গাড়িতে উঠে সত্যপ্রিয় একদৃষ্টে হাতঘড়ির দিকে চেয়ে রইলেন। মন্টু জানালার ফাঁকে বাইরের পৃথিবীর পরিচয় দিতে লাগল।
কিন্তু যেই না চার ঘণ্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট তের সেকেন্ড গত হওয়া, অমনি সত্যপ্রিয়বাবু তাঁর বিপুল দেহ নিয়ে গাড়ির গ্যালার্ম সিগন্যালের শেকল ধরে ঝুলে পড়লেন। ফল হলো ঠিক মন্ত্রের মত ঝড়ের বেগে যে-গাড়ি ছুটছিল, গাছপালাদের ছোটাচ্ছিল, দুধারের দিগন্ত প্রসারিত মাঠের মধ্যখানে অকস্মাৎ তা থেকে গেল। ট্রেনের গার্ড এসে জিজ্ঞাসা করলেন–কে শেকল টেনেছে?
সত্যপ্রিয় বুঝিয়ে বললেন, দেখুন এই ছেলেটির বারো বছর এইমাত্র পূর্ণ হলো। এর পর তো একে আর হাফ টিকিটে নিয়ে যেতে পারি না; কোনে স্টেশনে থামলেই ভাল হোতো, কিন্তু মাঠের মাঝখানে যে বয়স পূর্ণ হবে তা কি করে জানব বলনু! অসত্যকে প্রশ্রয় দিতে আমি অক্ষম, তা ছাড়া রেল কোম্পনীকে আমি ঠকাতে চাইনে। ওর হাফ-টিকিট আছে। এখান থেকে পুরুলিয়া পর্যন্ত আরেকটা হাফ-টিকিট আপনি আপনি দিন কিম্বা হাফ- টিকিটের ভাড়া নিয়ে রসিদ দিন।
— এই জন্য গাড়ি থামিয়েছেন? আচ্ছা পরের স্টেশনে দেখা যাবে।
–তা দেখতে পারেন, কিন্তু ভাড়া এখান থেকে ধরতে হবে পরের স্টেশন থেকে নিলে চলবে পরের স্টেশনে গাড়ি থামতেই গার্ড সত্যপ্রিয়কে জানালেন যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে! তিনি আকাশ থেকে পড়ে বললেন–কেন, গ্রেপ্তার কিসের জন্য?
–দেখছেন না। অকারণে শেকল টানলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা! স্পষ্টই লেখা রয়েছে। দরজার মাথায় ওই!
–অকারণে তো টানিনি।
–সে কথা আদালতে বলবেন।
সত্যপ্রিয় কিছুতেই গাড়ি থেকে নামবেন না, সত্যের মর্যাদা রাখবার জন্য যা করা দরকার, যা প্রত্যেক সত্যনিষ্ঠ ভদ্রলোকেই করবে, তাই তিনি করেছেন। তিনি তো কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেননি, কারণ গুরুত্বর কারণ ছিল বলেই শেকল টেনেছেন। কাজেই তিনি প্রেপ্তার হতে নারাজ, এটে বেশ ওজস্বিনী ভাষায় সবাইকে জানিয়ে দিলেন।
তিনি নামতে প্রস্তুত নন, অথচ তিনি না নামলে ট্রেনও ছাড়তে পারে না অনর্থন ডিটেন হতে হবে ভেবে সত্যপ্রিয়র সহযাত্রীরা গার্ডের সাহায্যে অগ্রসর হল। মাঠের মাঝখানে গাড়ি থামানোর জন্য তারা তখন থেকেই বিরক্ত হয়ে আচে। সকলে মিলে তাকে ধরে জোর করে নামাতে গেল। টানা টানিতে সত্যপ্রিয় দামী সিল্কের পাঞ্জাবিটা গেল ছিঁড়ে; সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মেজাজও গেল রুখে, তিনি ধা করে একজন সহযাত্রীর নাকে ঘুসি মেরে বসলেন। তখন সকলে মিলে চাদা করে তাঁকে ইতস্ততঃ মারতে শুরু করে দিলে। কদাচ কাহাকেও আঘাত করিয়ো না– জীবনের এই মূলমন্ত্র তিনি ভুলে গেলেন। তবে, বাঁ গালে মার খাবার পর ডান গাল তিনি বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন বটে, কিন্তু সেটা বোধ হয়, বাধ্য হয়ে এবং অনিচ্ছাসত্বে, কেননা আক্রমণ থেকে এক গাল বাঁচাতে গিয়ে অন্য গাল বিপন্ন হচ্ছিল। অসুবিধা এই যে দুটো গাল এক সঙ্গে ফেরানো যায় না।
