তারপর ডেয়ারির কর্তারা আরও তিন—চার দিন গরু ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোনও ফল হল না। শেষকালে স্থির করলেন যে মগরাহাটের ওই মাঠটা লীজ নিয়ে ওখানেই ডেয়ারির জন্য গোশালা করবেন। ভেজাল দুধ দিয়ে কোনও রকমে খদ্দের ঠেকিয়ে রাখা হল, ওদিকে জমির মালিকের সঙ্গেও কথাবার্তা চলতে লাগল। তখন আর এক বিপদ উপস্থিত। শিবলালজী মুক্ত জীব, বেশী দিন সংসার মায়ায় বন্ধ হয়ে থাকতে পারবেন কেন? সাত দিন পরেই তাঁর গোষ্ঠ লীলার শখ মিটে গেল, রাত্রিযোগে তিনি একাকী কালীঘাটে প্রত্যাবর্তন করলেন।
—গরুগুলোর কি হল? কর্তারা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন তো?
—রাম বল, ফেরাবার জো কি? চারদিকের গাঁ থেকে চাষারা এসে সব গরু লুট করে নিয়ে গেল। দেখুন রামেশ্বরবাবু, এই শিবালালজীর মাহাত্ম্য দেশের লোক এখনও বুঝল না। আমি দুগ্ধ মন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলাম—মশায়, ওঁকে হরিণঘাটায় নিয়ে গিয়ে তোয়াজ করুন, আপনাদের গোবংশের অশেষ উন্নতি হবে। এমন পেডিগ্রি—সম্পন্ন মহাকুলীন ষাঁড় আর পাবেন কোথা? কিন্তু মন্ত্রীমশায় কিছুই করলেন না, তিনি শুধু সীতামাড়ি, হরিয়ানা, হিসাব, শর্ট হর্ন, জার্সি— এই সব বোঝেন। আচ্ছা, আজ এখন উঠতে চান? মধ্যে মধ্যে আসবেন দয়া করে, আপনার সঙ্গে আলাপ হওয়ায় বড় খুশী হলাম রামেশ্বরবাবু। নমস্কার!
১৩৬১ (১৯৫৪)
শিবামুখী চিমটে
ঝিণ্টুর মুখ থেকে থার্মোমিটার টেনে নিয়ে তার মা বললেন, নিরানব্বই পয়েণ্ট চার। আজ রাত্তিরে শুধু দুধবার্লি খাবি। ঘুরে বেড়াবি না, এই ঘরে থাকবি। আমাদের ফিরতে কতই আর দেরি হবে, এই ধর রাত বারোটা।
ঠোঁট ফুলিয়ে ঝিণ্টু বলল, বা রে, তোমরা সক্কলে মজা করে মাদ্রাজী ভোজ খাবে আর আমি একলাটি বাড়িতে পড়ে থাকব হুঁ—
—আরে রাম বল, ওকে কি ভোজ বলে। মাছ নেই, মাংস নেই, শুধু তেঁতুলের পোলাও, লংকার ঝোল, আর টক দই। যজ্ঞুস্বামী আয়ার ওঁর অফিসের বড় সাহেব, তাঁর মেয়ের বিয়ে, আর আয়ার— গিন্নীও অনেক করে বলেছে, তাই যাচ্ছি। তোর জন্যে এই মেকানো রইল, হাওড়া ব্রিজ তৈরি করিস। সুকুমার রায়ের তিন খানা বই রইল, ছবি দেখিস। কিন্তু বেশী পড়িস নি, মাথা ধরবে। তোর পিসীকে বলে যাচ্ছি রাত সাড়ে আটটায় দুধবার্লি দেবে। খেয়েই শুয়ে পড়বি। পিসী তোর কাছে শোবে।
—না, পিসীমাকে শুতে হবে না। তার ভীষণ নাক ডাকে, আমার ঘুম হবে না। আমি একলাই শোব।
—বেশ, তাই হবে।
ঝিণ্টুর বয়স দশ, লেখাপড়ায় মন্দ নয়, কিন্তু অত্যন্ত চঞ্চল আর দুরন্ত। তার মা বাবা আর ছোট বোন নিমন্ত্রণ খেতে গেল আর সে একলা বাড়িতে পড়ে রইল, এ অসহ্য। একটু জ্বর হয়েছে তো কি হয়েছে? সে এখনই দু মাইল দৌড়তে পারে, ব্যাডমিণ্টন খেলতে পারে, সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে তেতলার ছাতে উঠতে পারে। বাড়িতে গল্প করারও লোক নেই। পিসীমাটা যেন কি, দুপুর বেলা আপিসে যায় আর সকালে বিকেলে রাত্তিরে শুধু নভেল পড়ে। ঝিণ্টুর ক্লাসফ্রেণ্ড জিতুর পিসীমা কেমন চমৎকার বুড়ো মানুষ, কত রকম গল্প বলতে পারে। জিতু বলে, হ্যাঁরে ঝিণ্টু, তোর সরসী পিসী সেজেগুজে আপিস যায় কেন? মালা জপবে, বড়ি দেবে, নারকেলনাড়ু আমসত্ত্ব কুলের আচার বানাবে, তবে না পিসীমা!
