বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা, এমন সময়ে এক ভদ্রলোক মন্টুদের বাড়ির সামনে রিক্সা থেকে নামলেন এবং সোজা ভেতরে এসে জিজ্ঞাস করলেন–এইটে ঘনশ্যামবাবুর বাড়ী না?
–হ্যাঁ।
–তাকে বলগে সত্যপ্রিয়বাবু এসেছেন। আমি সকালে তার করেছি, পেয়ে থাকবেন বোধহয়।
তবে ইনিই! মন্টুও পায় এই আন্দাজ করেছিল। খুব মোটা বটে, তবে হাতির কাছাকাছি একেবারে নন। তাছাড়া, শুঁড় নেই। শুঁড় না থাকার জন্য মন্টু যে ক্ষুব্ধ হলো তা নয়, বরং তাকে যেন একটু খুশিই দেখা গেল।
–দাদামশাই আপিস গেছেন। আপনি বসুন।
–তুমিই বুঝি উৎপল? আমি তোমা গুরুজন। প্রণাম করো। মন্টু ঈষৎ হতভম্ভ হয়ে জিজ্ঞাসা করল–কাকে?
–কেন, আমাকে? আশ্চর্য হবার কি আছে? গুরুজনদের ভক্তি করতে শিখবে, তাদের কথা শুনবে। এসব শেখনি?
–ও কি? ও কি প্রাণাম হলো? দেখছি এখানে শিক্ষাদীক্ষা সুবিধা হয়নি। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে হয়। যাক, ক্রমশঃ সব শিখবে। এখান থেকে গেলেই–
–আপনি কি আমাকে নিয়ে যাবেন এখান থেকে? কোথায়?
–কেন? দেশে। তোমার বাবার বাড়িতে। আমাদের বাড়িতে তোমাকে নিয়ে যেতেই ত আমি এসেছি।
–আপনি আমার বাবা যদি তবে আপনার শুঁড় কই?
–শুঁড়?
-–হ্যাঁ। দাদামশাই যে বললেন যে মন্টু তুই তুই বাড়ি থাকিস, তোর শুঁড়গুল বাবা আজ আসবেন। কিন্তু আপনার শুঁড় নেইত! শুঁড় কোথায়?
–হু।
হু বলে ভদ্রলোক ভারী গম্ভীর হয়ে গেলেন, মন্টুর সঙ্গে তারপর আর কোনো কথাই তার হলো না! ঘাট হয়ে গেছে ভেবে মন্টু ম্লান মুখে চুপ করে রইল। সে বইয়ে পড়েছিল বটে যে কানাকে কানা বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না ইত্যাদি–পড়েছিল এবং মুখস্থ করেছিল, কিন্তু বইয়ের হুকুম কাজে না মানলে যে অঘটন ঘটবে তা সে ভাবেনি। যার পা নেই তাকে খোঁড়া বললে সে যেমন মনঃক্ষুণ্ণ হয়, এঁকে শুঁড় নেই বলাতে বোধহয় ইনি তেমনি বিচলিত হয়েছেন! অঙ্গহীনতার অনুযোগ না করাই মন্টুর উচিত ছিল।
ঘনশ্যামবাবু অফিস থেকে ফিরলে অন্যান্য কথাবার্তার পর সত্যপ্রিয়বাবু বললেন–দেখুন, উৎপলকে আমি নিয়ে যেতে চাই। দাদা বৌদি নেই, কিন্তু আমি ত আছি। আমিই এখন ওর অভিভাবক।
-–কেন, এখানে তো ও বেশ আছে। সেই অজ পাড়াগাঁয়ে–
–তাহলে খুলেই বলি। এখানে ওর যথার্থ শিক্ষা হচ্ছে না।
–যথার্থ শিক্ষা বলতে কি বোঝায়?
–অনেক কিছু। তা নিয়ে আপনার সঙ্গে তর্ক করা আমার পক্ষে বাতুলতা। তবে এখানে থেকে যথার্থ অশিক্ষা যে ওর হচ্ছে তাতে ভুল নেই।
–যথার্থ অশিক্ষা হচ্ছে? কি রকম শুনি।
–আপনি বলেচেন আমি নাকি ওর গুঁড়-ওলা বাবা। উৎপল তাই বলছিল। এতদ্বারা ওকে মিথ্যাবাদিতা শেখানো হচ্ছে। আমি তো ওর বাবা নই, তাছাড়া আমার গুঁড়ও নেই।
–এই কথা! তুমি ওর কাকা তো বটে! ব-এ শুঁড় দিলেই ক হয় এও বোঝে না বাপু!
