বসন্তদাস হাস্যাননা বিভাবতীর মুখপানে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে। দুকূল উত্তরীয় ঈষৎ বিস্রস্ত, কণ্ঠের মুক্তামালা উন্নত বক্ষশয্যায় একবার উঠছে একবার নামছে। মুখে সে কিছুই বলে না। ভিক্ষুককে প্রণাম করে কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়।
কিন্তু অন্ধকার অলিন্দে এসে উপনীত হতে না হতেই ডাক শুনতে পায়, পথিক কি নিদ্রার জন্য ব্যাকুল হয়েছেন?
না, শেষ পর্যন্ত আর পারেনি, বসন্তদাসের এখনও স্পষ্ট স্মরণ হয়। বিভাবতী নয়, শুল্কা নয়, কৃষ্ণাই এসে পথরোধ করে দাঁড়িয়েছিলো সেদিন। বলেছিলো, আপনাকে আমাদের বিশ্বাস নেই, তাই চক্ষুরান্তরাল করবো না–আপনি আমাদের হাতে বন্দী।
কী ভেবেছিলো তারা, বসন্তদাস জানতে পারেনি, তবে তার অনুমান, কৃষ্ণার কথা একেবারেই কৌতুকের ছিলো না। সম্ভবত তাদের আশঙ্কা ছিলো যে সে রাজপ্রহরীদের। হাতে বন্দী হলে সমস্ত কথা প্রকাশ করে দেবে। সে জন্যেই তাদের চেষ্টা, যাতে সে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকে এবং তুষ্ট থাকে।
বসন্তদাসের ততক্ষণে প্রত্যেকের পরিচয় জানা হয়ে গেছে। তিনজনই বিষ্ণু মন্দিরের। দাসী এবং তিনজনই নর্তকী। রাত্রির তখন মাত্রই মধ্য যাম। শুক্লা, কৃষ্ণা উভয়েই চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো। একজন বিভাবতাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলো, ওদিকে বিলম্ব হয়ে না যায়, চলো, শীঘ্র যাই।
মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি কানে আসছিলো না, হয়তো ওদিকে ততক্ষণে পূজা সমাপ্ত হয়েছে।
কৃষ্ণা নিকটে এসে বললো, চলো হে ক্ষেত্রকর, এবার বন্দীশালায় চলল।
আম্রকাননের মধ্য দিয়ে পথ, সম্ভবত এই পথেই তারা গমনগমন করে। ভিক্ষু ব্ৰজানন্দ তাদের সঙ্গে এলেন কানন পর্যন্ত। বিদায়কালে বললেন, মিত্রানন্দকে আজ রাত্রেই নগর ত্যাগ করতে বলবে–আজই সুযোগ।
পথিমধ্যে তিন সখীর পরামর্শ হয়। সিদ্ধান্ত হয় কৃষ্ণা বসন্তদাসকে নিয়ে গৃহে যাবে এবং বিভাবতী শুক্লাকে নিয়ে যাবে প্রথমে মন্দিরে, তারপর গৃহে। গৃহে ফিরতেই হবে কারণ পূজা শেষে মহাসামন্ত বিভার গৃহে যাবেন।
কাজটি বিপজ্জনক, কিন্তু ঐভাবেই তারা ভিক্ষু ব্ৰজানন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। যেদিনই রাত্রে মন্দিরে পূজার বৃহৎ আয়োজন হয়, সেদিনই তারা পূজার আয়োজন সমাপ্ত করে অন্য দুই সেবক ও দাসীকে মন্দিরে রেখে দর্শনার্থী নারীপুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে যায়। ঐভাবেই তারা মন্দিরের বাহিরে যায় এবং কাননের মধ্য দিয়ে রাত্রির অন্ধকারে অবলোকিতশ্বরের মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হয়। বোঝা যায়, তাদের এইভাবে গমনাগমনের ব্যাপারটি লোকচক্ষুর অগোচরেই ঘটে চলেছে। বসন্তদাস অনুমান করে মাত্র, প্রত্যক্ষ কিছুই সে দেখে না। তার অনুমান, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ভয়ানক কোনো ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত এই মন্দিরদাসীরাও। তার অবাক লাগে। মন্দিরদাসীদের আচরণ এমন কেন? দেশে যদি সত্য সত্যই দ্রোহ উত্থিত হয়, তাহলে এদের তো লাভালাভ কিছু নেই, তাহলে এরা কেন ষড়যন্ত্রের সঙ্গে লিপ্ত? বিভাবতী, কৃষ্ণা ও শুক্লার আচরণ সে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারে না।
মহাসামন্ত শক্তিবর্মণ বিভাবতীর গৃহদ্বারে উপনীত হয়ে অন্যান্য সহচরদের বিদায় দিলেন। সঙ্গে রাখলেন দুই বয়স্যকে। মন্দির থেকে এলেও তাঁর পদক্ষেপ স্থির নয়। থেকে থেকেই স্খলিত কণ্ঠে চিৎকার করছিলেন।
বিভা প্রস্তুত হয়েই ছিলো, সে রাজপুরুষদের সমাদরে কোনো ত্রুটি রাখে না। শক্তিবর্মণ বিভাবতাঁকে দেখে বললেন, সখী বিভু, তোমাকে যে মন্দিরে দেখলাম না?
