হর্ষবর্ধনের গাড়ি কিন্তু কোন জঙ্গলের ত্রিসীমানায় গেল না, তাঁদের বাড়ির চৌহদ্দির ধারে তো নয়ই। অনেক দূর এগিয়ে ছোটখাটো পাহাড়ের তলায় গিয়ে খাড়া হল গাড়িটা।
ভাইকে নিয়ে নামলেন হর্ষবর্ধন। ভাড়া মিটিয়ে মোটা বখশিস দিয়ে ছেড়ে দিলেন ট্যাক্সিটা। কল্কেকাশিও নেমে পড়ে পাহাড়ের পথ ধরে দূর থেকে অনুসরণ করতে লাগলেন ওঁদের।
আড়চোখে পিছনে তাকিয়ে দাদা বললেন ভাইকে ছায়ার মতন আসছে লোকটা। খবরদার ফিরে তাকাস নে যেন।
পাগল হয়েছে দাদা? তাকাই আর তাক পেয়ে যাক? দাদার মতন গোবরারও যেন আজ নয়া চেহারাঃ দু-ভায়ে এখেনেই ওকে আজ নিকেশ করে যাব। কাক চিল কেউ টের পাবে না, সাক্ষী সাবুদ থাকবে না কেউ। শকুনি গৃধিনীতে খেয়ে শেষ করে দেবে কালকে।
কাজটা খুবই খারাপ ভাই, সত্যি বলছি। দাদার অনুযোগ; কিন্তু কি করা যায় বল? ও বেঁচে থাকতে আমাদের বাঁচান নেই, আর আমাদের বেঁচে থাকাটাই যখন বেশি দরকার, অন্তত আমাদের কাছে…তখন ওকে নিয়ে কি করা যায় আর? তবে ওকে আদৌ মারা যাবে কিনা সন্দেহ আছে। এখনো পর্যন্ত কোনো বইয়ে একটা গোয়েন্দাও মরেনি কখনো।
কিন্তু বাবার যেমন বাবা আছে তেমনি গোয়েন্দার উপরে গোয়েন্দা থাকে… জানায় গোবরা আর তিনি হচ্ছেন খোদ এই গোবর্ধন। খোদার ওপর খোদকারি হবে আজ আমার। ব্লেক আর স্মিথের মতই গোবরা দাদাকে নিজের সাকরেদ বানাতে চাইলেও হর্ষবর্ধন অন্যরূপে প্রকট হন, গোঁফ মুচড়ে বলেন–তুই যদি গোবর্ধন, তাহলে আমি সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গোবর্ধনকে ধারণ করে রয়েছি।
বলে ভাইয়ের হাত ধরে বলেন–আয়, আমরা এই উচ টিবিটার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াই। একটুখানি গা ঢাকা দিই। লোকটা এখানে এসে আমাদের দেখতে না পেয়ে কী করে দেখা যাক…
কষ্কেকাশি বরাবর চলে এসে কাউকে না দেখে সোজা পাহাড়ের খাড়া দিকটার কিনারায় গিয়ে পৌঁছান। দেখেন যে তার ওধারে আর পথ নেই, অতল খাদ, তার খাদ্যরা বিলকুল গায়েব। তাকিয়ে দেখেন চার দিকে দুই ভাই কারোরই কোন পাত্তা নেই গেলো কোথায় তারা?
