হঠাৎ শকুলা লাফিয়ে উঠে বলল, ওরে পিসীমা রে!
ব্যাকুল হয়ে গৌতমী বললেন, কি হল রে?
বিশ্বামিত্র উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কর্দম মেখলা খসে গিয়ে মাটিতে পড়ে কিলবিল করতে লাগল।
প্রিয়ংবদা চিৎকার করে বলল, সাপ সাপ!
অনসূয়া বলল, ঢোঁড়া সাপ!
গৌতমী বললেন, জলডুণ্ডুভ। এই দেখ, সড়সড় করে নদীতে নেমে যাচ্ছে।
বিশ্বামিত্র বললেন সাপ নয়, মেনকার অভিশাপ, এতকাল পরে আমাকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। কন্যা, তোমার পবিত্র স্পর্শে আমি শাপমুক্ত পাপমুক্ত সন্তাপমুক্ত হয়েছি। আশীর্বাদ করি, রাজেন্দ্রের রাজ্ঞী হও, রাজচক্রবতী সম্রাটের জননী হও। দেবী গৌতমী, আমি যাচ্ছি, আপনাদের মঙ্গল হক, আমার আগমনের স্মৃতি আপনাদের মন থেকে লুপ্ত হয়ে যাক।
কামরূপিণী
শীতকাল, বিকাল বেলা। শিবপুর বটানিক্যাল গার্ডেনে একটি দল গঙ্গার কাছে মাঠের উপর শতরঞ্জি পেতে বসেছেন। দলে আছেন—
প্রবীণ অধ্যাপক নিকুঞ্জ ঘোষ, তাঁর স্ত্রী ঊর্মিলা, মেয়ে ইলা, বয়স পনরো।
নিকুঞ্জর শালা নবীন অধ্যাপক বীরেন দত্তর স্ত্রী সুরুচি, আর তার ছেলে নুটু, বয়স ছয়।
বৃদ্ধ শীতল চৌধুরী। বীরেন দত্তের সঙ্গে এঁর কি একটা দূর সম্পর্ক আছে। ছোট বড় নির্বিশেষে সকলেই এঁকে শীতুমামা বলে ডাকে।
বীরেন দত্তর আসতে একটু দেরি হবে। তাঁর নববিবাহিত বন্ধু মেজর সুকোমল গুপ্ত সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী আর শাশুড়ীর সঙ্গে আসাম থেকে কলকাতায় এসেছেন। বীরেন তাঁদের নিয়ে আসবে।
শীতল চৌধুরী বললেন, তোমাদের এ কি রকম পিকনিক? খাবার জিনিস কিছুই সঙ্গে আন নি, শুধু হাওয়া খেয়ে বাড়ি ফিরতে হবে নাকি?
সুরুচি বলল, ভয় নেই শীতুমামা। ওঁর সঙ্গে সবই এসে পড়বে, সস্ত্রীক সশাশুড়ীক মেজর সুকোমল গুপ্ত আর দেদার খাবার। গুপ্তর বউ আর শাশুড়ী নিজের হাতে সব খাবার তৈরী করে আনবেন। বউভাতের ভোজটা আমাদের পাওনা আছে, এখানেই খাওয়াবেন।
নুটু বলল, ও শীতুমামা, কাল যে গল্পটা বলছিলে তা তো শেষ হয় নি। খেতে অনেক দেরি হবে, ততক্ষণ গল্পটা বল না।
শীতুমামা বললেন, আচ্ছা বলছি শোন।—তার পর রাজা তো খুব সানাই ভেঁপু রামশিঙা ঢাক ঢোল জগঝম্প বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে সুয়োরানীকে বিয়ে করে রাজবাড়িতে নিয়ে এলেন। পঞ্চাশটা শাঁখ বেজে উঠল, রাজার মাসী পিসী মামীরা খুব জিব নেড়ে হুলুলুলু করলেন। বেচারী দুয়োরানী মনের দুঃখে তাঁর খোকাকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলেন। এখন, সেই সুয়োরানীটা ছিল রাক্কুসী। সাত দিন যেতে না যেতে রাজার কাছে খবর এল—হাতিশালায় হাতি মরছে, ঘোড়াশালায় ঘোড়া মরছে, শুধু তাদের হাড় দাঁত আর ন্যাজ পড়ে আছে।
নুটু বলল, সুয়োরানী ওসব চিবুতে পারে না বুঝি?
