প্রভু, আমার পণ্যসামগ্রীর প্রত্যর্পণ প্রার্থনা করি।
রে মূর্খ, তা কি হয়, শক্তিবর্মণ প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন। যেন কোনো বালকের অবাস্তব আবেদন শুনছেন। অতঃপর বলেন, সামন্ত হচ্ছেন রাজার প্রতিভূ, তাঁর কাজ রাজকার্যের সমতুল্য। রাজার গৃহীত সামগ্রীর কি প্রত্যর্পণ হয়? তুমি অন্য কিছু প্রার্থনা করো।
মহারাজ তাহলে অনুগ্রহ করে আমার পণ্যাদির মূল্য পরিশোধ করার জন্য আদেশ দিন।
বসন্তদাসের কথা শুনে মহাসামন্তের জ কুঞ্চিত হয়। তিনি চর্বণে বিরত হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখেন বসন্তদাসকে। মনে হয় যেন বহুকষ্টে নিজেকে আত্মস্থ করছেন। তারপর বলেন, তুমি দূরের লোক–অধিকন্তু পথিক এবং বিভাবতীর আশ্রয়ে আছে, তাই রক্ষা পেলে, ভবিষ্যতে কদাপি এরূপ বাক্য উচ্চারণ করবে না, সামন্ত বা মহাসামন্ত কারও প্ররোচনায় আদেশ প্রদান করেন না–কথাটি স্মরণ রেখো, এখন যাও।
বসন্তদাসের কিছুই বোধগম্য হচ্ছিলো না, এরূপ উম্মার কারণ কি! সে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। একজন বয়স্য বলে উঠলো, কি হে বণিক পুত্র, কর্ণে কি জল প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে?
মহাসামন্ত বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগলেন। বিভাবতাঁকে বললেন, কে এই বণিক? এ কেন তোমার গৃহে?
ঐ সময় একজন লোক এসে তাকে কিছু বললে তিনি বিলম্ব করলেন না। আহার ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন এবং কিছুই না বলে বিভাবতীর গৃহ ত্যাগ করলেন।
মহাসামন্ত বিদায় হবার সঙ্গে সঙ্গে বিভাবতী চঞ্চল হয়ে উঠলো। বসন্তদাসকে বললো, আপনি কেন ঐ কথা বললেন? এখন কী হবে কে জানে, মহাসামন্তের রোষ ভয়ানক, আপনি শীঘ এ স্থান ত্যাগ করুন।
কেন, কি হয়েছে, ইত্যাকার প্রশ্ন করতে পারতো। কিন্তু দেখলো, ঐসব প্রশ্ন শোনার মতো মানসিক অবস্থা কারও নেই। ওরা তিনজনই নিদারুণ বিচলিত। বিভাবতী বারবার বলছে, গত রাত্রে মিত্রানন্দকে স্থানান্তরিত করে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম–আজ আবার এ কোন বিপদ সৃষ্টি করলেন আপনি, কেন ওকথা বলতে গেলেন?
বসন্তদাস কিছু বলতে পারে না। সমস্ত অপরাধ যেন তার একার। সে বিভ্রান্ত বোধ করছিলো। প্রকাণ্ড এক অপরাধের ভার নিয়ে কি সে পলায়ন করবে, না সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে রাজরোষের সম্মুখীন হবে। সে শেষে জানালো, আমার কারণে আর চিন্তিত হবেন না–আমি চলে যাচ্ছি।
ঐ সময় কৃষ্ণা এসে সম্মুখে দাঁড়ায়। বলে, তুমি চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা? আমরা কোথায় যাবো?
তোমাদের তো কোনো দোষ নেই, অপরাধ আমি করেছি, যদি শাস্তি দেয়–আমাকে দেবে।
এই তোমার বুদ্ধি! জানো, শক্তিবর্মণের চরেরা কত প্রকার উৎপীড়নের প্রক্রিয়া জানে? তুমি জানতেও পারবে না, কখন তুমি সমস্ত কথা প্রকাশ করে দিয়েছো আর সকল সংবাদ যদি তারা জানতে পারে, তাহলে আমাদের কি দশা হবে ভাবো তো?
