গোপীরাম বলল, বহুত দিয়েছি হুজুর, কিন্তু দিদি দিলে মচ্ছাড় ভাগে না। আপনি যদি হুকুম করেন তবে আমার গাঁও থেকে চারঠো বগুলা মাঙাতে পারি।
—বগুলা কি জিনিস?
—বগ—পাখি হুজুর। গোহালে রাখলে মখখি মচ্ছড় পতিংগা মকড়া সব টপাটপ খেয়ে ফেলবে, ভঁইসী আর তার বচ্ছা বহুত আরাম সে নিদ যাবে।
—বগ থাকবে কেন, পালিয়ে যাবে।
—না হুজুর, ওদের পংখ একটু ছেঁটে দিব, উড়তে পারবে না। পনদ্র দিন বাদ গাঁও সে আমার এক চাচা আসবে, বলেন তো বগুলা আনতে লিখে দিব, চার বগুলায় বিশ টাকা অন্দাজ খর্চ পড়বে।
—বেশ, আজই লিখে দে।
গোপীরামকে আরও কিছু উপদেশ দিয়ে হংসেশ্বর তাঁর অফিসঘরে বংশীধরকে নিয়ে গেলেন। প্রশ্ন করলেন, তারপর বংশী, ব্যাপারটা কি হে।
মাথা নীচু করে হাত কচলাতে কচলাতে বংশীধর বলল, কাকাবাবু, অনেক দিনের একটা দুরাশা আছে, তাই আপনার সম্মতি ভিক্ষা করতে এসেছি।
হংসেশ্বর বললেন, অ। চকোরীকে বিয়ে করতে চাও এই তো?
বংশীধর সভয়ে বলল, আজ্ঞে হাঁ।
হংসেশ্বর বললেন, শোন বংশী, আমি স্পষ্ট কথার মানুষ। পাত্র হিসেবে তুমি ভালই, দেখতে চকোরীর চাইতে ঢের বেশী সুশ্রী, বিদ্যাও আছে, যতদূর জানি চরিত্রও ভাল। কিন্তু তোমার আর্থিক অবস্থা তো সুবিধের নয়। কলকাতায় একটা সেকেলে পৈতৃক বাড়ি আছে বটে, কিন্তু সেখানে তোমার মা দিদিমা ভাই বোন ভাগনেরা গিশগিশ করছে ; সেই ভিড়ের মধ্যে চকোরী এক মিনিটও টিকতে পারবে না। তার পর তোমার আয়। মাইনে কত পাও হে? দু শ? পরে আড়াই শ হবে? খেপেছ, ওই টাকায় চকোরীকে পুষতে চাও? তার সাবান ক্রীম পাউডার পেণ্ট লিপস্টিক সেণ্ট এই সব খরচই তো মাসে আড়াই শ—র ওপর। তুমি হয়তো ভেবেছ মেয়ে—জামাই—এর ভরণপোষণের জন্যে আমি মাসে মাসে মোটা টাকা দেব। সেটি হবে না বাপু।
বংশীধর বলল, আমি গরিব হলেই ক্ষতি কি কাকাবাবু? চকোরী আপনার একমাত্র সন্তান, সে যাতে সুখে থাকে তার জন্যে আপনি অর্থসাহায্য করবেন এ তো স্বাভাবিক। আপনার অবর্তমানে ওই তো সব পাবে।
—অবর্তমান হতে ঢের দেরি হে, আমি এখনও চল্লিশ বছর বাঁচব, তার আগে এক পয়সাও হাতছাড়া করব না। মেয়ে যদ্দিন আইবুড়ো তদ্দিন আমার খরচে নবাবি করুক আপত্তি নেই, কিন্তু বিয়ের পর সমস্ত ভার তার স্বামীকে নিতে হবে। আর যদিই বা তোমাদের খরচ আমি যোগাই তাতে আমার মাথা হেঁট হবে না? বাপের মাইনের গোলাম স্বামীর ওপর কোনও মেয়ের শ্রদ্ধা থাকে না। আমিই বা চ্যারিটি—বয় জামাই করতে যাব কেন?
বংশীধর কাতর স্বরে বলল, তবে কি আমার কোনও আশা নেই?
—আশা থাকতে পারে। তুমি উঠে পড়ে লেগে যাও যাতে তোমার রোজগার বাড়ে। তোমার মাসিক আয় আড়াই হাজার হলেই আমার আর আপত্তি থাকবে না।
—অত টাকা আয়ের তো কোনও আশা দেখছি না। আর, চকোরী কি ততদিন সবুর করবে?
