পশ্চাতে শুক্লা কটাক্ষ করে। ওলো দগ্ধাননা রাক্ষুসি, রাত্রি কিন্তু অধিক নেই, ওকে স্বল্পক্ষণের জন্য হলেও ঘুমোতে দিস।
ঐরূপ সংলাপ বিলক্ষণ উত্তেজক। কিন্তু বসন্তদাসের মনে ভয় ছিলো। মনে হচ্ছিলো, এক সর্বনাশা খেলায় মত্ত হয়েছে ঐ তিন রমণী। তাদের সান্নিধ্য পরিহার করতে না পারলে বিপদ অনিবার্য। তাদের কৌতুকালাপের ইঙ্গিতগুলি তাই অযথা নষ্ট হচ্ছিলো। কৃষ্ণা তো একবার বলে বসলো, কি হে ক্ষেত্রকর, কর্ণে কি জল পশে না? বলল না, তোমার বধূটি বালিকা, না যুবতী?
তাকে নিজ কক্ষে নিয়ে যায় কৃষ্ণা। তারপর দ্বার অর্গলবদ্ধ করে। বসন্তদাস তখন শঙ্কিত, তবে কি সত্য সত্যই একটি ভয়ঙ্কর অবস্থার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে সে? কিন্তু কিছুই করণীয় ছিলো না তার। তবু সে বললো, আপনারা আমাকে কেন ভুল বুঝছেন, আপনাদের কোনো ক্ষতি হবে না আমার দ্বারা, বিশ্বাস করুন।
কৃষ্ণা উত্তরীয়খানি হেলাভরে দূরে নিক্ষেপ করলে সে অধর দংশন করে নিজেকে সংযত করে। কিন্তু যখন হাত ধরে কৃষ্ণা আহ্বান করে, এসো, শয্যায় এসো, তখন আর তার পক্ষে স্থির থাকা সম্ভব হয় না। বলে, কেন আমাকে প্রলুব্ধ করছেন, আমি আপনাদের কোনো কথাই কোথাও প্রকাশ করবো না–বিশ্বাস করুন।
হ্যাঁ, বিশ্বাস করলাম, কৃষ্ণার ওষ্ঠদ্বয়ে ঐ সময় হাসি বিলোলিত হয়। বলে, বারংবার এক কথা বলার কি প্রয়োজন, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি, এসো শয়ন করি, রাত্রি যে চলে যায়।
তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, কৃষ্ণা এভাবে নিজের অবমাননা করো না। কিন্তু কথাটি ঐ ভাষায় সে বলতে পারে না। বললো, ভদ্রে, দক্ষিণাদানের কোনো সামর্থ্যই আমার নেই–আপনি আমাকে মার্জনা করবেন।
ঐ কথার কৃষ্ণায় যুগল ক্ষণিকের জন্য তীক্ষ্ণধার হয়ে ওঠে। পরক্ষণে সে স্মিতহাস্যে জানায়, মন্দিরদাসী সর্বদা দক্ষিণার প্রত্যাশা করে না হে নির্বোধ ক্ষেত্রকর, তাদের প্রণয়ও হয়।
না ভদ্রে, আমি বিশ্বাস করি না, বসন্তদাস জানায় উত্তরে। বলে, প্রণয় অতো সুলভ নয়, এতো অল্পকালের প্রণয় সেই প্রকার গম্ভীর হতে পারে না, যাতে দুজনে একত্রে শয্যাগ্রহণ করা যায়–আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন, আমি লম্পট নই।
কী যে হয় কৃষ্ণার, বোঝা যায় না। সে তার বিশাল চক্ষু দুটি মেলে ধরে বসন্তদাসের দৃষ্টির সম্মুখে। কী দেখে, ভগবান জানেন–তারপরই ওষ্ঠে ভারী ক্ষীণ একটি হাসি ফুটিয়ে বলে, না হে ক্ষেত্রকর, আমি তোমাকে ভুল বুঝিনি–এ পর্যন্ত বলে সে হাত ধরে বসন্তদাসের। তারপর বলে, আত্রেয়ীতীরের পুরুষ, মানুষই–অন্যকিছু নয়।
না, আবার আপনি ভুল বুঝলেন, বসন্তদাস ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। বলে, পৌরুষ বিচারের প্রশ্ন নয় এটা–আর সে বিচারও আপনারা করছেন না বরং আমি দেখছি, আপনারা আমাকে এমনভাবে প্রণয়পাশে আবদ্ধ করতে চান, যাতে আমি আপনাদের কোনো গোপন কথা কখনও প্রকাশ করে না দিই। আমি বলি, আপনার এই প্রণয়পাশের প্রয়োজন নেই, নিশ্চিত থাকুন, আমি কখনই কিছু বলবো না
হয়েছে হে বাক্যবাগীশ ক্ষেত্রকর, অধিক কথা বলো না–এসো ক্ষেত্রকর্ম করো।
কৃষ্ণা তখন কৌতুকে, কপট ক্রোধে এবং লীলাবিলাসে এমন হয়ে উঠেছে যে, সাধ্য কি বসন্তদাসের তাকে নিরস্ত করে। সে দেখে, প্রগলভা মন্দিরদাসী প্রেমদানে উন্মুখ হলে পুরুষ বড়ই অসহায়।
এবং রাত্রির ঐ শেষ যামে বসন্তদাসকে কৃষ্ণার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
.
