এই স্থানে কেন? মধ্যরাত্রে এই স্থানে কি করছিলে তুমি?
ভিক্ষুটির উত্তেজিত অবস্থা দেখে বসন্তদাস সবিনয়ে জানায়, অর্হৎ, আপনি উত্তেজিত হবেন না, আমি জলপানের নিমিত্তে এই স্থানে
চুপ করো, কোনো কথা নয়।
ভিক্ষু বসন্তদাসকে কোনো কথা বলতে দিলেন না। ইঙ্গিতে মন্দিরদ্বারের দিকে নির্দেশ করে বললেন, চলো।
মন্দিরের ভিতরে অন্ধকার। সেই নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে অগ্রসর হওয়ার সময় এক তরুণী বসন্তদাসের সঙ্গে স্পৃষ্ট হয়–ক্ষণিকের স্পর্শমাত্র, কিন্তু তাতেই তটিনীকূলে মৃদু তরঙ্গাঘাতের শব্দের মতো অস্পষ্ট হাসি ছলকিত হলো। পশ্চাতে আবার মৃদু শাসনও শোনা গেলো। এক রমণী বললো, ওলো কৃষ্ণা, এতো হাসি কেন? হাসলে কাঁদতে হয় জানিস তো?
হ্যাঁ জানি, সময় হোক, কাঁদবো।
স্থান–কাল কিছুরই বিবেচনা নেই, কেবল কৌতুক। গুহাপথের মতোই পথ, অন্ধকারে নিজের হাত পর্যন্ত গোচরে আসে না। কিন্তু তথাপি কৌতুকের যেন শেষ নেই।
অবশেষে আলোর সন্ধান পাওয়া গেলো। ভিক্ষু যে প্রকোষ্ঠটিতে সবাইকে নিয়ে গেলেন, সেটি সম্ভবত তাঁর নিজেরই বসবাসের স্থান। এক পার্শ্বে শয়নবেদী, প্রাচীর গাত্রে দীপস্থান, সেখানে প্রদীপ জ্বলছিলো ঐ প্রদীপের আলোকে পরস্পরকে স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ হলো। বসন্তদাসের মুখপানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে ভিক্ষু জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সত্যই পথিক?
আজ্ঞে হ্যাঁ অর্হৎ, এখন আমি পথিক ব্যতীত অন্যকিছু নই, আত্রেয়ী তীরে আমার নিবাস, পিতা হেমন্তদাস, ক্ষেত্রকর্ম করেন।
তা এ স্থানে আগমনের কারণটি বলো।
বসন্তদাস তখন তার প্রতি শ্রীনাথবর্মণের আচরণের কাহিনীটি বর্ণনা করে। বর্ণনা সমাপ্ত হলে জানতে চায়, বলুন আপনারা, আমি কি ন্যায় বিচার আশা করতে পারি না?
তার কথা শুনে ভিক্ষুটি হাসেন। বলেন, বৎস, ন্যায় কাকে বলে সেটি জানা থাকলে তবে না বিচার হবে?
ক্ষণেক পরে বলেন, যাক সে কথা, এখন বলল, এই নগরীতে তোমাকে কে জানে?
আজ্ঞে না, এ নগরীতে কেউ আমাকে জানে না।
তুমি যে গোপন চর নও, তার নিশ্চয়তা কি?
আজ্ঞে নিশ্চয়তা আমি এবং আমার কথা, এই মাত্র বলতে পারি–আর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তুমি আমাদের কথা শুনেছো?