একা সত্যপ্রিয় কি করবেন? খানিকক্ষণ খন্ডযুদ্ধের পরেই দেখা গেল যে একা তিনি সাত জনকে মারবার চেষ্টা করে কাউকেই বিশেষ মারতে পারেননি, কিন্তু সাত জনের মার তাঁকে হজম করতে হয়েছে। সকলে মিলে তাকে চ্যাংদোলা করে স্টেশনের একটা গুদাম ঘরে নিয়ে ফেলে তার বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিল–সেই যতক্ষণ না থানার থেকে পুলিশ এসে তার হেফাজত নেয়। মন্টুও কাকার সঙ্গে স্বেচ্ছায় সেই ঘরে আটক রইল।
তারপর ট্রেন ছাড়ল। স্টেশন জুড়ে ব্যস্ত উত্তেজনা, বিরাট সোরগোল, সেই সব গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল। ছোট্ট স্টেশনটা সত্যপ্রিয়র মত নির্জীব নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল। সেই বদ্ধ ঘরের মধ্যে সত্যপ্রিয় ঘোৎ ঘোঁৎ করতে লাগলেন। তাঁকে তখন আর চেনাই যায় না। সমস্ত মুখখানা ফুলে মস্ত হয়েছে, চোখ দুটো ছোট হয়ে গেছে, প্রকাণ্ড মুখে তাদের খুঁজেই পাওয়া যায় না–হ্যাঁ, এতক্ষণে হাতির মাথার সঙ্গে তুলনা করা চলে। অচিরেই হয়ত শুঁড়ও বেরুতে পারে এমন সম্ভাবনা আছে বলে মন্টুর সন্দেহ হতে থাকে।
শ্রীকান্তের ভ্রমণকাহিনী
দেশবিদেশ বেড়াতে তোমরা সকলেই খুব ভালবাস। সব ছেলেই ভালবাসে। কিন্তু আমাদের শ্রীকান্তর। ভ্রমণে আনন্দ নেই, তার কাছে ভ্রমণের মানেই হচ্ছে দেড় মণ।
তার মামা ভারি কৃপণ কোথাও যেতে হলে গোটা বাড়িখানাই সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। কি জানি, বিদেশে কোনো জিনিসের দরকার পড়লে যদি সেটা আবার পয়সা খরচ করে কিনতে হয়! কিন্তু শ্রীকান্তর এদিকে প্রাণ যায় সেই বিরাট লটবহর তাকেই বইতে হয় কি না! সে-সব মালপত্র গাড়িতে তুলতেও শ্রীকান্ত, গাড়ি থেকে নামতেও শ্রীকান্ত, স্টেশনে যে কুলি নামক একজাতীয় জীবের অস্তিত্ব আছে, একথা শ্রীকান্তকে দেখলে মামা একদম ভুলে যান।
কেবল কুলির কাজ করেই কি নিষ্কৃতি আছে? তাকে সারা রাস্তা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় গাড়ির দরজায় পাহারা দিয়ে। কেন না মামার ধারণা, ওইভাবে দরজার মুখে মাথা গলিয়ে খাড়া থাকলে সে কামরার দিকে কেউ আর এগোয়ে না! এবং যে-কামরার দিকে কেউ এগোয় সেদিকে কেবল একজন নয়, সেই স্টেশনের যত ভোলদাস সবাই সেই কামরাটার দিকেই ঝুঁকে পড়ে–তা তার ভেতর জায়গা থাক বা না থাক। কিছু দূরে খালি কামরা থাকলেও সেদিকে তাদের যেন দৃষ্টি যায় না।
