—শুধু প্রণয়িনী নয় মশাই, দস্তুরমত সহধর্মিণী। তিন মাস হল দুজনে বিবাহবন্ধনে জড়িত হয়ে দম্পতি হয়ে গেছি।
–তবে মিস চমৎকুমারী বললেন কেন? এখন তো তিনি শ্রীমতী
-আঃ, আপনি কিছুই বোঝেন না। মিস চমৎকুমারী ঘাপার্দে হল তাঁর স্টেজ নেম, আমেরিকান ফিল্ম অ্যাকট্রেসরা যেমন পঞ্চাশবার বিয়ে করেও নিজের কুমারী নামটাই বজায় রাখে, সেইরকম আর কি। চমৎকুমারী হচ্ছেন গ্রেট মরাঠা সার্কসের লীডিং লেড়ি, বলবতী ললনা। যেমন রুপ, তেমনি বাহবল, তেমনি গলার জোর। একটা প্রমাণ সাইজ গর, কিংবা গাধাকে উপ করে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটতে পারেন। আবার ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে একটা হাত কানে চেপে অন্য হাতে তারা নিয়ে ধুপদ খেয়াল গাইতে পারেন। মহারাষ্ট্রী মহিলা, কিন্তু অনেক কাল কলকাতায় ছিলেন, চমৎকার বাঙলা বলেন। আপনার স্বামীর সঙ্গে তাঁর মোলাকাত করিয়ে দেব। চমৎকুমারীকে দেখলেই তিনি বুঝতে পারবেন যে আমার হদয় শক্ত খুটিতে বাঁধা আছে, তার আর নড়ন চড়ন নেই।
–আপনি আর দেরি করবেন না, দয়া করে মিস্টার দাসকে খবর দিন।
–কি কথাই বললেন! আমি চলে যাই, আপনি একলা পড়ে থাকুন, আর বাঘ কি হড়ার কি লক্কড় এসে আপনাকে ভক্ষণ করকে। শুনতে পাচ্ছেন? ওই শেয়াল ডাকছে। আপনার হিতাহিত জ্ঞান এখন লোপ পেয়েছে, কোনও আপত্তিই আমি শুনবো না। চুপ, আর কথাটি নয়।
নিমেষের মধ্যে মনোলোভাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গগন চাঁদ সবেগে চললেন। মনোলোভা ছটফট করতে লাগলেন। গগনচাঁদ বললেন, খবরদার হাত পা ছুড়বেন না, তা হলে পড়ে যাবেন, কোমর ভাঙবে, পাঁজরা ভাঙবে। এত আপত্তি কিসের? আমাকে কি অচ্ছুত হরিজন ভেবেছেন না সেকেলে বঠঠাকুর ঠাউরেছেন যে ছুঁলেই আপনার ধর্মনাশ হবে? মনে মনে ধ্যান করুন—আপনি একটা দুরন্ত খুকী, রাস্তায় খেলতে খেলতে আছাড় খেয়েছেন, আর আমি আপনার
স্নেহময়ী দিদিমা, কোলে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছি।
আপত্তি নিষ্ফল জেনে মনোলোভা চুপ করে আড়ষ্ট হয়ে রইলেন। গগনচাঁদ হাতের মুঠোয় টর্চ টিপে পথে আলো ফেলতে ফেলতে চললেন।
বক্রেশ্বর দাস দুজনকে দেখে আশ্চর্য হয়ে বললেন, একি ব্যাপার?
গগনচাঁদ বললেন, শোবার ঘর কোথায়? আগে আপনার স্ত্রীকে বিছানায় শুইয়ে দিই, তার পর সব বলছি। এই বুঝি আপনার চাকর? ওহে বাপ, শিগগির মালসা করে আগুন নিয়ে এস, তোমার মায়ের পায়ে সেক দিতে হবে।
মনোলোভাকে শুইয়ে গগনচাঁদ বললেন, মিস্টার দাস, আপনার স্ত্রী পড়ে গিয়েছিলেন, ডান পায়ের চেটো মচকে গেছে। চলবার শক্তি নেই, অথচ কিছুতেই আমার কথা শুনবেন না, কেবলই বলেন, লে আও পালকি, বোলাও দাস সাহেবকো। আমি জোর করে একে তুলে নিয়ে এসেছি। অতি অবুঝ বদরাগী মহিলা, সমস্ত পথটা আমাকে যাচ্ছেতাই গালাগাল দিতে দিতে এসেছেন।
মনোলোভ অস্ফুট স্বরে বললেন, বাঃ, কই আবার দিলুম!
