অতুল হালদার বললেন, খুব ইণ্টারেস্টিং ইতিহাস। আমি নোট করে নিয়েছি, আমাদের হিন্দুস্থান মিরর কাগজে ছাপব। আপনার কোনও আপত্তি নেই তো জটাধরবাবু?
—কিছুমাত্র না, স্বচ্ছন্দে ছাপুন। যদি চান তো আরও ডিটেল দিতে পারি, অচলা আর আমার ফোটোও দিতে পারি।
এই সময় একটি লোক টি ক্যাবিনের দরজার কাছে এসে ভাঙা গলায় বলল, জটাধর বকশী এখানে আছে?
আগন্তুক লোকটি রোগা, বেঁটে, পরনে ময়লা খাকী প্যাণ্ট নীল জার্সি, তার উপর মোটা পট্টুর বুক খোলা কোট, হাতে একটা বড় রেঞ্চ। তার প্রশ্নের উত্তরে জটাধর বললেন, আমিই জটাধর বকশী। আপনি কে মশাই?
—তোমার যম। এই কথা বলেই লোকটি ঘরে এসে খপ করে জটাধরের হাত ধরল।
রামতারণ বললেন, কে হে তুমি এখানে এসে হামলা করছ? জান, এ হল ট্রেসপাস, ক্রিমিন্যাল কেস। নাম কি তোমার?
—আমার নাম বলহরি জোয়ারদার। আপনাদের কিছু বলছি না মশাই, আমার দরকার এই শালা জটাধরের সঙ্গে?
রামতারণ বললেন, অ্যাঁ, অবাক কাণ্ড! তুমিই অচলার ভূতপূর্ব স্বামী নাকি?
—শুধু ভূতপূর্ব নই মশাই, দস্তুর মতন জলজ্যান্ত বর্তমান স্বামী, ভবিষ্যতেও স্বামী। এই পাজী জটে শালাকে যদি জেলে না পাঠাই তো আমার নাম বলহরি জোয়ারদার নয়।
রামতারণ বললেন, আচ্ছা ফ্যাসাদ! কি হে জটাধর, এখন করবে কি?
জটাধর করুণ স্বরে বললেন, আমার সর্বনাশ হবে সার, আপনিই একটা ফয়সালা করুন। এই বলে জটাধর রামতারণের পা ধরলেন।
রামতারণ বললেন, স্থির হও জটাধর, এ সব ব্যাপারে মাথা ঠাণ্ডা রাখা দরকার। মীমাংসা তো অচলার হাতে। সে যদি বলে, এই লোকটিই তার স্বামী, তবে আর কথা নেই, তোমাকে তাই মেনে নিতে হবে। ও জোয়ারদার মশাই, আপনি অচলার সঙ্গে দেখা করেছেন?
—তা আর আপনাকে বলতে হবে না, তার কাছ থেকেই তো আসছি। আমাকে দেখে মাগী বেদম কান্না শুরু করেছে। আমি ধমক দিতে বলল, জটাইবাবুকে ডেকে আন, তাঁর অমতে কিছু করতে পারব না। ওঃ, জটাই যেন তাঁর গুরুঠাকুর।
রামতারণ বললেন, ব্যাপারটা বিশ্রী রকম জটিল হল দেখছি। অচলা যদি জটাধরের কাছেই থাকতে চায় আর বলহরি তাতে রাজী না হয় তবে তো মহাফ্যাসাদ, আদালতের ব্যাপার। কিন্তু বেআইনী কাজ তো কিছুই হয় নি। নষ্টে মৃতে প্রব্রাজতে—একটা শাস্ত্রবচন আছে না? বারো বছর কেটে গেলে রীতিমত শ্রাদ্ধশান্তির পরে অচলার পুনর্বিবাহ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভূতপূর্ব স্বামীর ফিরে আসাই অন্যায়।
কপিল গুপ্ত বললেন, এখন আর্ডেনের মতন মানে মানে সরে পড়াই উচিত ছিল।
বলহরি বলল, আহা কি কথাই বললেন মশাই, প্রাণ জুড়িয়ে গেল। নিজের স্ত্রীর কাছে আসব না তো এই জটেকে দেখে জিব কেটে পালাব নাকি?