এমন সময় যেন মাটি খুঁড়েই তারা দেখা দিলে হঠাৎ। কল্কেকাশি সাড়া পেলেন পেছন থেকে হাত তুলে দাঁড়ান।
ফিরে তাকিয়ে দেখেন দুই মূর্তিমান দাঁড়িয়ে যুগপৎ শ্রীহর্ষ এবং শ্রীমান গোবর-বধর্ন ভ্রাতৃদ্বয়। দুজনের হাতেই দোনলা পিস্তল।
এবারে আপনি আমাদের কবজায়, কল্কেকাশিবাবু। হাতের মুঠোয় পেয়েছি আপনাকে। আর আপনার ছাড়ান নেই, বিস্তুর জ্বালিয়েছেন কিন্তু আর আপনি আমাদের জ্বালাতে পারবেন না। দেখছেন তো আমাদের হাতে এটা কী। হর্ষবর্ধন হস্তগত বস্তুটি প্রদর্শন করেন–সব জ্বালাযন্ত্রণা খতম হবে এবার আমাদের, আপনারও।
একটু ভুল করছেন হর্ষবর্ধনবাবু। জানেন নাকি, আমাদের গোয়েন্দাদের কখনো মৃত্যু হয় না? আমরা অদাহয় অভেদ্য অমর।
জানি বইকি, পড়েওছি বইয়ে। আপনারা অসাধ্য, অকাট্য, অখাদ্য ইত্যাদি ইত্যাদি; কিন্তু তাই বলে আপনারা কিছু অপত্য নন। দু-পা আগ বাড়িয়ে তাকিয়ে দেখুন একবার আপনার সামনে অতল খাদ মুহূর্ত বাদেই ওই খাদে পড়ে ছাতু হতে হবে আপনাকে। পালাবার কোনো পথ নেই। ওই পতন অপ্রতিরোধ্য কিছুতেই আপনি তা রোধ করতে পারবেন না। সব হতে পারেন কিন্তু আপনি তো অপত্য, মানে, অপতনীয় নন।
আপনাকে প্রজাপুঞ্জের মতন অপত্যনির্বিশেষে আমরা পালন করবো। গোবর্ধন জানায়, বেশির ভাগ বাবাই যেমন ছেলের অধঃপতনের মূল, মানুষ করার ছলনায় তাকে অপমৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় ঠিক তেমনি ধারাই প্রায় আপনাকে পুঞ্জীভূত করে রাখবো পাহাড়ের তলায়। হাড়মাস সব এক জায়গায়।
পায়ে পায়ে এগিয়ে যান এইবার। হর্ষবর্ধনের হুকুম, খাদের ঠিক কিনারায় গিয়ে খাড়া হন। নিজে ঝাঁপিয়ে পড়বার সাহস আপনার হবে না আমি জানি। আপনাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবো আমরা। এখোন এগোন….নইলেই এই দুড়ম!
অগত্যা কষ্কেকাশি কয়েক পা এগিয়ে কিনারাতেই গিয়ে দাঁড়ান। হাতঘড়িটা কেবল দেখে নেন একবার।
ঘড়ি দেখে আর কী হবে সার! অন্তিম মুহূর্ত আসন্ন আপনার। দাদা বলেন–গোবরা, চারধারে একবার ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখ তো, পুলিস- টুলিস কারু টিকি দেখা যাচ্ছে নাকি কোথাও?
উঁচু পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে গোবরা নজর চালায় চারধারে, না দাদা, কেউ কোথাও নেই। পুলিস দূরে থাক, চার মাইলের মধ্যে জনমনিষ্যির চিহ্ন না। একটা পোকা মাকড়ও নজরে পড়ছে না আমার।
খাদটা কতো নিচু হবে রে? দাদা শুধায়, ধারে গিয়ে দেখে আয় তো।
তা, পাঁচশো ফুট তো বটেই। আঁচ পায় গোবরা।
কোথাও কোনো ঝোঁপ-ঝাড়, গাছের শাখা-প্রশাখা, লতা-গুল্ম কিছু বেরিয়ে-টেরিয়ে নেই তো! পতন বোধ রোধ হতে পারে এমন কিছু কোথাও কোন ফ্যাকড়ায় লোকটা আটকে যেতে পারে শেষটায়–এমনতরো কোনো ইতর বিশেষ আছে কিনা ভালো করে দ্যাখ।
বিলকুল ন্যাড়া এই খাড়াইটা। আটকারার মতন কোথাও কিছু নেইকো।
বেশ। আমি রিভলভার তাক করে আছি। তুই লোকটার পকেট-টকেট তল্লাশী করে দ্যাখ এইবার। কোনো প্যরাসুট কি বেলুন-ফেলুন লুকিয়ে রাখেনি তো কোথাও?
এক পকেটে একট রিভলভার আছে দাদা!
বার করে নে এক্ষুনি, আর অন্য পকেটটায়? একখানা রুমাল।
নিয়ে নে ওটাও। কে জানে, ওটাকেই হয়তো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্যারাসুটের মতো বানিয়ে নিয়ে দুর্গা বলে ঝুলে পড়বে শেষটায় কিছুই বলা যায় না। ওদের অসাধ্য কিছু নেই।