মেকানো জোড়া দিয়ে ঝিণ্টু অনেক রকম ব্রিজ করল, আবার খুলে ফেলল। সাড়ে আটটার সময় সরসী পিসী তাকে দুধবার্লি খাইয়ে বলল, এইবার ঘুমিয়ে পড় ঝিণ্টু।
ঝিণ্টু বলল, সাড়ে আটটায় বুঝি লোকে ঘুমোয়? তুমি তো অনেক বই পড়, তা থেকে একটা গল্প বল না।
সরসী উত্তর দিল, ওসব গল্প তোর ভাল লাগবে না।
—খালি প্রেমের গল্প বুঝি?
—অতি জেঠা ছেলে তুই। বড়দের জন্যে লেখা গল্প ছোটদের ভাল লাগে নাকি? এই তো সেদিন তোর মা শেষের কবিতা পড়ছিল, তুই শুনে বললি, বিচ্ছিরি। আলো নিবিয়ে দিই, ঘুমিয়ে পড়।
সরসী পিসী চলে গেলে ঝিণ্টু শুয়ে পড়ল, কিন্তু কিছুতেই ঘুম এল না। এক ঘণ্টা এপাশ ওপাশ করে সে বিছানা থেকে তড়াক করে উঠে পড়ল। তার মাথায় খেয়াল এসেছে, একটা অ্যাডভেঞ্চার করতে হবে। ডিটেকটিভ, ডাকাত, বোম্বেটে, গুপ্ত ধন, এই সবের গল্প সে অনেক পড়েছে। আজ রাত্রে যদি সে গুপ্ত ধন আবিষ্কার করতে পারে তো কেমন মজা হয়! সে তার মায়ের কাছে শুনেছিল, তার এক বৃদ্ধপ্রজেঠামহ অর্থাৎ প্রপিতামহের জেঠা পিশাচসিদ্ধ তান্ত্রিক ছিলেন। অনেককাল হল তিনি মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর তোরঙ্গটি তেতলার ঘরে এখনও আছে। সেই তোরঙ্গ খুলে দেখলে কেমন হয়?
ঝিণ্টুর একটা টর্চ আছে, দেড় টাকা দামের একটা পিস্তলও আছে। পিস্তলটা কোমরে ঝুলিয়ে টর্চ নিয়ে সে তেতলায় উঠল। সেখানে সিঁড়ির পাশে একটি মাত্র ঘর, তাতে শুধু অদরকারী বাজে জিনিস থাকে। সেই ঘরে ঢুকে ঝিণ্টু সুইচ টিপে আলো জ্বালল। তার বৃদ্ধপ্রজেঠামহ করালীচরণ মুখুজ্যের তোরঙ্গটা এক কোণে রয়েছে। বেতের তৈরি, তার উপর মোষের চামড়া দিয়ে মোড়া, অদ্ভুত গড়ন, যেন একটা প্রকাণ্ড কচ্ছপ। যে তালা লাগানো আছে তাও অদ্ভুত। দেয়ালে এক গোছা পুরনো চাবি ঝুলছে। ঝিণ্টু একে একে সব চাবি দিয়ে তালা খোলবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। সে হতাশ হয়ে ফিরে যাবার উপক্রম করছে, হঠাৎ নজরে পড়ল, তোরঙ্গের পিছনের কবজা দুটো মরচে পড়ে খয়ে গেছে। একটু টানাটানি করতেই খসে গেল। ঝিণ্টু তখন তোরঙ্গের ডালা পিছন থেকে উলটে খুলে ফেলল।
