সে ঐ কথার পর উঠলো। বললো, মহাশয়, আমি যাই, কিছু উপার্জনের সন্ধান করি–উদরে ক্ষুধা থাকলে নিদ্রা দেবী নিকটে আসতে চান না।
বসন্তদাস লোকটিকে দুই কুড়ি কড়ি দান করলে সে অভিভূত হয়ে পাদস্পর্শ করে প্রণাম করলো। তারপর বললো, মহাশয়, একটা কথা বলি আপনাকে–এ অধমকে অর্থ দান করলেন, এ বড় উত্তম কথা–কিন্তু সাবধান, এরূপ দয়া সর্বত্র প্রদর্শন করবেন না, বিপদ হবে।
কেন, বিপদ হবে কেন? বসন্তদাসকে অবাক হতে হয়।
বিপদ অন্য কিছুতে নয়, লোকটি জানায়, কোট্টপালের অনুচরেরা এ নগরীতে স্নানক তৎপর। ধনী পথিকের সর্বস্ব আত্মসাৎ করার কৌশল তাদের মতো আর কেউ জানে
–সুতরাং সাবধান।
গ্রন্থিছেদক দুই পদ অগ্রসর হয়েও ফিরে এলো। বললো, আর একটি কথা–আপনার মঙ্গলের জন্য বলি, যা শুনলেন সে বিষয়ে কোনোরূপ কৌতূহল প্রকাশ করবেন না। করলে সে আর এক বিপদ।
তুমি কি আবার এ স্থানে আসবে?
না মহাশয়, আজ মহাসামন্ত শক্তিবর্মণ সপারিষদ প্রাসাদের বাহিরে এসেছেন– রাত্রিকালে বিষ্ণুমন্দিরে পূজা, ওদিকে আবার শৌণ্ডিকালয়ের দ্বার সমস্ত রাত্রি মুক্ত থাকবে সুতরাং বুঝতেই পারছেন
গ্রন্থিছেদক চলে গেলে বসন্তদাস পুনরায় শয়ন করলো। আশা, এবার নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাবে। কিন্তু নিদ্রা আর আসে না–কেবলই ঘুরে ঘুরে গ্রন্থিছেদকের কথা স্মরণ হয়। কেবলই মনে প্রশ্ন জাগে, মহারাজ শক্তিবর্মণ কি তাহলে শঙ্কিত হয়ে রয়েছেন? বৃহৎ। কোনো যুদ্ধবিগ্রহ কি আসন্ন হয়ে উঠেছে?
সে পূর্বে কখনও এ সকল বিষয় নিয়ে চিন্তা করেনি। দেবীকোট মেলায় তিব্বতী ভিক্ষু দলটি এবং তাদের পশ্চাদ্ধাবনকারী রাজসেনাদের দেখে তার মনে চিন্তার উদয় হয়েছিলো প্রথম–কিন্তু ঐ চিন্তা নিতান্তই কৌতূহলাচ্ছন্ন। যবন বৃদ্ধটিও আলাপ প্রসঙ্গে দেশ–বিদেশের অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন–কিন্তু তখনও তার কাছে ব্যাপারটি নিজের জীবন–সংলগ্ন বলে মনে হয়নি। এখন হচ্ছে–বারংবার মনে হচ্ছে, কি কুক্ষণেই না তার আলাপ হয়েছিলো যবন বৃদ্ধটির সঙ্গে। যদি না হতো, তাহলে আজ তার এই অবস্থা হয়? না জানি এরপরও কোনো দুর্দশা তার ভাগ্যে আছে। ঐ রত্নগুলির সদগতি করতে এসেই না তার এখন এমন দুর্দশা।
তৃষ্ণা বোধ হওয়ায় সে উঠলো। বাহিরেই কূপ, সে কূপস্থলের দিকে চললো।
হঠাৎ নারী কণ্ঠের আলাপ তার শ্রবণে আসে। দুটি নারী–স্বর ঐ কূপস্থলের দিক থেকেই আসছে–সে দূর থেকেই নারীমূর্তি দুটিকে দেখতে পায়। তার অবাক লাগে, এখন রাত্রিকাল, এই সময়ে মন্দিরকূপে নারীর আগমন কেন? এই ক্ষুদ্র নগরীর নারীরা কি এতোই অসূর্যম্পশ্যা যে গভীর রাত্রি ব্যতিরেকে জলাহরণ করতে পারে না? সম্মুখে দৃষ্টিপাত করতেই সে পুনরপি দেখতে পায়, অদূরে মন্দিরদ্বার উন্মুক্ত এবং সেই দ্বারপথে একজন রমণী নিষ্ক্রান্ত হয়ে আসছে। সে নিজেকে বৃক্ষতলে অন্তরাল করে।
অর্ধাঙ্গ চন্দ্রটি তখন মন্দিরশীর্ষে আরোহণ করেছে। তার আলোকে কূপস্থলের সমস্তটাই দৃশ্যগোচর। দেখা গেলো, পুরুষটি মন্দিরেরই একজন ভিক্ষু। রমণীরা কে, সে অনুমান করতে পারে না। তবে দেখলো, তিন রমণীই যুবতী এবং রূপসী।
ভিক্ষুটি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বললেন, কি সংবাদ বিভাবতী, তুমি নাকি ভয় পেয়েছো?
