পাগল!
