পান্থশালাটির অবস্থা আরও শোচনীয়। অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মনে হতো যেন বা গুহায় প্রবেশ করেছি। দ্বিপ্রহরেও সেখানে রাত্রির মতো অন্ধকার এবং সেই সঙ্গে বহুকালের প্রাচীন একটি শীতল ভাব। একাকী সেখানে দিবসকালেও অবস্থান করা যেতো না। অধিকক্ষণ অবস্থান করলে মনে হতো, যেন প্রাচীরের কঠিন শীতলতা সজীব প্রাণটিকে পিষ্ট করতে আসছে। তাই সে রাত্রিকালে নিদ্রার সময়টুকু ব্যতীত প্রায় সর্বক্ষণই। বাহিরে অতিবাহিত করতো।
তবে শয়নকালে প্রতিদিনই অনুভব করতো, কক্ষে সে একাকী নয়, আরও দুএকজন উপস্থিত আছে। তারা কে, কখন আসে, কখন যায়–কিছুই তার পক্ষে জানা সম্ভব হয় না।
একদা রাত্রে, প্রথম যামই হবে তখন, হঠাৎ তার নিদ্রা ভঙ্গ হলো। অনুভব করলো কে একজন তার কটিবন্ধটি মোচন করতে চাইছে। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না, তবে অনুমান করলো, পান্থশালাটি গ্রন্থিছেদকদেরও নিদ্রার স্থান। অন্য সময় হলে কি করতো বলা কঠিন। কিন্তু তখন তার অবস্থা মরিয়া। সামান্য কিছু অর্থ আছে সঙ্গে। ঐ অর্থটুকু চলে গেলে তাকে প্রকৃত অর্থেই পথে বসতে হবে। সে বিলম্ব করলো না, ক্ষিপ্রগতিতে লোকটিকে ধরাশায়ী করে তার বক্ষে দেহভার এবং গলদেশে দুহাত রেখে জানতে চাইলো, কে তুই বল–কেন তুই আমার কটিদেশে হাত দিয়েছিস? শীঘ্র বল, নতুবা এই তোর শেষ!
লোকটির কণ্ঠ থেকে বিচিত্র স্বর নির্গত হচ্ছিলো। বললো, আমাকে ছেড়ে দিন মহাশয়, এমন কাজ আর কখনও করবো না, অপরাধ মার্জনা করুন। আমি বড় ক্ষুধার্ত, ক্ষুধা নিবৃত্তির আশায় আমি এই দুষ্কার্যে প্রবৃত্ত হয়েছি–আপনি আমার প্রভু। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে–দয়া করুন।
লোকটির সমস্ত কথাই মিথ্যা। সে ক্ষুধাকাতর নিশ্চয়ই নয়–ক্ষুধাকাতর মানুষ অমন শক্তিমান হয় না–আর তখন হাত দুটি গলদেশে রাখা ছিলো মাত্র, তাতে শ্বাস রুদ্ধ হবার কথা নয়। একেকবার ইচ্ছা হচ্ছিলো, দুহাতের মুষ্টিতে গলাটি পিষ্ট করে। কিন্তু পরিণামের কথা চিন্তা করে বিরত হলো। সে চায় না, তাকে নিয়ে কোনো গোলযোগ সৃষ্টি হোক আর তাতে কোনো রাজপুরুষের দৃষ্টি তার উপর পতিত হোক। লোকটি নানান কথা বলে যাচ্ছিলো। তার কথায় জানা গেলো, ঐ স্থানে আরও দুজন গ্রন্থিছেদক রাত্রিযাপন করে। আজ তাদের উত্তম উপার্জন হয়েছে বলে শৌণ্ডিকালয়ে স্ফুর্তিতে মত্ত। শুধু তারই মন্দভাগ্য, নতুবা এমন হয়? বিদেশী পথিক যে এরূপ সাহসী আর শক্তিমান হবে, তা জানলে, কোন শ্যালক এই কাজ করতে আসে। সে মিনতি করে বললো, মহাশয়, আমি আপনাকে পিতা ডাকছি, আপনি আমাকে চলে যেতে দিন–আমি আর কদাপি এমন কাজ করবো না।
