মুচুকুন্দ রায়ের বাড়ি থেকে পঞ্চানন চৌধুরীর বাড়ি বেশী দূরে নয়। কৃপারাম সেখানে উপস্থিত হলেন। পঞ্চানন বললেন, নমস্কার শেঠজী, অসময়ে কি মনে করে? খবর সব ভাল তো?
কৃপারাম বললেন, ভাল আর কোথা পঞ্চু ভাই, ঘিএর কনট্রাক্ট তো বিলকুল মুচুবাবু পেয়ে গেলেন। আমার আশা ছিল যে কম—সে—কম চার লাখ মুনাফা হবে, আমার তিন লাখ তোমার এক লাখ থাকবে, তা হল না। এখন শুন পঞ্চুবাবু, তোমাকে একটি কাম করতে হবে। একটি উল্লু—তোমরা যাকে বল পেঁচা—আমার কোঠি থেকে পালিয়ে মুচুকুন্দবাবুর কোঠিতে গেছে। তিনি ফিরত দিতে চাচ্ছেন না। ছিনিয়ে আনতে হবে।
পঞ্চানন বললেন, পেঁচার আপনার কি দরকার?
—বহুত ভাল পেঁচা, আমার ঘরবালীর খুব পেয়ারের পেঁচা। তাঁর এক বঙ্গালিন সহেলী আছেন, তিনি বলেছেন পেঁচাটি হচ্ছে লছমী মায়ের সওয়ারি অসলী লক্ষ্মী পেঁচা। এই পেঁচার আশীর্বাদেই তো পরসাল আমাদের কনট্রাক্ট মিলেছিল। আবার যেমনি সে মুচকুন্দবাবুর কাছে গেল অমনি তিনি ঘিএর অর্ডার পেয়ে গেলেন।
—বটে! তা হলে তো পেঁচাটিকে উদ্ধার করতেই হবে। আপনি মুচুকুন্দর নামে নালিশ ঠুকে দিন।
—নালিশে কিছু হবে না, পেঁচা তো পিঁজরায় ছিল না, আমার কোঠির হাথায় আমগাছে থাকত। তুমি দুসরা মতলব কর, যেমন করে পার পেঁচাকে আমার কাছে পৌঁছে দাও, খরচ যা লাগে আমি দিব।
পঞ্চানন একটু ভেবে বললেন, শক্ত কাজ, সময় লাগবে, হাজার দু—হাজার খরচও পড়তে পারে।
—খরচের জন্য ভেবো না, পেঁচা আমার চাই। কিন্তু দেরি করবে না, আবার তো এক মাসের মধ্যেই একটি বড় টেণ্ডার দিতে হবে।
পঞ্চানন বললেন, আচ্ছা, আপনি ভাববেন না, যত শীঘ্র পারি পেঁচাটিকে আমি উদ্ধার করব।
মুচুকুন্দর বড় ছেলে লখা ছেলেবেলায় পঞ্চুকাকার খুব অনুগত ছিল, এখনও তাঁকে একটু খাতির করে। পঞ্চানন তার গতিবিধির খবর রাখেন, রাত নটায় যখন সে খাওয়ার পর বাড়ি থেকে চুপি চুপি বেরুচ্ছে তখন তাকে ধরলেন। লখাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে বললেন, বাবা লখু, তোমাকে একটি কাজ করতে হবে, তার জন্যে অনেক টাকা পাবে। এই নাও আগাম পঞ্চাশ টাকা এখনই দিচ্ছি, কাজ হাসিল হলে আরও দেব।
টাকা পকেটে পুরে লখা বললে, কি কাজ পঞ্চুকাকা?
পঞ্চানন লখার কাঁধে একটি আঙুল ঠেকিয়ে চোখ টিপে কণ্ঠস্বর নীচু করে বললেন, খুব লুকিয়ে কাজটি উদ্ধার করতে হবে বাবা, কেউ যেন টের না পায়।
—বাবার লোহার আলমারি ভাঙতে হবে?
—আরে না না। অমন অন্যায় কাজ আমি করতে বলব কেন। তোমাদের বাড়িতে একটা পেঁচা আছে না? সেটা আমার চাই; চুপি চুপি ধরে আনতে হবে যেন না চেঁচায়, তাহলে সবাই জেনে ফেলবে।
লখা বললে, মা বলে ওটা লক্ষ্মী পেঁচা, খুব পয়মন্ত। যদি অন্য পেঁচা ধরে এনে দিই তাতে চলবে না?
