রাজাবাহাদুর আবার সুৎ করে জিভের জল টেনে নিলেন, তার পর বললেন, আচ্ছা রাইচরণ, রোগন—জুশ জান?
মহিলাটি অধীর হয়ে বললেন, আঃ, ওসব জিজ্ঞেস করে কি হবে, যা খাবে তাই আনতে বল না।
রাজাবাহাদুর বললেন, আ হা হা ব্যস্ত হও কেন, খাওয়া তো আছেই, আগে একবার রাইচরণকে বাজিয়ে নিচ্ছি।
রাইচরণ বললে, বাজাবেন বই কি হুজুর, নিশ্চয় বাজাবেন। রোগন—জুশ হচ্ছে—
মহিলাটি আস্তে আস্তে উঠে পাশের কামরায় গিয়ে মাসিক পত্রিকার পাতা ওলটাতে লাগলেন।
—রোগন—জুশ হচ্ছে খাসি বা দুম্বার মাংস, শুধু ঘি—এ সিদ্ধ, জল একদম বাদ। ভারী পোষ্টাই হুজুর, সাত দিন খেলে লিকলিকে রোগা লোকেরও গায়ে গত্তি লেগে ভুঁড়ি গজায়।
—তুমি তো অনেক রকম জান দেখছি হে। আচ্ছা মুর্গ মুসল্লম তৈরী করতে পার?
—নিশ্চয় পারি হুজুর, ঘণ্টা তিনেক আগে অর্ডার দিতে হয়, অনেক লটঘটি কিনা। বাবুর্চীদের চাইতে আমি ঢের ভাল বানাতে পারি, আমি নতুন কায়দা আবিষ্কার করেছি। একটি বড় আস্ত মুরগি, তার পেটের মধ্যে মাছের কোপ্তা, ডিম আর কুচো—চিংড়ি দেওয়া কচুর শাগের ঘণ্ট, অভাবে লাউ—চিংড়ি, আর দই—
—কচুর শাগ? আরে রাম রাম।
—না হুজুর, মুরগির পেটে সমস্ত জিনিস ভরে দিয়ে সেলাই করে হাঁড়ি—কাবাবের মতন পাক করতে হয়, সুসিদ্ধ হয়ে গেলে মুরগি কুচো—চিংড়ি কচুর শাগ দই আর সমস্ত মশলা মিশে গিয়ে এক হয়ে যায়। খেতে যা হয় সে আর কি বলব হুজুর।
রাজাবাহাদুর এবারে আর সামলাতে পারলেন না, খানিকটা নাল টেবিলে পড়ে গেল। একটু লজ্জিত হয়ে রুমাল দিয়ে মুছে ফেলে বললেন, ওহে রাইচরণ, উত্তম সর—ভাজা খাওয়াতে পার?
হুজুরের আশীর্বাদে কি না পারি? সর—ভাজার রাজা হল গোলাপী গাই—দুধের সর—ভাজা, নবাব সিরাজদ্দৌলা যা খেতেন। কিন্তু দশ দিন সময় চাই মহারাজ, আর শ—খানিক টাকা খরচ মঞ্জুর করতে হবে।
—গোলাপী রঙের গরু হয় নাকি?
—না হুজুর। একটি ভাল গরুকে সাত দিন ধরে সেরেফ গোলাপ ফুল, গোলাব জল আর মিছরি খাওয়াতে হবে, খড় ভুষি জল একদম বারণ। তারপর সে যা দুধ দেবে তার রং হবে গোলাপী আর খোশবায় ভুর ভুর করবে। সেই দুধ ঘন করে তার সর নিতে হবে, আর সেই দুধ থেকে তৈরি ঘি দিয়েই ভাজতে হবে। রসে ফেলবার দরকার নেই আপনিই মিষ্টি হবে—গরু মিছরি খেয়েছে কিনা। সে যা জিনিস, অমৃত কোথায় লাগে। কেষ্টনগরের কারিগররা তা দেখলে হুতোশে গলায় দড়ি দেবে।
—কিন্তু অত গোলাপ ফুল খেলে গরুর পেট ছেড়ে দেবে না?
রাইচরণ গলার স্বর নীচু করে বললে, কথাটা কি জানেন মহারাজ? গোলাপ ফুলের সঙ্গে খানিকটা সিদ্ধি—বাটাও খাওয়াতে হয়, তাতে গরুর পেট ঠিক থাকে আর সর—ভাজাটিও বেশ মজাদার হয়।
—চমৎকার, চমৎকার!