কিন্তু কিছুতেই সত্যপ্রিয়কে বোঝানো গেল না; পরদিন সকালেই মন্টুকে নিয়ে তিনি রওনা হলেন। পথে যেতে যেতেই মন্টুর যথার্থ শিক্ষা শুরু হয়ে গেল।
-–দেখ উৎপল! আজ আমি তোমাকে মাত্র তিনটি উপদেশ দেব। যদি মানুষ হতে চাও তাহলে আমার এই তিনটি উপদেশ তোমার মূলমন্ত্র হবে আর জীবনে সর্বদা মেনে চলবে! প্রথম হচ্ছে, সত্যনিষ্ঠ হবে, সত্যের জন্য ত্যাগ, যে কষ্ট, যে লঞ্ছনাই স্বীকার করতে হোক না কেন, কখনো পিছুবে না। দ্বিতীয় উপদেশ, সব সময়ে নিয়মানুবর্তী হবে। নিয়ম না মানলে শৃঙ্খলা থাকে না, তাতে করে সামাজিক ব্যবস্থায় গোলযোগ ঘটে। আমার তৃতীয় উপদেশ হচ্ছে এই–
উপদেশগুলো মন্টুর কানে যাচ্ছিল কিনা বলা যায় না, কানে গেলেও তার মানে নিশ্চয় তার মাথায় ঢোকেনি। একটু আগে একটি ছেলে তার পাশ দিয়ে যাবার সময় আকারণে, বোধহয় অকারণ পুলকেই, মাথায় চাটি মেরে গেছল, কাকার নিয়ম-নিষ্ঠা প্রচারের মাঝখানে তার প্রতিশোধ নেবার সুযোগ সে খুঁজছিল। তৃতীয় উপদেশের সূত্রপাতেই, পথে চলতি ছেলেটি আবার যেমনি তার পাশে এসেছে, অমনি সে তাকে ল্যাং মেরে ধরাশায়ী করে ফেলল।
মন্টু নিজের ক্ষুদ্রবুদ্ধি অনুসারে সম্ভবত নিয়মরক্ষাই করেছিল, কিন্তু সত্যপ্রিয় উলটো বুঝলেন–দ্যাখো, এইমাত্র তুমি পথে চলার নিয়মভঙ্গ করলে!
–ও যে আমাকে চাটি মারল আগে!
–আমি তো দেখেছি, কিন্তু ওকে ক্ষমা করাই তোমার উচিত ছিল নাকি? আমার তৃতীয় উপদেশ হচ্ছে, কখনো কাউকে আঘাত করবে না। কেউ যদি তোমার বাঁ গালে চড় মারে তাকে ডান গাল ফিরিয়ে দেবে?
স্টেশনে গিয়ে সত্যপ্রিয় দারুণ ভাবনায় পড়লেন। মন্টুকে জিজ্ঞাসা করলেন –তোমার কি টিকিট কিনব? হাফ না ফুল? একটু মুশকিল আছে দেখছি।
-–আমি তো হাফ-টিকিটে যাই।
–বারো বছর পুরে গেলে পুরো ভাড়া দিতে হয়। আজ তোমার ঠিক বারো বছর পূর্ণ হবে। তবে হিসেব করে দেখলে ঠিক বারো বছরে পড়তে এখনো তোমার চার ঘন্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট তের সেকেন্ড বাকি। তারপর থেকেই তোমার ফুল টিকিটের বয়স হবে।
–তা কেন? আমাদের পাড়ার হবালা দেখতে বেঁটে? কিন্তু তার বয়স সতের বছর। সে এখনো হাফ-টিকিটে যায়, তাকে কই ধরে না তো।
–এতক্ষণ কি বোঝালাম তোমাকে? সর্বদা সত্যনিষ্ঠ হবে–বাক্যে, চিন্তায় এবং আচরণে। কাজেই এখনো যখন তোমার বারো বছর পূর্ণ হয়নি, এখন ফুল টিকিট কেনা যেতে পারে না। কিন্তু গাড়িতে যেতে যেতে পূর্ণ হবে, সেইটাই ভাবনার কথা! আচ্ছা তখনকার কথা তখন দেখা যাবে।
