নগেন ভ্রূকুটি করিয়া বলিল—’উদো, আবার?’
বংশলোচন বিরক্ত হইয়া বলিলেন—’তোমাদের কি জন্তু দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে? একটা নিরীহ অনাথ প্রাণী আশ্রয় নিয়েছে, তা কেবল কালিয়া আর কাবাব!’
ছাগলের সংবাদ শুনিয়া বংশলোচনের সপ্তমবর্ষীয়া কন্যা টেঁপী এবং সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ঘেণ্টু ছুটিয়া আসিল। ঘেণ্টু বলিল—’ ও বাবা, আমি পাঁঠা খাব। পাঁঠার ম—ম—ম—’
বংশলোচন বলিলেন—যাঃ যাঃ, শুনে শুনে কেবল খাই খাই শিখছেন।’
ঘেণ্টু হাত—পা ছুড়িয়া বলিল— ‘ হ্যাঁ আমি ম—ম—ম—মেটুলি খাব।’
টেঁপী বলিল— ‘বাবা, আমি পাঁঠাকে পুষবো, একটু লাল ফিতে দাও না।’
বংশলোচন। বেশ তো একটু খাওয়া—দাওয়া করুক, তারপর নিয়ে খেলা করিস এখন।
টেঁপী। পাঁঠার নাম কি বল না?
বিনোদ বলিলেন— ‘নামের ভাবনা কি। ভাসরুক, দধিমুখ, মসীপুচ্ছ, লম্বকর্ণ—’
চাটুজ্যে বলিলেন—’লম্বকর্ণই ভাল।’
বংশলোচন কন্যাকে একটু অন্তরালে লইয়া গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—’টেঁপু তোর মা এখন কি করছে রে?’
টেঁপী। এক্ষুনি তো কল—ঘরে গেছে।
বংশলোচন। ঠিক জানিস? তা হ’লে এখন এক ঘণ্টা নিশ্চিন্দি। দেখ, ঝিকে বল, চট করে ঘোড়ার ভেজানো—ছোলা চাট্টি এনে এই বাইরের বারান্দায় যেন ছাগলটাকে খেতে দেয়। আর দেখ, বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাস নি যেন।
উৎসাহের আতিশয্যে টেঁপী পিতার আদেশ ভুলিয়া গেল। ছাগলের গলায় লাল ফিতা বাঁধিয়া টানিতে টানিতে অন্দরমহলে লইয়া গিয়া বলিল—’ও মা, শীগগির এস, লম্বকর্ণ দেখবে এস।’
মানিনী মুখ মুছিতে মুছিতে স্নানের ঘর হইতে বাহির হইয়া বলিলেন—’আ মর ওটাকে কে আনলে? দূর দূর—ও ঝি, ও বাতাসী, শীগগির ছাগলটাকে বার করে দে, ঝাঁটা মার।’
টেঁপী বলিল—’বা রে, ওকে তো বাবা এনেছে, আমি পুষব।’
ঘেন্টু বলিল—’ ঘোড়া ঘোড়া খেলব।’
মানিনী বলিলেন—’খেলা বার ক’রে দিচ্ছি। ভদ্দর লোকে আবার ছাগল পোষে। বেরো বেরো—ও দরওয়ান, ও চুকন্দর সিং—’
‘হুজৌর’ বলিয়া হাঁক দিয়া চুকন্দর সিং হাজির হইল! শীর্ণ, খর্বাকৃতি বৃদ্ধ, গালপাট্টা দাঁড়ি, পাকানো গোঁফ, জাঁকালো গলা এবং ততোধিক জাঁকালো নাম—ইহারই জোরে সে চোট্টা এবং ডাকুর আক্রমণ হইতে দেউড়ি রক্ষা করে।
অন্দরের মধ্যে হট্টগোল শুনিয়া রায়বাহাদুর বুঝিলেন যুদ্ধ অনিবার্য। মনে মনে তাল ঠুকিয়া বাড়ির ভিতরে আসিলেন। গৃহিণী তাঁহার প্রতি দৃকপাত না করিয়া দারোয়ানকে বলিলেন—’ছাগলটাকে আভি নিকাল দেও, একদম ফটকের বাইরে। নেই তো এক্ষুনি ছিষ্টি নোংরা করেগা।’
চুকন্দর বলিল—’বহুত আচ্ছা।’
বংশলোচন পালটা হুকুম দিলেন—’দেখো চুকন্দর সিং। এই বকরি গেটের বাইরে যাগা তো তোমরা নোকরি ভি যাগা।’
