উদয় বলল—’আমি সেবার যখন সিমলেয় যাই—’
নগেন। মিছে কথা বলিস নি উদো। তোর দৌড় আমার জানা আছে, লিলুয়া অবধি।
উদয়। বাঃ! আমার দাদাশ্বশুর যে সিমলেয় থাকতেন। বউ তো সেখানেই বড় হয়। তাইতো রং অত—
নগেন। খবরদার উদো।
চাটুজ্যে। যা বলছিলুম শোন। আমাদের মজিলপুরের চরণ ঘোষের এক ছাগল ছিল, তার নাম ভুটে। ব্যাটা খেয়ে খেয়ে হ’ল ইয়া লাশ, ইয়া সিং, ইয়া দাড়ি। একদিন চরণের বাড়িতে ভোজ—লুচি, পাঁঠার কালিয়া, এইসব। আঁচাবার সময় দেখি, ভুটে পাঁঠার মাংস খাচ্ছে। বললুম—দেখছ কি চরণ, এখুনি ছাগলটাকে বিদেয় কর—কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে ঘর কর, প্রাণে ভয় নেই? চরণ শুনলে না। গরিবের কথা বাসী হ’লে ফলে। তার পরদিন থেকে ভুটে নিরুদ্দেশ। খোঁজ—খোঁজ কোথা গেল। এক বচ্ছর পরে মশায় সেই ছাগল সোঁদরবনে পাওয়া গেল। শিং নেই বললেই হয়, দাড়ি প্রায় খসে গেছে, মুখ একেবারে হাঁড়ি, বর্ণ হয়েছে যেন কাঁচা হলুদ, আর তার ওপর দেখা দিয়েছে মশায়—আঁজি—আঁজি ডোরা—ডোরা। ডাকা হ’ল—ভুটে, ভুটে! ভুটে বললে—হালুম। লোকজন দূর থেকে নমস্কার করে ফিরে এল।
‘লাটুবাবু আয়ে হেঁ।’
সপারিষদ লাটুবাবু প্রবেশ করিলেন। লম্বকর্ণও সঙ্গে আছে। বিনোদ বলিলেন—’কি ব্যাণ্ড মাস্টার, আবার কি মনে করে?’
লাটুবাবুর আর সে লাবণ্য নাই। চুল উশক খুশক চোখ বসিয়া গিয়াছে, জামা ছিঁড়িয়া গিয়াছে। সজলনয়নে হাঁউমাউ করিয়া বলিলেন—’সর্বনাশ হয়েছে মশায়, ধনে—প্রাণে মেরেছে। ও হোঃ হোঃ হোঃ।’
নরহরি বলিলেন— ‘আঃ কি কর লাটুবাবু একটু স্থির হও। হুজুর যখন রয়েছেন তখন একটা বিহিত করবেনই।’
বংশলোচন ভীত হইয়া বলিলেন—’কি হয়েছে—ব্যাপার কি?’
লাটু। মশাই, ওই পাঁঠাটা—
চাটুজ্যে বলিলেন—’হুঁ, বলেছিলুম কি না?’
লাটু। ঢোলের চামড়া কেটেছে, ব্যায়লার তাঁত খেয়েছে, হারমোনিয়ার চাবি সমস্ত চিবিয়েছে। আর—আর—আমার পাঞ্জাবির পকেট কেটে লব্বই টাকার লোট—ও হো হো!
নরহরি। গিলে ফেলেছে। পাঁঠা নয় হুজুর, সাক্ষাৎ শয়তান। সর্বস্ব গেছে, লাটুর প্রাণটি কেবল আপনার ভরসায় এখনও ধুক—পুক করছে।
বংশলোচন। ফ্যাসাদে ফেললে দেখছি।
নরহরি। দোহাই হুজুর, লাটুর দশাটা একবার দেখুন, একটা ব্যবস্থা ক’রে দিন—বেচারা মারা যায়।
বংশলোচন ভাবিয়া বলিলেন—’একটা জোলাপ দিলে হয় না?’
লাটুবাবু উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলিলেন—’মশায়, এই কি আপনার বিবেচনা হ’ল? মরছি টাকার শোকে, আর আপনি বলছেন জোলাপ খেতে?’
