কি করি? কাঁহাতক মার খাব? প্রাণের দায়ে ঘড়াকে মুখে তুলতে যাই। কিন্তু পারব কেন? একটু আগে আমি যে চপেই দাঁত বসাতে পারিনি, কিন্তু সে তো এর চেয়ে ঢের নরম ছিল। আর এর চেয়ে হালকা তো বটেই!
সনাতন কিন্তু ঘড়ার চেয়েও কড়া। সে ধা করে তার ওপরেই—
ছেলেটি আর বলতে পারে না।
বলতে হবে না। আবার ঘা কতক! বুঝতে পেরেছি। আমার বন্ধুটি ভগ্নকণ্ঠে বলেন, এবং রুমালে নিজের চোখ মুছতে ভুল করে তার পাশের আরেক জনের মুখ মুছিয়ে দেন।
আমার অপর চোখটি দিয়ে এবার জল গড়াতে থাকে।
তখন আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। এই ধাক্কায় মূচ্ছিত হয়ে গেলে কেমন হয়? তাহলে হয়তো এ-যাত্রা বেঁচে যেতেও পারি। রোজার হাত থেকে ডাক্তারের খর্পরে পড়ব, হয়ত ইনকেজসনই লাগাবে, তেঁতো ওষুধ গেলাবে, কিন্তু সেও ঢের ভাল এর চেয়ে।
ব্যস, অমনি আমি পতন ও মূৰ্ছা–একেবারে নট নড়ন চড়ন, নট কিছু!
এই বলে এতক্ষণ পরে ছেলেটি একটু হাসল, এবার আত্মপ্রসাদের হাসি!
মূছার মধ্যেই আমি শুনতে থাকি, চোখ বুজেই শুনতে পাই, সনাতন বলছে–গিন্নীমা, আমার মনে হয় ভূত নয়। ভূত হলে আলবৎ দাঁতে করে তুলতো। এর চেয়ে ভারী ভারী ঘড়া অক্লেশে তুলে ফেলে। আমার নিজের চোখেই দেখা! আমার মনে হয় মন্টুবাবুর মাথা বিগড়ে গেছে। বা বড় বড় চুল, এ গরমে, তাই হবে। আপনি কাচিটা আমায় দিন ত! চুলগুলো কদম ছাঁট করে মাথায় ঠাণ্ডা গোবর লাগালে দু-এক দিনেই থোকাবাবু শুধরে উঠবেন। শিবঃ রচনাসমগ্র-১২-ক
এই কথা যেই না আমার যাওয়া, আমি তো আর আমাতে নেই। অ্যাঁ, আমার এমন সাধের একচোখ–ঢাকা চুল–শিব্রাম চকরবরতির দেখাদেখি কত করে বাড়িয়েছি–
আমি বাধা দিয়ে বলি :–তবে যে তুমি বললে, শিব্রাম চকরবরতিকে কখনো দেখনি?
ঠিক স্বচক্ষে দেখিনি। তবে আজকাল ওঁর যত বইয়ে ওঁর চেহারার সে সব কার্টুন বেরয় তাই দেখেই আন্দাজ করে রেখেছিলাম। আপনিও তো মশাই প্রায় তার মত করেই চুল রেখেচেন দেখ যাচ্ছে। আমার প্রতি কটাক্ষ করে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে ছেলেটিঃ কত কষ্ট করে কত বকুনি সয়ে, কত সমাদরে বাড়ানো এই চুল, তাই যদি গেল, তাহলে আর আমার থাকল কি!
সনাতনের গিন্নীমা কাঁচি আনতে গেছেন, আর আমি এদিকে চোখ টিপে টিপে চেয়ে দেখলাম, সনাতন ঘড়াটা সরাচ্ছে, সেই সুযোগে আমি না, একলাফে তিড়িং করে না উঠে, চৌকাঠ পেরিয়ে, কাকাতুত রাক্কোসদের এক ধাক্কায় কক্ষচ্যুত না করে সিঁড়ি ডিঙিয়ে একেবারে সেই সদরে!