জটাধর বললেন, আমি এই বলহরি জোয়ারদার মশাইকে খেসারত হিসেবে কিছু টাকা দিতে রাজী আছি। এখন পঞ্চাশ দিতে পারি, বাসায় গিয়ে আরও পঞ্চাশ—
বলহরি গর্জন করে বলল, চোপ রও শুয়ার, এক শ টাকায় আমার বউ কিনতে চাও? একটা পাঁঠীও ও দামে মেলে না।
কপিল গুপ্ত বললেন, ওহে জোয়ারদার, একটু বুঝে—সুঝে তম্বি ক’রো । তুমি তো তালপাতার সেপাই, জটাধরের চেহারাটি দেখছ তো? এক চড়েই তোমাকে সাবাড় করতে পারে।
—এঁঃ, চড় মারলেই হল! দেখছেন না, ব্যাটা ভয়ে কেঁচো হয়ে আছে। পাঁচটি বচ্ছর মাঞ্চুরিয়ার জাপানীদের কাছে ছিলাম মশাই, জুজুৎসুর প্যাঁচ ভাল করেই শিখেছি। তারপর চীনেদের সঙ্গে সাত বছর কাটিয়েছি। ছাড়তে কি চায়? তিনটে কমরেডকে গলা টিপে মেরে পালিয়ে এসেছি। জটাধরকে দুটি আঙ্গুলের টোকায় কাত করতে পারি। চল হতভাগা।
কাঁচপোকা যেমন প্রকাণ্ড আরশোলাকে ধরে নিয়ে যায় তেমনি বলহরি জোয়ারদার জটাধরের হাত দরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলে গেল।
রামতারণ মুখুজ্যে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, এমন বিপদেও মানুষ পড়ে! আহা বেচারা আজ দুপুরে বিয়ে করেছে আর সন্ধ্যাবেলায় এই বিশ্রী কাণ্ড। অচলা মেয়েটার জন্যে সত্যিই দুঃখ হচ্ছে।
ম্যানেজার কালীবাবু নিবিষ্ট হয়ে হিসাব করছিলেন। এখন উচ্চস্বরে বললেন, চুলোয় যাক অচলা, আজকের খরচা দেবে কে? জটাধর তো আপনাদের বোকা বানিয়ে সরে পড়ল।
কপিল গুপ্ত বললেন, সরে পড়েছে তাতে হয়েছে কি? আমরা তো নিজের নিজের খরচে খেতে প্রস্তুতই ছিলুম। কালীবাবু, তুমি আমাদের নামে নামে বিল তৈরি কর।
কালীবাবু বললেন, কিন্তু ওই জটাধর যে নিজেই বারোটা চপ, চারখানা কেক, আর চারটে বড় পেয়ালা চা খেয়েছে, তা ছাড়া বউকে দেবে বলে সাতটা চপ পকেটে পুরেছে। মোট দাম হল ন টাকা ছ আনা। এ খরচ কে দেবে?
কপিল গুপ্ত বললেন, মোটে ন টাকা ছ আনা? দেড়খানা উপন্যাসের দাম। খরচটা আমাদের মধ্যেই চারিয়ে দাও, কি বলেন মুখুজ্যেমশাই? জটাধরের বিবেচনা আছে, বেশী ঠকায় নি।
বীরেশ্বর সিংগি বললেন, আমি তখনই বুঝেছিলাম যে ওই বলহরিই হচ্ছে জটাধরের মাসতুতো ভাই, সাতটা চপ তার পেটেই যাবে।
১৩৬১ (১৯৫৪)
* জটাধরের পূর্বকথা ‘কৃষ্ণকলি ইত্যাদি গল্প’ পুস্তকে আছে।
জয়হরির জেব্রা
এই আখ্যানের নায়ক জয়হরি হাজরা, নায়িকা বেতসী চাকলাদার, উপনায়ক উপনায়িকা গুটিকতক জন্তু, যথা—একটি বিলাতী কুত্তা, একটি দেশী কুত্তী, একটি আরবী ঘোড়া এবং একটি ভারতীর জেব্রা। লেডিজ ফার্স্ট—এই আধুনিক নীতি অনুসারে প্রথমে বেতসীর পরিচয় দেব, তারপর জয়হরির কথা বলব। জন্তুদের অবতারণা যথাস্থানে করলেই চলবে।