বংশলোচন। আরে তুমি খাবে কেন, ছাগলটাকে দিতে বলছি।
নরহরি। হায় হায়, হুজুর এখনও ছাগল চিনলেন না! কোন কালে হজম ক’রে ফেলেছে। লোট তো লোট—ব্যায়লার তাঁত, ঢোলের চামড়া, হারমোনিয়ার চাবি, মায় ইস্টিলের কত্তাল।
বিনোদ। লাটুবাবুর মাথাটি কেবল আস্ত রেখেছে।
বংশলোচন বলিলেন—’যা হবার তা তো হয়েছে। এখন বিনোদ, তুমি একটা খেসারত ঠিক করে দাও। বেচারার লোকসান যাতে না হয়, আমার ওপর বেশী জুলুমও না হয়। ছাগলটা বাড়িতেই থাকুক, কাল যা হয় করা যাবে।’
অনেক দরদস্তুরের পর একশ টাকায় রফা হইল। বংশলোচন বেশী কষাকষি করিতে দিলেন না। লাটুবাবুর দল টাকা লইয়া চলিয়া গেল।
লম্বকর্ণ ফিরিয়াছে শুনিয়া টেঁপী ছুটিয়া আসিল। বিনোদ বলিলেন—’ও টেঁপুরানী শীগগির গিয়ে তোমার মাকে বলো কাল আমরা এখানে খাব—লুচি, পোলাও, মাংস—’
টেঁপী। বাবা আর মাংস খায় না।
বিনোদ। বল কি! হ্যাঁ হে বংশু, প্রেমটা এক পাঁঠা থেকে বিশ্ব পাঁঠায় পৌঁছেছে না কি? আচ্ছা, তুমি না খাও আমরা আছি। যাও তো টেঁপু, মাকে বল সব যোগাড় করতে।
টেঁপী। সে এখন হচ্ছে না। মা—বাবার ঝগড়া চলছে, কথাটি নেই।
বংশলোচন ধমক দিয়া বলিলেন—’হ্যাঁ হ্যাঁ—কথাটি নেই—তুই সব জানিস। যাঃ যাঃ, ভারি জ্যাঠা হয়েছিস।’
টেঁপী। বা—রে, আমি বুঝি টের পাই না? তবে কেন মা খালি—খালি আমাকে বলে— টেঁপী, পাখাটা মেরামত করতে হবে— টেঁপী, এ মাসে আরও দু—শ টাকা চাই। তোমাকে বলে না কেন?
বংশলোচন। থাম থাম বকিস নি।
বিনোদ। হে রায়বাহাদুর, কন্যাকে বেশী ঘাঁটিও না। অনেক কথা ফাঁস করে দেবে। অবস্থাটা সঙ্গিন হয়েছে বল?
বংশলোচন। আরে এতদিন তো সব মিটে যেত, ওই ছাগলটাই মুশকিল বাধালে।
বিনোদ। ব্যাটা ঘরভেদী বিভীষণ। তোমারই বা অত মায়া কেন? খেতে না পার বিদেয় করে দাও। জলে বাস কর, কুমিরের সঙ্গে বিবাদ ক’রো না।
বংশলোচন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন— ‘দেখি কাল যা হয় করা যাবে।’
এ রাত্রিও বংশলোচন বৈঠকখানায় বিরহশয়নে যাপন করিলেন। ছাগলটা আস্তাবলে বাঁধা ছিল, উপদ্রব করিবার সুবিধা পায় নাই।
পরদিন বৈকাল সাড়ে পাঁচটার সময় বংশলোচন বেড়াইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া একবার এদিক—ওদিক চাহিয়া দেখিলেন, কেহ তাঁকে লক্ষ্য করিতেছে কি না। গৃহিণী ও ছেলেমেয়েরা উপরে আছে। ঝি—চাকর অন্দরে কাজকর্মে ব্যস্ত। চুকন্দর সিং তার ঘরে বসিয়া আটা সানিতেছে। লম্বকর্ণ আস্তাবলের কাছে বাঁধা আছে এবং দড়ির সীমার মধ্যে যথাসম্ভব লম্ফ—ঝম্ফ করিতেছে। বংশলোচন দড়ি হাতে করিয়া ছাগল লইয়া আস্তে আস্তে বাহির হইলেন।
পাছে পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা হয় সেজন্য বংশলোচন সোজা রাস্তায় না গিয়া গলি—ঘুঁজির ভিতর দিয়া চলিলেন। পথে এক ঠোঙা জিলিপি কিনিয়া পকেটে রাখিলেন। ক্রমে লোকালয় হইতে দূরে আসিয়া জনশূন্য খাল—ধারে পৌঁছিলেন।