মহারাজ সম্ভবত লক্ষ্য করেননি, আমার বেশ তখন অন্যরূপ ছিলো।
ও, তাই হবে তাহলে–ওহে তোমরা দেখেছিলে?
বয়স্য দুজন ইতস্তত করে বার দুই। তাদের বোধগম্য হচ্ছিলো না কোন উত্তরটি প্রভুর অভিপ্রেত। একজন বললো, না মহারাজ, দেখিনি–অন্যজন বললো, আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ, দেখেছি।
দুজনের দুই প্রকার উক্তিতে হা হা অট্টরবে হেসে উঠলেন শক্তিবর্মণ। বললেন, ওহে, দেখছি তোমাদের দুজনেরই বিভ্রম, কিন্তু বিভ্রম কিসে? দৃষ্টিতে না জিহ্বায়?
দাসী পুষ্পমালা রেখে গিয়েছিলো। শক্তিবর্মণ মালাগুলি দেখলেন হাতে নিয়ে। একখানি মালা এক বয়স্যের গলায় দিয়ে বললেন, নাও হে মর্কট, এটিকেই মুক্তামালা জ্ঞান করো।
অল্পক্ষণ পরই সঙ্গীত আরম্ভ হয়। শুক্লার গীতটিতে ছিলো বিষাদময় ভাব–একটি শুকপক্ষীর পিঞ্জর ত্যাগ করে পলায়নের কারণে নায়িকার যে বেদনা ও বিরহ, তাই সে বার বার গেয়ে প্রকাশ করছিলো। শক্তিবর্মণ বিরক্তি বোধ করেন। গীতের মধ্যস্থানেই বলে উঠলেন, রমণীর রোদন শুনতে আসিনি আমরা–বিভু কোথায়–আমরা যে নৃত্য দেখবো বলে এসেছি।
অচিরেই বিভাবতী নৃত্য আরম্ভ করলো। এই কলায় সে অসাধারণ পারদর্শিনী। যৌবনে মহারাজ লক্ষ্মণ সেন কয়েকজন নৃত্যপটিয়সী মন্দিরদাসী আনয়ন করেছিলেন কান্যকুজের দক্ষিণাঞ্চল থেকে, বিভাবতীর মাতামহী তাদেরই একজন। মন্দিরদাসীদের। পিতৃপরিচয় থাকে না–কিন্তু বিভাবতীর মাতা জানতেন তাঁর পিতৃপরিচয় কী, এবং বিভাবতী নিজেও জানে নিজ পিতার পরিচয়। সে যা–ই হোক, দৌহিত্রীর নৃত্যকলা শিক্ষা হয়েছে মাতামহীর কাছে। সুতরাং বিভাবতীর নৃত্য দেখবার মতো। শক্তিবর্মণ নৃত্য দেখতে দেখতে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। তিনি মধুকাসব পান করে পাত্রের পর পাত্র শূন্য করে দূরে নিক্ষেপ করছেন আর প্রমত্ত খলিত কণ্ঠে হা হা রবে অট্টহাসি হাসছেন। কখনও বামে, কখনও দক্ষিণে দুই বয়স্যের উপর ঢলে পড়ছেন। ওদিকে তখন নৃত্য উঠেছে তুঙ্গে–বয়স্য দুজন মহাসামন্তকে স্থির রাখার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু শক্তিবর্মণ কি আর স্থির থাকার লোক? তিনি অট্টরবে হাসতে হাসতে বললেন, আমাকে স্থির থাকতে বলছো কেন হে, জানো না, শৃঙ্খলিত ও স্থির থাকে ভারবাহী পশুরা! শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করলে কি কেউ শৃঙ্খলা রক্ষক হতে পারে? সম্ভব নয় হে, অনুশাসন শৃঙ্খলিত সন্ন্যাসী কি এই অপ্সরা রমণীর নৃত্যলীলা উপভোগ করতে পারবে? পারবে না। সদ্ধর্মী ভিক্ষু আর পাষণ্ড যোগীদের দ্রোহদমনও কি সাধুসন্ন্যাসীদের পক্ষে সম্ভব? বলো?