ভয়, বিভাবতী সম্ভবত মৃদু হাস্য করে। বলে, বিভাবতী যদি ভয় পায়, তাহলে অনাথ মিত্রানন্দের কি দশা হবে প্রভু?
না, অর্হৎ, বিভাবতীর এক সঙ্গিনী জানায়, সে ভয় পাওয়ার পাত্রী নয়, তবে শীঘ্রই একটা ব্যবস্থা হওয়া প্রয়োজন–আমরা মিত্রানন্দকে আর রাখতে পারছি না, প্রতিদিনই বিপদাশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, মহাসামন্তের চরেরা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে।
এই রমণীরা কারা? আর এই ভিক্ষুটিই বা কে? বসন্তদাস কিছুই অনুমান করতে পারে না। শুধু এটুকু বুঝলো যে কিছু একটা অতীব গোপন ব্যাপারের সঙ্গে এরা যুক্ত।
একেকবার মনে হচ্ছিলো, এসব ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাপার–এসব তার শোনা উচিত নয়–এই মুহূর্তেই তার এ স্থান ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু ঐ সঙ্গেই আবার এও মনে হচ্ছিলো, আহা রমণী এতো সুন্দর হয়! এমন তো পূর্বে কখনও দেখিনি। ঐ মুহূর্তে রমণী–কণ্ঠের মাদকতা তার কর্ণে মধুবর্ষণ করছিলো। চন্দ্রালোকেও রমণীদের দেহরেখা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। সূক্ষ্ম চীনাংশুকে ঊর্ধ্বাঙ্গ আবৃত হলেও সুগোল স্কন্ধ, বঙ্কিম গ্রীবা, পীবরোন্নত বক্ষ, ক্ষীণ কটি, গুরু নিতম্ব, নিতম্ববেষ্টিত রত্নখচিত মেখলায় বিম্বিত চন্দ্রালোক–সমস্তই সে দেখতে পাচ্ছিলো। তার মনে হচ্ছিলো, এরা কি রাজপ্রাসাদের কন্যা ও বধূ? নাকি স্বয়ং রাণী আর তার দুই সহচরী? সে কিঞ্চিৎ আবিষ্টও হয়ে পড়েছিলো। একইসঙ্গে ভীতি ও কৌতূহল, রহস্য ও সৌন্দর্য, চন্দ্রালোকের মায়া এবং মধ্যরাত্রির নির্জনতা–সমস্ত একত্রে মিলিত হয়ে বিচিত্র একটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছিলো তার মনে। স্থানকালের চেতনা প্রায় লুপ্ত হবার উপক্রম হয়েছিলো ঐ সময়।
ফলে যা ঘটবার তা–ই ঘটলো। কখন যে সে বৃক্ষতলের অন্ধকার থেকে বাহিরের চন্দ্রালোকে এসে দাঁড়িয়েছে নিজেই জানে না। হঠাৎ সে একইসঙ্গে তিনটি কণ্ঠের অনুচ্চ চিৎকার শুনলো, কে, কে ওখানে?
ভিক্ষুটি ছুটে এলেন, পশ্চাৎ পশ্চাৎ এলো তিন যুবতী।
কে তুমি?
আমি পথিক, এই পান্থশালায় রাত্রিযাপন করি।