নুটুর মা সুরুচি ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর খোকা, ও ছাই গল্প শুনতে হবে না। শীতুমামা, আপনি এইসব বিদকুটে গল্প কেন বলেন? এতে ছোট ছেলেদের মনে একটা খারাপ ছাপ পড়ে।
নিকুঞ্জ ঘোষ হেসে বললেন, আরে না না। সব দেশেরই রূপকথায় একটু উৎকট ব্যাপার থাকে, তাতে ছোট ছেলেমেয়ের কোনও অনিষ্ট হয় না। তারা বেশ বোঝে যে সবই বানিয়ে বলা হচ্ছে। নয় রে নুটু?
নুটু বলল, হুঁ। আমিও গল্প বানাতে পারি।
সুরুচি বলল, যাই হ’ক, শীতুমামা, আপনি ওসব বেয়াড়া মিথ্যে গল্প বলবেন না।
শীতুমামা বললেন, বেশ, মা—লক্ষ্মীর যখন আপত্তি আছে তখন বলব না। নুটু তুই বরং তোর মায়ের কাছে রামায়ণের গল্প শুনিস, শূর্পনখা রাক্কুসীর কথা, খুব ভাল সত্যি গল্প। কিন্তু একটা কথা তোমাদের জানা দরকার। রূপকথার সবটাই মিথ্যে এমন বলা যায় না। যা ঘটে তাই কতক কতক রটে।
নিকুঞ্জ—পত্নী ঊর্মিলা বললেন, আচ্ছা, শীতুমামা, রাক্কুসী সুয়োরানী, পাতালপুরীর রাজকন্যা, সোনার কাঠি রুপোর কাঠি, কামরূপ—কামিখ্যের মায়াবিনী যারা ভেড়া বানিয়ে দেয়—এ সবে আপনি বিশ্বাস করেন?
—কিছু কিছু করি বইকি, বিশেষ করে ওই ভেড়া বানাবার কথা যা বললে।
নিকুঞ্জ—কন্যা ইলা বলল, ভেড়ার কথাটা খুলে বলুন না শীতুমামা।
—নাঃ থাক। নুটুর মায়ের যখন আপত্তি।
নিকুঞ্জ ঘোষ বললেন, লোকের কৌতূহলে খোঁচা দিয়ে চুপ করে থাকা ঠিক নয়, খোলসা করে বলে ফেলাই ভাল।
সুরুচি বলল, বেশ তো, শীতুমামা, ভেড়ার গল্পটা খোলসা করেই বলুন, কিন্তু বেশী বেয়াড়া কথাগুলো বাদ দেবেন।
শীতুমামা বললেন, নাঃ থাক গে। বরং একটু ভগবৎপ্রসঙ্গ হ’ক। ইলা ভাই, তুমি একটু রবীন্দ্রসংগীত গাও, সেই ‘মাথা নত করে দাও’ গানটি।
সুরুচি বলল, অত মান ভাল নয় শীতুমামা। আমি মাপ চাচ্ছি, আপনি ভেড়ার গল্প বলুন।
নুটু বলল, না, আগে সেই রাক্কুসী সুয়োরানীর গল্প হবে।
সুরুচি বলল, তুই থাম খোকা। রাক্কুসীর চাইতে ভেড়াওয়ালী ভাল। বলুন শীতুমামা।
শীতল চৌধুরী বলতে লাগলেন—
পঁচিশ বৎসর আগেকার কথা। বলভদ্র মর্দরাজকে তোমরা চিনবে না, তার বাপ রামভদ্র মর্দরাজ বালেশ্বর জেলার একজন বড় জমিদার ছিলেন, রাজা বললেই হয়। তাঁর এস্টেটে আমি তখন কাজ করতুম। বলভদ্রর বয়স ত্রিশের নীচে, সুপুরুষ, মেজাজ ভাল, শিকারের খুব শখ। একদিন সে আমাকে বলল, ও শীতলবাবু, কেবলই সেরেস্তার কাজ নিয়ে থাকলে তোমার মাথা বিগড়ে যাবে। বাবাকে বলে তোমার বিশ দিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়ে দিচ্ছি, আমার সঙ্গে কিমাপুর চল, উত্তর—পূর্ব আসামে, খাস জায়গা, দেদার শিকার। সেখানে আঠারো—শিঙা হরিণ পাওয়া যায়, আকারে খুব বড় নয়, কিন্তু শিঙ দুটো অতি অদ্ভুত, প্রত্যেকটার নটা ফেঁকড়া।