মহাসামন্ত শক্তিবর্মণ যখন চক্ষুরুন্মীলন করলেন, তখন সকাল। নগরীর কর্মকোলাহল শোনা যাচ্ছে। প্রথমে চারিদিকে দৃষ্টিপাত করলেন। চিন্তা করলেন, তিনি কোথায়? তাঁর পূর্ব রাত্রির কথা স্মরণ হলো–কিন্তু সম্পূর্ণ ঘটনাটি স্মরণ করতে পারলেন না।
মস্তক আন্দোলন করলেন কয়েকবার। যদি ঘোর কাটে–কিন্তু কাটলো না ঘোর। শরীরময় মেদুর একটি অবসাদ, প্রত্যঙ্গে প্রত্যঙ্গে শিথিলতা। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, কক্ষের বাইরে অলিন্দের চত্বরে পদচারণা করলেন কয়েকবার। অদূরেই একটি আম্রকানন–সেখানে বৃক্ষ শাখায় পীতবর্ণ পক্কা দুলতে দেখলেন। বৃক্ষতলের প্রহরীটিও তাঁর দৃষ্টিতে এলো। আকাশে মেঘ দেখা দিয়েছে। তিনি পুনরায় কক্ষে প্রবেশ করলেন।
বয়স্য দুজন তখনও নিদ্রিত। একজনের নাসিকা গর্জনে তখনও কক্ষটি প্রকম্পিত হচ্ছে। তাকে পদাঘাত করে বললেন, ওহে নাসিক্যানন্দ, তোমার বাদ্য কি থামাবে? ভূকম্পনে ধরণী যে রসাতলে গেলো।
বয়স্য দুজন জাগ্রত হয়ে উঠে বসলে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে–প্রাসাদে চলো।
ওদিকে তখন প্রাতরাশের ব্যবস্থা হয়েছে। শূলপ ময়ূর, মৃগমাংস, পলান্ন, পক্ক আম্র, পনসকোষ, দধি, মিষ্টান্ন ইত্যাদি নিয়ে ষোড়শোপচার আয়োজন। মধুকাসবের স্বর্ণকলসটি যথাস্থানেই রাখা হয়েছে।
আহার যখন শেষ পর্বে, ঐ সময় বিভাবতী তার প্রার্থনা নিবেদন করে। বলে, মহারাজ, অনুমতিদান করলে এক হৃতসর্বস্ব বণিককে আপনার পদপ্রান্তে আনি, সে আপনার সাক্ষাপ্রার্থী।
শক্তিবর্মণ শূলপকু ময়ুরমাংস চর্বণ করছিলেন। বললেন, আরে অধিক বিনয়ের কি প্রয়োজন–যাও, নিয়ে এসো তোমার বণিককে।
বসন্তদাস তখন কৃতাঞ্জলি হয়ে সম্মুখে দাঁড়ায়, মহারাজের জয় হোক।
কি হে বণিক পুত্র, সংবাদ কি তোমার?
বসন্তদাস তখন নিজ পরিচয় জানিয়ে আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। শক্তিবর্মণ মনোযোগ দিয়ে শোনেন। শেষে বলেন, সমস্তই বুঝলাম, তুমি এখন কী চাও?