বসন্তদাসের মনে হলো, লোকটি সরল এবং কিঞ্চিৎ রসিকও। সে তার বক্ষ থেকে নেমে বসলো। লোকটি পারতো, কিন্তু তৎক্ষণাৎ পলায়ন করলো না। বললো, আমার চতুর্দশ পুরুষের সৌভাগ্য যে আপনার মত দয়ালু লোকের হাতে পড়েছিলাম, মহাশয় যে এমন মার্জার–চক্ষু, রাত্রিকালেও দেখতে পাবেন, আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
গৃহস্থ নয়, পথিক নয়–ভিক্ষু কিংবা যোগীও নয়, এই দূর দেশে যে লোকটির সঙ্গে তার আলাপ হচ্ছে সে একজন গ্রন্থিছেদক। উত্তম বসন্তদাস–নতুন স্থানে এসে অত্যন্ত উত্তম ব্যক্তির সঙ্গে হৃদ্যতা হচ্ছে তোমার। এই না হলে কপাল? সে ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে লাগলো।
গ্রন্থিছেদকের কাছে অনেক সংবাদ। যেমন, এই স্থানের লোকেরা বহিরাগতদের সম্পর্কে অতিমাত্রায় সাবধান। গূঢ়পুরুষ প্রায় সর্বত্রই আছে। বিশেষত যেদিন মহাসামন্ত শক্তিবর্মণ প্রাসাদের বাহিরে আসেন, সেদিন প্রায় সকলেই তটস্থ থাকে। বহিরাগত ভিক্ষু যোগী ইত্যাদি দেখলেই নগরবাসী সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। কেনো ভিক্ষু এবং যোগীরাই নানান অনর্থের মূল। কোথায় যে কোন নিরীহ গৃহস্থকে বিপদাপন্ন করবে তার স্থিরতা নেই।
ভিক্ষু যদি এতোই পরিত্যাজ্য হয়, তাহলে এই মন্দির তো থাকবার কথা নয়– বসন্তদাস মন্তব্য করে।
প্রশ্ন শুনে গ্রন্থিছেদক হাসে। বলে, না মহাশয়, আপনার ধারণা ভুল–এই মন্দির থাকবারই কথা। যদি মন্দিরটি না থাকতো, তাহলে মহাসামন্ত একটি বৌদ্ধ মন্দির এখানে নির্মাণ করতেন। এও তার একটি কৌশল। এই মন্দিরটি আছে বলেই সদ্ধর্মীদের উপর সহজে দৃষ্টি রাখতে পারেন। এই তো দিন কয় পূর্বের কথা। চারিদিকে হৈ হৈ রব। প্রহরীর দল পথে পথে ধাবমান। কি ব্যাপার? না একজন ভিক্ষুকে পাওয়া যাচ্ছে না। গূঢ়পুরুষদের কাছে সংবাদ ছিলো, এক ষড়যন্ত্রী ভিক্ষু নাকি নগরে প্রবেশ করেছে–তার কাছে নাকি রয়েছে একখানি গোপন পত্র। নগরের সমস্ত ভিক্ষু ও যোগীদের বন্দী করা হলো, কিন্তু দেখা গেলো, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি নেই। সে এক বিষম কাণ্ড, নগরবাসীর গৃহে গৃহে চললো অনুসন্ধান। এবং দেখা গেলো, শেষ পর্যন্ত সমস্তই নিষ্ফল।
বসন্তদাস যা শুনছিলো তা যেমন কৌতূহলোদ্দীপক, তেমনি আবার আতঙ্কজনকও। বহিরাগত ব্যক্তি হওয়াতে তার শঙ্কিত হওয়ার কথা কিন্তু সে অধিকতর কৌতূহল বোধ। করছিলো। জানতে চাইলো, এই ভিক্ষুরা কী চায় বলতে পারো?
মহাশয়, ও বিষয়ে আমি একেবারেই অজ্ঞ, লোকটি জানায়। অতঃপর বলতে থাকে, তবে জনরব শুনেছি, তারা নাকি দ্রোহ উত্থাপন করতে চায়। ক্ষেত্রকর এবং অন্ত্যজদের সঙ্গে তাদের সবিশেষ মিত্রতা। অবশ্য আমার ধারণা তারা নির্বোধ, পিপীলিকার পক্ষ উদ্গয়ের মতো ব্যাপার আর কি! না হলে শস্ত্রধারী সুশিক্ষিত কুশলী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ডোম আর ক্ষেত্রকরেরা যুদ্ধ করতে পারবে, এই ধারণা কারও হয়?
