শক্তিবর্মণ তাঁর বিপুল দেহ নিয়ে উল্লাসে হাসিতে একেবারে ভূমিতে লুণ্ঠিত হচ্ছেন তখন। সম্মুখে নৃত্য হচ্ছে কিন্তু সেদিকে তার মনোযোগ নেই। নানান কথা তার মনে উদিত হচ্ছে এবং সেগুলি তিনি বলে যাচ্ছেন একে একে।
বয়স্যদের ডেকে বললেন, ওহে বলীবর্দ, বলো দেখি, ক্ষাত্ৰতেজ কিসে উদ্দীপ্ত হয়?
বয়স্যটি বিপাকে পতিত হয়। পিতৃপুরুষের জন্মে সে এমন প্রশ্ন শোনেনি। অপ্রতিভ হয়ে সে বলে, মহারাজ, ক্ষাত্ৰতেজের কথা বলছেন? শুনেছি ময়ূর মাংস ভক্ষণে ….
কুক্কুর, তুমি প্রকৃতই একটি কুক্কুর হে–কেবল খাদ্যের দিকে মন তোমার। পারবে বলতে? হা হা হা–পারবে না হে, পারবে না–শুনে রাখো, ক্ষাত্ৰতেজ উদ্দীপ্ত হয় রণে ও রমণে।
ওদিকে বিভাবতীর নৃত্য সমাপ্ত হয়েছিলো। সে নিকটে এলে কোমলস্বরে ডেকে বললেন, অয়ি সখী বিভু, তুমি সেই নৃত্যটি দেখাবে? সেই যে কেশব বাসনা লক্ষ্মী মন্থন শেষে সমুদ্রগর্ভ থেকে উঠে আসছেন, হাতে তাঁর অমৃতভাণ্ডটি?
বিভাবতী প্রণাম জানিয়ে সহচরীদের নির্দেশ দিলো। তারপর আরম্ভ করলো সেই নৃত্যটি। স্বভাবতঃই সে মুদ্রা এবং তালে নতুন ভুবন সৃষ্টি করতে পারতো, তায় তখন রাত্রির মধ্যযাম এবং প্রদীপালোকের মায়ালোক। উপরন্তু আসবমত্ত দর্শকদের দৃষ্টি মদিরাতুর–ফলে চোখের সম্মুখে নানান বিভ্রম সৃষ্টি হতে লাগলো। দ্বারান্তরালে বাদিকা সুললিতার হাতে ছিলো মৃদঙ্গ এবং নীলাঞ্জনার হাতে বীণা। দৃশ্য এবং শ্ৰব্য উভয়ের এমন সুসমঞ্জস মিলন কদাচিৎ ঘটে। আরক্ত নেত্রে মহাসামন্তপতি এবং তার সহচর দুই বয়স্য যা দেখতে লাগলেন, তাতে ভাবলেন, তাঁরা ইন্দ্রসভায় বসে আছেন।
প্রদীপালোকের সম্মুখে কে একজন অন্তরাল সৃষ্টি করলো, তাতে আলোহীন অন্ধকারবিহীন একটি মায়ালোক জন্ম নিলো। অদৃশ্যে কোথায় যেন তখন অস্ফুট মৃদঙ্গের শব্দ হচ্ছে। যেন আলো অন্ধকারে সৃষ্টির প্রথম লগ্ন। সাগর–মৃত্তিকা–অন্তরীক্ষ ব্যাপ্ত সমগ্র চরাচরে গভীর, ধীর, অথচ প্রাণময় ওঙ্কার নাদটি সবে আরম্ভ হয়েছে, এমন মনে হলো। সেই অন্ধকারের বুকে রত্নখচিত মুকুটটি প্রথমে দেখা গেলো, তারপর লক্ষ্মীর বিদ্যানন, শেষে পূর্ণ দেহাবয়বটি। মেনকা কি এমন যৌবনধন্যা ছিলেন? নাকি ইনি উর্বশী? রম্ভার কটিদেশ কি এরূপ ক্ষীণ ছিলো এবং নিতম্ব এমন গুরুভার? বয়স্যরা চক্ষু কচালিত করলো। সূক্ষ্ম চীনাংশুকের অন্তরাল থেকে লক্ষ্মীর উরুদেশের যেটুকু সৌন্দর্য নৃত্যের প্রতিটি তালের সঙ্গে ঝলকে ঝলকে গোচরে আসছিলো তাতে স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হওয়া ছাড়া দর্শকদের গত্যন্তর ছিলো না। গভীর তলদেশের স্থিরতায় প্রথমে কম্পন, তারপরে যেন কলরোল জেগেছে। মন্থিত সমুদ্রের জলরাশিতে নয়, বিষ্ণুবাসনা লক্ষ্মীর যৌবনময় দেহবল্লরীতেই যেন বিপুল উল্লসিত এবং ফেনাময় কলরোল উন্মথিত হচ্ছে। এই ঘটনা কি মর্ত্যের? দর্শকেরা বলতে পারবে না। ক্রমে লক্ষ্মী তার কক্ষে সুবর্ণ কলসটি নিয়ে স্মিত হাস্যে স্থির হলেন।