বসন্তদাস মুহূর্তে ইতস্তত করে, সত্য কথা বলবে কিনা। তারপর সহজ স্বরে বলে ওঠে, আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি শুনেছি।
কিছু বুঝতে পেরেছেন? এবার রমণীদের একজন জানতে আগ্রহী হয়।
বসন্তদাস পূর্ণদৃষ্টিতে রমণীটির মুখপানে চেয়ে দেখে। অত্যন্ত পরিপূর্ণ যুবতী এই রমণী, আর দেহকান্তি যে কি অপরূপ, তা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। রমণীটির মুখপানে দৃষ্টি রেখে সে অকপটে স্বীকার করে, আজ্ঞে হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি যে মিত্রানন্দ নামক কোনো এক ব্যক্তিকে আপনারা লুক্কায়িত রেখেছেন, কিন্তু এখন আর রাখতে পারছেন না–মহাসামন্তের চরেরা আপনাদের সন্দেহ করছে।
অকপট ঐ স্বীকৃতির পর কেউ–ই কথা বলে না, কিছুক্ষণ। শেষে তিন রমণীর মধ্যে যে সুন্দরীতমা, সে বললো, শুনুন, আপনাকে আমি মহাসামন্ত শক্তিবর্মণের কাছে নিয়ে যাবো–আপনার পণ্যসামগ্রী উদ্ধার হবে কিনা বলতে পারি না, আপনি যাবেন?
বসন্তদাস সাগ্রহে সম্মত হয়, অবশ্যই যাবো।
তাহলে একটি শর্ত আছে।
বলুন কি শর্ত? বসন্ত এবার রমণীটির মুখের উপর তার পূর্ণ দৃষ্টি রাখে।
আপনি আমাদের অতিথি হবেন কয়েকদিনের জন্য–গোপন কিছু নয়, আপনি নিজ পরিচয়েই আমাদের সঙ্গে অবস্থান করবেন, তবে আমাদের এই মন্দিরে আগমন, মিত্রানন্দ প্রসঙ্গ, অথবা যা শুনেছেন–কিছুই অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারবেন না। আপনার প্রিয়তমা রমণীর কাছেও নয়–মনে করবেন, আজ রাত্রের ঘটনাটি আদৌ ঘটেনি–পারবেন?
বসন্তদাস এবার অন্য দুই রমণীর দিকে দৃষ্টিপাত করে। কৃষ্ণা সম্ভবত শ্যামাঙ্গীর নাম, আর সুন্দরীতমা রমণীটি বোধ হয় বিভাবতী। সে লক্ষ্য করে দেখে, প্রত্যেকের মুখ গম্ভীর। বুঝতে পারে, গম্ভীর হলে রমণী মুখ সত্যিই মলিন হয়। ক্ষণকাল পূর্বেও সকলের মুখে কৌতুকোজ্জ্বল ভাব লক্ষ্য করা গেছে। সে ভিক্ষুর মুখে দৃষ্টিপাত করে বলে, অর্হৎ, আপনি জ্ঞানী ব্যক্তি এবং সাধু–আমার অবস্থাটি নিশ্চয়ই আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন। দেখুন, আমি এদেশের বিষয়ে কিছুই জানতাম না–আজ রাত্রেই এই পান্থশালায় এক গ্রন্থিছেদকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে–তার মুখেই শুনলাম যে এদেশে বৌদ্ধ সদ্ধর্মীরা রাজরোষে পতিত হয়েছে, তারা নাকি এদেশে দ্রোহ উত্থাপন করতে চায়। এখন দেখছি, তার কথা অমূলক নয়। এমতাবস্থায় আমি কোনো প্রকার বিপদে পতিত হতে চাই না–যদি আমার পণ্যাদি উদ্ধারের আদৌ কোনো আশা না থাকে, তাহলে অহেতুক এ স্থানে আমি কেন থাকবো? রাত্রি প্রভাত হলেই আমি চলে যাবো–আমাকে আপনারা অনুমতি দিন।
শুক্লা, এ পথিক দেখছি বড়ই চতুর–বিভাবতীর চটুল মন্তব্য বসন্তের শ্রবণে আসে।
হ্যাঁ, আমারও মনে হয়, একেবারে গভীর জলের মৎস্য, শুল্কা তৎক্ষণাৎ নিজ মত ব্যক্ত করে।
মন্তব্য দুটি শুনে বসন্তদাস হাসে। বলতে পারতো যে অবস্থাগুণে সকলেই চতুর হয়। কিন্তু কিছুই না বলে সে পুনরায় অনুমতি চায়, অর্হৎ, আদেশ করুন, আমি এবার যাই।
ওলো কৃষ্ণা, পথিককে তুই আমন্ত্রণ কর না, ও যে চলে যায়। সুন্দরীতমা বিভাবতীর কৌতুকস্বর এবার মাদকতাময়।