চকুন্দর বলিল—’বহুত আচ্ছা।’
মানিনী স্বামীর প্রতি একটি অগ্নিময় নয়নবাণ হানিয়া বলিলেন—’হ্যাঁলা টেঁপী হতচ্ছাড়ী, রাত্তির হয়ে গেল—গিলতে হবে না? থাকিস তুই ছাগল নিয়ে, কাল যাচ্ছি আমি হাটখোলায়।’ হাটখোলায় গৃহিণীর পিত্রালয়।
বংশলোচন বলিলেন—’টেঁপু, ঝিকে ব’লে দে, বৈঠকখানা—ঘরে আমার শোবার বিছানা করে দেবে। আমি সিঁড়ি ভাঙতে পারি না। আর দেখ ঠাকুরকে বল আমি মাংস খাব না। শুধু খানকতক কচুরি একটু ডাল আর পটলভাজা।’
পুরাকালে বড়লোকদের বাড়িতে একটি করিয়া গোসাঘর থাকিত। ক্রুদ্ধা আর্যনারীগণ সেখানে আশ্রয় লইতেন। কিন্তু আর্যপুত্রদের জন্য সে—রকম কোনও পাকা বন্দোবস্ত ছিল না। অগত্যা তাঁহারা এক পত্নীর সহিত মতান্তর হইলে অপর এক পত্নীর দ্বারস্থ হইতেন। আজকাল খরচপত্র বাড়িয়া যাওয়ায় এই সকল সুন্দর প্রাচীন প্রথা লোপ পাইয়াছে। এখন মেয়েদের ব্যবস্থা শুইবার ঘরের মেঝের উপর মাদুর অথবা তেমন তেমন হইলে বাপের বাড়ি। আর ভদ্রলোকদের একমাত্র আশ্রয় বৈঠকখানা।
আহারান্তে বংশলোচন বৈঠকখানা—ঘরে একাকী শয়ন করিলেন। অন্ধকারে তাঁর ঘুম হয় না, এজন্য ঘরের এক কোণে পিলসুজের উপর একটা রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বলিতেছে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করিয়া বংশলোচন উঠিয়া ইলেকট্রিক লাইট জ্বালিলেন এবং একখানি গীতা লইয়া পড়িতে বসিলেন। এই গীতাটি তার দুঃসময়ের সম্বল, পত্নীর সহিত অসহযোগ হইলে তিনি এটি লইয়া নাড়াচাড়া করেন এবং সংসারের অনিত্যতা উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করেন। কর্মযোগ পড়িতে পড়িতে বংশলোচন ভাবিতে লাগিলেন—তিনি কী এমন অন্যায় কাজ করিয়াছেন যার জন্য মানিনী এরূপ ব্যবহার করেন? বাপের বাড়ি যাবেন—ইস, ভারী তেজ! তিনি ফিরাইয়া আনিবার নামটি করিবেন না, যখন গরজ হইবে আপনিই ফিরিবে। গৃহিণী শখ করিয়া যে—সব জঞ্জাল ঘরে পোরেন তা তো বংশলোচন নীরবে বরদাস্ত করেন। এই তো সেদিন পনেরোটা জলচৌকি তেইশটা বঁটি এবং আড়াই শ টাকার খাগড়াই বাসন কেনা হইয়াছে, আর দোষ হইল কেবল ছাগলের বেলা? হুঃ! যতো সব—। বংশলোচন গীতাখানি সরাইয়া রাখিয়া আলোর সুইচ বন্ধ করিলেন এবং ক্ষণকাল পরে নাসিকাধ্বনি করিতে লাগিলেন।
লম্বকর্ণ বারান্দায় শুইয়া রোমন্থন করিতেছিল। দুইটা বর্মা চুরুট খাইয়া তাহার ঘুম চটিয়া গিয়াছে। রাত্রি একটা আন্দাজ জোরে হাওয়া উঠিল। ঠাণ্ডা লাগায় সে বিরক্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল। বৈঠকখানা—ঘর হইতে মিটমিটে আলো দেখা যাইতেছে। লম্বকর্ণ তাহার বন্ধন রজ্জু চিবাইয়া কাটিয়া ফেলিল এবং দরজা খোলা পাইয়া নিঃশব্দে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিল।