বসন্তদাসের ক্রোধ হয় এ কথা শুনে। বলে, ষড়যন্ত্র করলে তার শাস্তি হবে না?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই শাস্তি হবে, তার জন্য আমরা প্রস্তুতও কিন্তু তুমি? নিষ্কৃতি পাবে কি? তুমিও নিষ্কৃতি পাবে না–এই সামন্তরাই তোমার সর্বস্ব অপহরণ করেছে। তোমার কোনো অপরাধ ছিলো না, তথাপি তুমি অপহৃত হয়েছে। নিরপরাধ হলেই যে তুমি রক্ষা পাবে–এমন নিশ্চয়তা কি কেউ তোমাকে দেবে?
না, দেবে না, বসন্তদাসকে স্বীকার করতে হয়। কিন্তু বারবার একই প্রশ্ন সে করে, আমি তো কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত নই–আমি তো কোনো প্রকার দ্রোহের উত্থান সমর্থন করি না, তথাপি কেন আমি পলায়ন করবো?
কৃষ্ণার দুচোখে অগ্নি স্কুরিত হয়। বলে, এই তোমার পৌরুষ? নির্বোধ, একাকী, দায়হীন–বিদ্রোহ যদি হয়, তাহলে তা হবে কার জন্য, আমার জন্য? বলো? আমাকে কী দেবে সেই উপপ্লব? আমরা মন্দিরদাসী, আমাদের গৃহ নেই, সংসার নেই, ভবিষ্যৎ। নেই–তথাপি আমাদের মনে হয়েছে, অনাচারের অবসান হওয়া প্রয়োজন, অত্যাচার দূর হওয়া উচিত, মানুষের অপমান এবং লাঞ্ছনা আর সহ্য হয় না। যদি আমাদের নিষ্ফল জীবন মানুষের জন্য কল্যাণময় ভবিষ্যৎ এনে দিতে পারে, তাহলেই মনে করবো জীবন আমাদের সার্থক হয়েছে। কল্যাণ ও মঙ্গলময় সেই ভবিষ্যৎ আমাদের হবে না, হবে তোমাদের, যাদের গৃহ আছে, সংসার আছে–তথাপি আমরা মনে করবো, আমাদের জীবন জগতের কাজে লাগলো।
বসন্তদাস শুনছিলো। কৃষ্ণার প্রতিটি কথা তার মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যাচ্ছিলো। একেকবার স্মরণ হচ্ছিলো বিগত রাত্রির কথা। এ কোন রমণী, এ কি গত রাতের সেই কামবিলাসিনী মন্দিরবারাঙ্গনা? যার কাছে আত্মসমর্পণ না করে উপায় ছিলো না? নাকি এ অন্য কোনো তেজস্বিনী নারী। স্বয়ং আদ্যাশক্তি কি আশ্রয় নিয়েছেন এই সুন্দর রমণী দেহের ভিতরে? পরিশেষে সে বিগত রাত্রির মতোই আত্মসমর্পণ করলো। বললো, উত্তম কথা, আমি নগরী ত্যাগ করছি এবং সেই সঙ্গে তোমাদের সংসর্গও।
তুমি বড় নিষ্ঠুর হে ক্ষেত্রকর! কৃষ্ণা সহাস্য মন্তব্য করেছে তারপর। নিজ কক্ষে নিয়ে গিয়েছে। দুটি সুবর্ণ মুদ্রা কটিবন্ধে বেঁধে দিয়েছে। বলেছে, তুমি মঙ্গলদ্বীপ গ্রামে যাবে, দক্ষিণে নয়, বামে নয়–একেবারে স্থির পশ্চিমেমঙ্গলদ্বীপে তুমি দিবানাথের গৃহে আশ্রয় নেবে, যদি সেখানে মিত্রানন্দকে পাও, উত্তম, যদি না পাও, তাহলে দিবানাথের পরামর্শ মতো অন্যত্র যাবে।