অর্থাৎ এতক্ষণে দেবীর পূর্ণ প্রকাশ ঘটলো। দীপাধারের ঘৃত প্রদীপগুলি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। এখন আর আলোছায়ার বিভ্রম নয়। উজ্জ্বল আলোক লক্ষ্মীর দেহত্বকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে–পরিপূর্ণ উরুদেশ, ক্ষীণ কটি, বিপুল নিতম্ব ও প্রমত্ত জঘন মানবী দেহে বিন্যস্ত হয়ে ক্রমে যেন দর্শকদের চোখের সম্মুখে একটি স্পর্শাতীত বাসনার মূর্তি হয়ে উঠলো। দর্শকরা বিভ্রান্ত। কেউ নিঃশ্বাস ত্যাগও করে না–কি জানি, যদি এই স্বপ্নঘোর ভেঙে যায়?
কিন্তু প্রকৃতই কি স্বপ্নঘোর? বিভাবতী স্বপ্নঘোর সৃষ্টি করতে চায়নি, তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। সে ধীর পদক্ষেপে এক সময় নিকটে এসে সুবর্ণ কলসের অমৃত ঢেলে পানপাত্রগুলি পূর্ণ করে দিলো।
নৃত্য শেষ হয়েছে, কিন্তু তখনও কক্ষের মধ্যে রেশটির গুঞ্জরণ শোনা যাচ্ছে–মৃদঙ্গ ও বীণার মূৰ্ছনা তখনও কক্ষের চারিদিকে কম্পমান–ঐ সময় বিভাবতীর মুখে কথা ফুটলো–মহারাজ, লক্ষ্মীর অমৃত পান করুন।
ও হ্যাঁ, সম্বিত ফিরলো যেন প্রত্যেকের। শক্তিবর্মণ ডেকে বললেন, ওহে অমৃত পান করো–অমর হবার এই–ই সুযোগ।
অতঃপর স্বল্প কিছু কথা, কয়েকমুহূর্তের উল্লাস এবং বিভাবতাঁকে নিকটে পাওয়ার জন্য উদ্বাহু আহ্বান–এই পর্যন্তই। অর্ধদণ্ডকালও অতিক্রম হয়নি, দেখা গেলো, বিশালাকার তিন ষণ্ডই ভূমিতে লুণ্ঠিত–তাদের নাসিকা গর্জনে পৃথিবী থরথর কম্পমান।
ঔষধি ক্রিয়ায় সম্ভবত কাণ্ডটি ঘটে থাকবে, বসন্তদাস অনুমান করে। সে সমস্ত প্রক্রিয়াটি দ্বারান্তরাল থেকে প্রত্যক্ষ করছিলো–কৃষ্ণাও ছিলো নিকটে উপবিষ্টা। শক্তিবর্মণ পপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে প্রমোদ কক্ষে প্রবেশ করে প্রদীপগুলি নির্বাপিত করতে থাকে। শুক্লার কণ্ঠস্বর শোনা যায় ঐ সময়, সে বাহিরের প্রহরীদের ডেকে বলছে, মহারাজ নিদ্রাগত হয়েছেন–তোমরাও বিশ্রাম নিতে পারো।
ঐ স্বল্প সময়ের মধ্যে অসম্ভব এস্ত ব্যস্ত দেখা যায় তিনজনকেই। একজন মুণ্ডিতমস্তক ব্যক্তি যে কোন স্থান থেকে হঠাৎ আবির্ভূত হলেন সে এক রহস্য, আর তৎক্ষণাৎ কোথায় যে চলে গেলেন সে আরেক রহস্য। কৃষ্ণা ঐ মুহূর্তে বলে যায়, পলায়ন করবেন না, আমি এক্ষুনি আসছি।
স্বল্পক্ষণ পরই সে ফিরলো। মুখে বিজয়িনীর হাসি। বললো, এবার চল হে পথিক, তোমার সঙ্গে আলাপ করি।
