কিছুদিন পরে সুনন্দার চিঠি এল। —যাঃ, ভেস্তে গেল, এমন মুশকিলেও মানুষ পড়ে! পবন ভাদুড়ী এখানে এসেছে। কাল আমার সঙ্গে দেখা করে বলল, দেখ সুনন্দা এখন আমি স্বাধীন, ভাল রোজগার করি, বাপ—মায়ের বশে চলবার কোনও দরকার নেই! তুমি আমার সঙ্গে চল, ব্যাঙ্গালোরে সিভিল বা হিন্দু ম্যারেজ যা চাও তাই হবে।
এই তো পরিস্থিতি। আমার অবস্থাটা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। পবন ভাদুড়ীকে হাঁকিয়ে দেওয়া আমার সাধ্য নয়, কালই অর্থাৎ আপনার নির্ধারিত বিবাহের দুদিন আগেই পবনের সঙ্গে আমি পালাচ্ছি। কিন্তু আপনার প্রতি আমার একটা কর্তব্য আছে, আপনার ব্যবস্থা না করে আমি যাচ্ছি না। আমার বোন নন্দা আমার চাইতে দেড় বছরের ছোট। দেখতে আমারই মতন, তবে রঙ বেশ ফরসা। সেও বি. এস—সি. ফেল। ঝকঝকে দাঁত, পান—দোক্তা খায় না, এ পর্যন্ত প্রেমেও পড়েনি। আপনার সব চিঠিই সে পড়েছে, পড়ে ভীষণ মোহিত হয়েছে। আপনাকে বিয়ে করবার জন্যে মুখিয়ে আছে। ডক্টর সুকান্ত, দোহাই আপনার, কোনও হাঙ্গামা বাধাবেন না, বাড়ির কাকেও কিছু বলবেন না। আপনাদের প্রোগ্রাম অনুসারে বরযাত্রী নিয়ে যথাকালে আমাদের বাড়িতে আসবেন, পুরুত যে মন্ত্র পড়াবে সুবোধ বালকের মতন তাই পড়বেন, আমার বাবা নন্দাকেই আপনার হাতে সম্প্রদান করবেন। তাকে পেলে নিশ্চয় আপনি সুখী হবেন। আপনি তো গৃহস্থালি দেখবার জন্যে একটি গৃহিণী চান, সুতরাং সুনন্দার বদলে নন্দাকে পেলেও আপনার চলবে। নিজের বোনের প্রশংসা করা ভাল দেখায় না, নয়তো চুটিয়ে লিখতুম নন্দা কি রকম চমৎকার মেয়ে। আজ বিদায়, এরপর সুযোগ পেলে আপনার সঙ্গে দেখা করে আমি ক্ষমা চাইব। ইতি। সুনন্দা।
সুনন্দার চিঠি পড়ে সুকান্ত হতভম্ব হল, খুব রেগেও গেল। কিন্তু সে যুক্তিবাদী র্যাশনাল লোক। একটু পরেই বুঝে দেখল, সুনন্দার প্রস্তাব মন্দ নয়। গৃহিণীই যখন দরকার তখন এক পাত্রীর বদলে আর এক পাত্রী হলে ক্ষতি কি। সুকান্ত স্থির করল সে হাঙ্গামা বাধাবে না, কোনও রকম খোঁজও করবে না, সম্পূর্ণভাবে মামার বশে চলবে, তিনি যেমন ব্যবস্থা করবেন তাই মেনে নেবে।
সুকান্ত কলকাতায় এলে তার মামার বাড়ির কেউ সুনন্দা সম্বন্ধে কিছুই বলল না, কোনও রকম উদ্বেগও প্রকাশ করল না। যথাকালে বরযাত্রীদের সঙ্গে সুকান্ত বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হল। সেখানেও গোলযোগের কোনও লক্ষণ তার নজের পড়ল না।
সুকান্ত দেখল, ষোল—সতেরো বছরের একটি ছেলে নিমন্ত্রিতদের পান আর সিগারেট পরিবেশন করছে, কন্যাপক্ষের লোকে তাকে লম্বু বলে ডাকছে। তাকে ইশারা করে কাছে ডেকে সুকান্ত চুপি চুপি প্রশ্ন করল, তুমি সুনন্দার ছোট ভাই লম্বু?
লম্বু বলল, আজ্ঞে হাঁ।
—এদিকের খবর কি?
—খবর সব ভালই। দিদিকে এখন সাজানো হচ্ছে, একটু পরেই তো বিয়ের লগ্ন।
—সুনন্দা চলে গেছে?