—উঁহু, ওই পেঁচাটিই দরকার। আমার গুরুদেব অঘোরী বাবা চেয়েছেন, কি এক তান্ত্রিক সাধনা করবেন। যে—সে পেঁচায় চলবে না, তোমাদের বাড়ির পেঁচাটিরই শাস্ত্রোক্ত সব লক্ষণ আছে। পারবে না লখু?
কিছুক্ষণ ভেবে লখা বললে, তা আমি পারব, কিন্তু দিন দশ—বার দেরি হবে, পেঁচাটাকে আগে বশ করতে হবে। এখন তো ব্যাটা আমাকে দেখলেই ঠোকরাতে আসে। কত টাকা দেবেন?
—পঞ্চাশ দিয়েছি, পেঁচা আনলে আরও পঞ্চাশ দেব।
—তাতে কিছুই হবে না, অন্তত আরও পাঁচ—শ চাই। তা ছাড়া কোকেনের জন্য শ—খানিক। দারোয়ানটাকেও ঘুষ দিতে হবে, নইলে বাবাকে বলে দেবে।
—কোকেন কি হবে, তুমি খাও নাকি?
—রাম বল, ভদ্রলোকে কোকেন খায় না। আমার জন্য নয়, ওই পেঁচাটাকে কোকেন ধরিয়ে বশ করতে হবে, তবে তাকে আনতে পারব।
অনেক দর কষাকষির পর রফা হল যে পেঁচা পঞ্চাননের হস্তগত হলে লখা আরও আড়াই শ টাকা পাবে।
কৃপারাম নিজে এসে বা টেলিফোন করে রোজ খবর নিতে লাগলেন পেঁচা এল কিনা। পঞ্চানন তাঁকে বললেন, অত ব্যস্ত হবেন না, জানাজানি হয়ে যাবে। এলেই আপনাকে খবর দেব, আপনি নিজে এসে নিয়ে যাবেন।
দশ দিন পরে রাত এগারোটায় সময় লখা একটা রিকশয় চড়ে পঞ্চাননের বাড়িতে এল। তার সঙ্গে একটি ঝুড়ি, কাপড় দিয়ে মোড়া। পঞ্চানন অত্যন্ত খুশী হয়ে মালসমেত লখাকে নিজের অফিস—ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজায় খিল দিলেন। কাপড় সরিয়ে নিলে দেখা গেল পেঁচা বুঁদ হয়ে চুপ করে বসে আছে।
লখা বললে, শুনুন পঞ্চুকাকা, এটাকে দিনের বেলায় ঘরে বন্ধ করে রাখবেন, কিন্তু রাত্রে ছেড়ে দেবেন, ও ইঁদুর পাখির ছানা এইসব ধরে খাবে, নইলে বাঁচবে না। আর এই শিশিটা রাখুন, এতে পাঁচ শ ভাগ চিনির সঙ্গে এক ভাগ কোকেন মিশানো আছে। রোজ বিকেলে চারটের সময় পেঁচাকে অল্প এক চিমটি খেতে দেবেন। একটা ছোট রেকাবিতে রেখে নিজের হাতে ওর সামনে ধরবেন, তা হলেই খুঁটে খুঁটে খাবে। যেখানেই থাকুক রোজ মৌতাতের সময় ঠিক আপনার কাছে হাজির হবে।
পঞ্চানন মুগ্ধ হয়ে বললেন, উঃ লখু, তোমার কি বুদ্ধি বাবা! কোকেন ধরালে পেঁচা আর কারও বাড়ি যাবে না, কি বল?
লখা বললে, যাবার সাধ্য কি, ও চিরকাল আপনার গোলাম হয়ে থাকবে।
বার দিন হয়ে গেল তবু পেঁচার কোনও খবর আসছে না দেখে কৃপারাম উদ্বিগ্ন হয়ে পঞ্চাননের বাড়ি এলেন। পঞ্চানন জানালেন, অনেক হাঙ্গামা আর খরচ করে তিনি পেঁচাটিকে হস্তগত করতে পেরেছেন।
কৃপারাম উৎফুল্ল হয়ে বললেন, বাহবা পঞ্চু ভাই! এনে দাও, এনে দাও, আমি এখনই মোটরে করে নিয়ে যাব। খরচ কত পড়েছে বল, আমি চেক লিখে দিচ্ছি।