—সবুর করবে কিনা আমি কি করে বলব। তুমিই তার সঙ্গে বোঝাপড়া করতে পার। হাঁ, আর একটা কথা তোমার জেনে রাখা দরকার। চকোরীকে ভাঁওতা দিয়ে রাজী করিয়ে যদি আমার অমতে তাকে বিয়ে কর তবে আমার সমস্ত সম্পত্তি হরিণঘাটায় দান করব, গো—মহিষ—ছাগাদি পশু আর হংস—কুক্কুটাদি পক্ষীর উৎকর্ষকল্পে। আর, চকোরী আমার সম্পত্তি পেলেই বা তোমার কি সুবিধে হবে? সে অতি ঝানু মেয়ে, কাকেও বিশ্বাস করে না, ব্যাঙ্কের চেকবুক তোমাকে দেবে না, বিষয় যা পাবে তাতেও তোমাকে হাত দিতে দেবে না। বড় জোর তোমার সিরারেটের খরচ যোগাবে আর জন্মদিনে কিছু উপহার দেবে, এক সুট ভাল পোশাক, কি রিস্টওয়াচ, কিংবা একটা শার্পার—নাইণ্টি কলম। চকোরীকে বিয়ে করার মতলব ছেড়ে দেওয়াই তোমার পক্ষে ভাল।
বংশীধর বিষণ্ণ মনে চলে গেল। বিকাল বেলা তার কাছে সব কথা শুনে চকোরী বলল, বাবা যে ওই রকম বলবেন তা আমি আগে থাকতেই জানি।
বংশীধর বলল, চকোরী তোমার বাবার সম্পত্তি তাঁরই থাকুক, আমার তাতে লোভ নেই। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালবাস তবে ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে না? প্রেমের জন্যে নারী কি না ছাড়তে পারে? যদি ভালবাসা থাকে তবে আমার সেকেলে ছোট বাড়িতে আর সামান্য আয়েই তুমি সুখী হতে পারবে।
চকোরী হেসে বলল, শোন বংশী। প্রেম খুব উঁচুদরের জিনিস, আর তোমার ওপর আমার তা নেহাত কম নেই। কিন্তু টাকাহীন প্রেম আর চাকাহীন গাড়ি দুইই অচল, কষ্টের সংসারে ভালবাসা শুকিয়ে যায়। ‘ধনকে নিয়ে বনকে যাব থাকব বনের মাঝখানে, ধনদৌলত চাই না শুধু চাইব ধনের মুখপানে’—এ আমার পোষাবে না বাপু। তোমাকে ভয় দেখিয়ে তাড়াবার জন্যে বাবা অবশ্য অনেকটা বাড়িয়ে বলেছেন, আমাকে একেবারে হার্টলেস রাক্ষুসী বানিয়েছেন। কিন্তু আমি অতটা বেয়াড়া নই। তবে বাবা নিতান্ত অন্যায় কিছু বলেন নি। আমি বলি কি তোমার ওই প্রোফেসরি ছেড়ে দিয়ে কোনও ভাল চাকরির চেষ্টা কর। বাবার সঙ্গে মন্ত্রীদের আলাপ আছে, ওঁকে ধরলে নিশ্চয় একটা ভাল পোস্ট তোমাকে দেওয়াতে পারবেন। প্রথমটা মাইনে কম হলেও পরে আড়াই—তিন হাজার হওয়া অসম্ভব নয়।
—ততদিন আমার জন্যে তুমি সবুর করে থাকবে?
—গ্যারাণ্টি দিতে পারব না। অক্ষয় প্রেম একটা বাজে কথা, ভবিষ্যতে তোমার আমার দুজনেরই মতিগতি বদলাতে পারে। যা বলি শোন। একটা ভাল সরকারী চাকরির জন্যে নাছোড়বান্দা হয়ে বাবাকে ধর। কিন্তু এখনই নয়, ওঁর মাথার এখন ঠিক নেই, দিনরাত ওই মোষটার কথা ভাবছেন। বাবার গুপ্তচর খবর এনেছে, তালদিঘির সেই মহিম বাঁড়ুজ্যের ফুলতানী মোষ নাকি রোজ সাড়ে কুড়ি সের দুধ দিচ্ছে, আমাদের রাজমহিষীর চাইতে কিছু বেশী, যদিও দুটোই সমবয়সী তরুণী মোষ। বাবা তাই উঠে পড়ে লেগেছেন, রাজমহিষীকে কাপাস বিচির খোল, চীনাবাদাম, পালং শাগ, কড়াইশুঁটি, গাজর, টমেটো, নারকেল—কোরা, কমলালেবুর রস, এইসব পুষ্টিকর জিনিস খাওয়াচ্ছেন, ভাইটামিন বি—কমপ্লেক্সও দিচ্ছেন। এগজিবিশনটা আগে চুকে যাক। রাজমহিষী যদি গোল্ড মেডাল পায় তবে বাবা খুব দিল—দরিয়া হবেন, তখন তাঁকে চাকরির জন্যে ধরবে।