—এইবার হুজুর আজ্ঞা করুন কি কি খাবার আনব। আমি নিবেদন করছি কি—আজ আমার যা তৈরি আছে সবই কিছু কিছু খেয়ে দেখুন, ভাল জিনিস, নিশ্চয় আপনি খুশী হবেন। এর পরে একদিন অর্ডার মতন পছন্দসই জিনিস তৈরি করে হুজুরকে খাওয়াব।
—আচ্ছা রাইচরণ, তোমার এখানে পাতি নেবু আছে?
—আছে বই কি, নেবু হল পোলাও খাবার অঙ্গ। একটি আরজি আছে মহারাজ—আজ ভোজনের পর হুজুরকে একটি শরবত খাওয়াব, হুজুর তর হয়ে যাবেন।
—কিসের শরবত!
—তবে বলি শুনুন মহারাজ। আমার একটি দূর সম্পর্কের ভাগনে আছে, তার নাম কানাই। সে বিস্তর পাস করেছে, নানা রকম দ্রব্যগুণ তার জানা আছে। শরবতটি সেই কানাই ছোকরারই পেটেণ্ট, সে তার নাম দিয়েছে—চাঙ্গায়নী সুধা। বছর—দুই আগে কানাই হুণ্ডাগড় রাজসরকারে চাকরি করত, কুমার সায়েব তাকে খুব ভালবাসতেন। কুমারের খুব শিকারের শখ, একদিন তাঁর হাতিকে বাঘে ঘায়েল করলে। হাতির ঘা দিন—কুড়ির মধ্যে সেরে গেল, কিন্তু তার ভয় গেল না। হাতি নড়ে না, ডাঙশ মারলেও ওঠে না। কুমার সায়েবের হুকুম নিয়ে কানাই হাতিকে সের—টাক চাঙ্গায়নী খাওয়ালে। পরদিন ভোরবেলা হাতি চাঙ্গা হয়ে পিলখানা থেকে গটগট করে হেঁটে চলল, জঙ্গল থেকে একটা শালগাছের রলা উপড়ে নিলে, পাতাগুলো খেয়ে ফেলে ডাণ্ডা বানালে, তার পর পাহাড়ের ধারে গিয়ে শুঁড় দিয়ে সেই ডাণ্ডা ধরে বাঘটাকে দমাদম পিটিয়ে মেরে ফেলল। কুমার সাহেব খুশী হয়ে কানাইকে পাঁচ—শ টাকা বকশিশ দিলেন।
—শরবতে হুইস্কি টুইস্কি আছে নাকি? ওসব আমার আর চলে না।
—কি যে বলেন হুজুর! কানাই ওসব ছোঁয় না, অতি ভাল ছেলে, সিগারেটটি পর্যন্ত খায় না। চাঙ্গায়নী সুধায় কি কি আছে শুনবেন? কুড়িটা কবরেজী গাছ—গাছড়া, কুড়ি রকম ডাক্তারী আরক, কুড়িদফা হেকিমী দাবাই, হীরেভস্ম, সোনাভস্ম, মুক্তোভস্ম, রাজ্যের ভিটামিন, আর পোয়াটাক ইলেকটিরি—এইসব মিশিয়ে চোলাই করে তৈরী হয়। খুব দামী জিনিস, কানাই আমাকে হাফ প্রাইস পঞ্চাশ টাকায় এক বোতল দিয়েছে, মামা বলে ভক্তি করে কিনা! দোহাই হুজুর, আজ একটু খেয়ে দেখবেন।
—সে হবে এখন। আচ্ছা রাইচরণ, তুমি বার্লি রাখ?
—রাখি হুজুর। ছানার পুডিং—এ দিতে হয়, নইলে আঁট হয় না। এইবার তবে হুজুরের জন্য খাবার আনতে বলি? হুকুম করুন কি কি আনব।
—এক কাজ কর—এক কাপ জলে এক চামচ বার্লি সিদ্ধ ক’রে নেবু আর একটু নুন দিয়ে নিয়ে এস।
রাইচরণ আকাশ থেকে পড়ে বললে, সেকি মহারাজ! ভেটকি মাছের পোলাও, মটনকারি, ফাউল—রোস্ট—