দারোয়ান হতভাগা, দ্বারে যার ওয়ান হয়ে সব সময়ে থাকবার কথা, সে ব্যাটা তখন জিরো হয়ে পড়েছিল। ইংরিজি ওয়ান-এর বদলে, বাংলা ১ বনে গিয়ে পা গুটিয়ে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে জিবরাচ্ছিল, আমি না সেই ফাঁকে…
ধর ধর ধর ধর! সোরগোল উঠল চারদিকে।
আর ধর! এই ধুরন্ধর ততক্ষণে–ছেলেটি থেমে গেল। গল্পটাকে সুচারুরূপে শেষ করার জন্য, কপাল কুঁচকে, যুৎসই একটা কথা খুঁজতে লাগল মনে হয়।
পালিয়ে এসেচ। বুঝতে পেরেছি, আর বলতে হবে না। আমার বন্ধুটিই পালা শেষ করেন।
পালানো হচ্ছে একটা লম্বা ড্যাশ-ওর কোথাও ফুলস্টপ নেই।
তোমার নামটি কি? আমি জিগ্যেস করি? মন্টু তো বলেছ। কিন্তু ভাল নামটি কি তোমার?
ধ্রুবেশ।
বাঃ বেশ! বলতে গিয়ে আমার বলা হয় না। গলায় আটকায়।
শুঁড়ওয়ালা বাবা
বই-টই গুছিয়ে নিয়ে বেরুবার উদ্যোগ করছে, এমন সময়ে দাদামশাই ডেকে বললেন–আজ আর স্কুল যেতে হবে না। তোর গুঁড়-ওলা বাবা আসচেন, দুপুরে এসে পৌঁছনর তার পেয়েছি। আজ আবার মেল ডে, আমার তো আপিস কামাই করা চলবে না। বাড়ি থাকবি তুই!
ইস্কুলে যেতে হবে না জেনে মন্টুর ফুর্তি হল, কিন্তু সে বেশ ভাবনায় পড়ে গেল। শুঁড়-ওলা বাবা আবার কি রকম বাবা?
সে ত প্রায় বছর দশেক হতে চলল তার বাবা স্বর্গে গেছেন সে শুনেছে, তার কিছুদিন পরে মা ও তাঁর অনুসরণ করলেন। তখন থেকে মন্টু থেকে মামার-বাড়িতেই মানুষ। এতদিন সে কোনো প্রকার বাবার সম্বন্ধেই কিছুমাত্র উচ্চবাচ্য শোনেনি, তবে অকস্মাৎ এই শুঁড়-ওলা বাবার প্রাদুর্ভাব হলো কোত্থেকে আবার?
বই-টই রেখে দিয়ে মন্টু বৈঠকখানায় গিয়ে বসল এবং মনে মনে বাবার বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে লাগল।
বাবা তাহলে দুরকম? এক শুঁড় আছে আরেক–শুঁড় নেই। তবে সাধারণত বাবাদের গুঁড় থাকে না। যথা নীতু, নীলিম ও ঝনকুর বাবার নেইকো। যে কটি বন্ধুর বাবার সঙ্গে তার চাক্ষুষ ঘটেছে তাঁদের গুঁড় নেই।
মন্টুর মতে বাবাদের গুঁড় না থাকাই বাঞ্ছনীয়। বাবারা ছেলেদের গাধা হওয়া পছন্দ করেন না, বাবাদের হাতি হওয়াটাও তেমনি ছেলেদের রুচিতে বাঁধে! তবে মন্টুর দুর্ভাগ্য, বেচারার বাবাই নেই। আর সব বন্ধুর কেমন বাবা আছে, তারা বাবার কাছ থেকে কত কি প্রাইজ পায়, তমু তো সেদিন একটা সাইকেল পেয়ে গেছে, কিন্তু বেচারা মন্টু–।
যাক সৌভাগ্য বলতে হবে, এতদিন বাদে তবু মন্টুর একজন বাবা আসছেন। তবে দুঃখের মধ্যে ঐ যা– গুঁড়! তার জন্যে আর কি করা যায়, নেই মামার চেয়ে কানা মামা যেমন ভালো, তেমনি একেবারে বাবা না থাকার চেয়ে শুঁড়ওলা বাবাই মন্দ কি! তারপর কাল আবার মন্টুর জন্মদিন–হয়ত তিনি কেবল উঁড় নাড়তে নাড়তেই আসছেন না, কত কি উপহারও ঝাড়তে আসচেন।