—কি বলছেন আপনি, বিয়ের কনে কোথায় চলে যাবে?
—তোমার আর এক দিদি নন্দা, তার খবর কি?
—বা রে! আমার তো একটি দিদি, তার সঙ্গেই তো আপনার বিয়ে হচ্ছে। সুকান্ত চোখ কপালে তুলে বলল, ও!
রাত বারোটার পরে বাসরঘরে অন্য কেউ রইল না। সুকান্ত জিজ্ঞাসা করল, তুমি সুনন্দা, না নন্দা?
—দুইই। পোশাকী নাম সুনন্দা, আটপৌরে ডাকনাম নন্দা।
—চিঠিতে অত সব মিছে কথা লিখলে কেন?
—কোনও কুমতলব ছিল না। সত্যবাদী উদারচরিত ভাবী বরকে একটু বাজিয়ে দেখছিলুম সইবার শক্তি কতটা আছে।
—তোমার সেই পবননন্দন ভাদুড়ীর খবর কি?
—হাওয়া হয়ে উবে গেছে, তার অস্তিত্বই নেই। আমার কাছে একটি হনুমানজীর ভাল ছবি আছে, তোমার সেই সুরঙ্গীর ফোটোর সঙ্গে বাঁধিয়ে রাখলে বেশ হবে না?
—তুমি একটি ভীষণ বকাটে মেয়ে। সেইজন্যেই বি. এস—সি.—তে ফেল করেছ।
—ঝুনি মিত্তির আমার ডবল বকাটে, সে ফার্স্ট হল কি করে? আমি অঙ্কে কাঁচা, ম্যাক্সওয়েলের থিওরিটা মোটেই বুঝতে পারি না, আর ওইটেরই কোশ্চেন ছিল।
—কেন, ও তো খুব সোজা অঙ্ক। বুঝিয়ে দিচ্ছি শোন। ভি ইকোয়াল টু রুট ওভার ওআন বাই কাপ্পা মিউ—
—থাক থাক, বাসরঘরে অঙ্ক কষলে অকল্যাণ হয়।
—আচ্ছা কাল বুঝিয়ে দেব।
—কাল তো কালরাত্রি, বর—কনের দেখা হবার জো নেই। সেই পরশু ফুলশয্যায় দেখা হবে।
—বেশ তো, তখন বুঝিয়ে দেব।
—ফুলশয্যায় অঙ্ক কষলে মহাপাতক হয় তা জান? ঠাকুমার আবার আড়িপাতা রোগ আছে, যদি শুনতে পান যে নাতজামাই ফুলশয্যায় অঙ্ক কষছে তবে গোবর খাইয়ে প্রায়শ্চিত্ত করাবেন। তাড়া কিসের, আমি তো পালাচ্ছি না। বছর খানিক যাক, তারপর বুঝিয়ে দিও।
—আচ্ছা তাই হবে। এখন ঘুমনো যাক, কি বল। দেখ সুনন্দা, তুমি খাসা দেখতে।
—তাই নাকি? তোমার দৃষ্টি তো খুব তীক্ষ্ন।
—সুনন্দা, আমার কি ইচ্ছে হচ্ছে জান?
—আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে?
—ঠিক তা নয়। মনে হচ্ছে—
—মনে হ’ক গে, এখন ঘুমোও।
১৮৭৯ শক (১৯৫৭)
চিরঞ্জীব
পূজোর ছুটিতে দুই বন্ধু হরিহর বসু আর তারক গুপ্ত পশ্চিমে বেড়াতে যাচ্ছেন। দিল্লি মেল ছাড়বার দেড় ঘণ্টা আগে তাঁরা হাওড়া স্টেশনে এলেন এবং প্লাটফর্মে গাড়ি লাগতেই একটা সেকেণ্ড ক্লাস কামরায় উঠে পড়লেন। তাঁদের সীট আগে থেকেই রিজার্ভ করা ছিল।
হরিহরবাবু তাড়াতাড়ি তাঁর বিছানা পেতে গ্যাট হয়ে বসে বললেন, দেখ তারক, যে কদিন কলকাতার বাইরে থাকব সে কদিন বাঙালীর সঙ্গে মোটেই মিশব না। মেশবার দরকারও হবে না, কারণ দিল্লীতে আমরা লালা গজাননজীর বাড়িতে উঠছি। আগরাতে তাঁর গদি আছে, সেখানেও আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করেছেন। অতি ভাল লোক গজাননজী।