বক্রেশ্বর একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। এখন গরম হয়ে বললেন, তুমি লোকটা কে হে? ভদ্রনারীর ওপর জলম কর এতদূর আস্পর্ধা?
-অবাক করলেন মশাই। কোথায় একটু চা খেতে বলবেন, অন্তত কিঞ্চিৎ থ্যাংকস দেবেন, তা নয়, শুধুই ধমক!
-হু আর ইউ? কেন তুমি ওঁর গায়ে হাত দিতে গেলে?
-আরে মশাই, ওঁকে যদি নিয়ে না আসতুম তা হলে যে এতক্ষণ বাঘের পেটে হজম হয়ে যেতেন, আপনাকে যে আবার একটা গিন্নীর যোগাড় দেখতে হত।
—চোপরও বদমাশ কোথাকার। জান, আমি হচ্ছি বক্রেশ্বর দাস আই.এ, এস, গণ্ডা কন্ট্রোল অফিসার, এখনি তোমাকে পুলিসে হ্যাণ্ড ওভার করতে পারি?
–তা করবেন বইকি। স্ত্রী যন্ত্রণায় ছটফট করছেন সেদিকে হুঁশ নেই, শুধু আমার ওপর তশি। মুখ সামলে কথা কইবেন মশাই, নইলে আমিও রেগে উঠব। এখন চললুম, নির্মল মুখুজ্যে ডাক্তারকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
বক্রেশ্বর তেড়ে এসে গগনচাঁদের পিঠে হাত দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে বললেন, অভি নিকালো।
গগনচাঁদ বেগে চলতে লাগলেন, বক্রেশ্বের পিছু পিছ গেলেন। কিছুদূর গিয়ে গগনচাঁদ বললেন, লড়তে চান? আপনার স্ত্রী একটু সুস্থ হয়ে উঠুন তার পর লড়বেন। যদি সবর করতে না পারেন তো কাল সকালে আসতে পারি।
বক্রেশ্বর বললেন, কাল কেন, এখনই তোকে শায়েস্তা করে দিচ্ছি। জানিস, আমি একজন মিডলওয়েট চ্যাম্পিয়ন? এই নে, দেখি কেমন সামলাতে পারিস।
গগনচাঁদ ক্ষিপ্রগতিতে সরে গিয়ে ঘুষি থেকে আত্মরক্ষা করলেন এবং বক্রেশ্বরের পায়ের গুলিতে ছোট একটি লাথি মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে বক্রেশ্বর ধরাশায়ী হলেন।
গগনচাঁদ বললেন, কি হল দাস মশাই, উঠতে পারছেন না? পা মচকে গেছে। বেশ যা হক, কাগিন্নীর এক হাল। ভাববেন না, আপনাকে তুলে নিয়ে গিন্নীর পাশে শুইয়ে দিচ্ছি, তার পর ডাক্তার এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।
বক্রেশ্বর বললেন, ড্যাম ইউ, গেট আউট ইহাঁ সে।
-ও, আমার কোলে উঠবেন না? আচ্ছা চললম, আর কাউকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
বক্রেশ্বর বেশ শক্তিমান পুরুষ, ভাবতেই পারেন নি যে ওই বদমাশ গুণ্ডাটা তাঁর প্রচণ্ড ঘুষি এড়িয়ে তাঁকেই কাবু করে দেবে। শুধু ডান পায়ের চেটো মচকায় নি, তাঁর কাঁধও একটু থেঁতলে গেছে। তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকতে লাগলেন, বৈকুণ্ঠ, ও বৈকুণ্ঠ।
প্রায় পনরো মিনিট বক্রেশ্বর অসহায় হয়ে পড়ে রইলেন। তার পর নারীকণ্ঠ কানে এল—অগ্গ বাঈ! হে কায়? কায় ঝালা তুমহালা?–ওমা, এ কি? কি হয়েছে আপনার?
বক্রেশ্বর দেখলেন, কাছা দেওয়া লাল শাড়ি পরা মহিষমর্দিনী তুল্য একটি বিরাট মহিলা টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বক্রেশ্বর বললেন, উঃ বড় লেগেছে, ওঠবার শক্তি নেই। আপনি-আপনি কে?
