—আচ্ছা আচ্ছা, আমি সব এনে দিচ্ছি। তুই এখানে একলাটি বসে চুপচাপ খেয়ে নিবি তার পর সোজা বাড়ি চলে যাবি, কেমন?
রটাই ঘাড় নেড়ে জানালে যে তাতেই সে রাজী। এত ধমক খাওয়ার পরেও তার খিদে ঠিক আছে, কিন্তু পান্নালাল তাকে যা এনে দিলে তা যথেষ্ট নয়, যেটা আসল জিনিস, ল্যাংড়া আমের ল্যাংচা, তাই তাকে দেওয়া হয় নি। যা জুটল তাই সে অনেকক্ষণ ধরে খেলে, তার পর কাকেও কিছু না বলে বাড়ি রওনা হল।
রটাইএর বেফাঁস কথার ফলে ও—ঘরের চায়ের আসরটি একেবারে মাটি হয়ে গেল। আলাপ মোটেই জমল না, যে উদ্দেশ্যে এত আয়োজন তাও কিছুমাত্র অগ্রসর হল না। রুবি গোঁজ হয়ে বসে রইল, তার মুখ থেকে হাঁ—না ছাড়া কোনও কথা বেরুল না। ওই বজ্জাত রটাইটাকে সে যদি হাতে পায় তো কুচি কুচি করে কেটে ফেলে। আর মায়ের বা কি আক্কেল, তাঁর মেয়ে নিজের হাতে খাবার তৈরি করেছে এ কথা ইশারায় বললেই তো চলত, ঢাক পিটিয়ে জানাবার কি দরকার ছিল? কেবল বকবক করে এলোমেলো কথা বলতে পারেন, ওই শয়তান ছোঁড়াটা যে জলজ্যান্ত সামনে বসে রয়েছে সে হুঁশই হল না।
অপ্রিয় ব্যাপারটা চাপা দেবার জন্য রুবির মা অনর্গল কথা বলে যেতে লাগলেন, পান্নালালও তার বন্ধুকে খুশী করবার জন্য নানা রকম রসিকতা করতে লাগল। খগেন হাসিমুখে অল্পস্বল্প কথা বলে কোনও রকমে শিষ্টাচার বজায় রাখলে। খানিক পরে সে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, আজ উঠি মাসীমা, আর এক জায়গায় দরকার আছে। ওঃ, যা খাইয়েছেন তা হজম হতে তিন দিন লাগবে।
রুবির মা বললেন, কি আর খেয়েছ বাবা, ও তো কিছুই নয়। আবার এসো, সকালে বিকেলে সন্ধ্যেয় যখন তোমার সুবিধে। তুমি তো ঘরের ছেলে, যা ঘরে থাকবে তাই খাবে।
আবার আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং ঝুঁকে নমস্কার করে খগেন বিদায় নিলে।
কিছুদূরে গিয়েই সে দেখতে পেলে, একটি ছেলে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিয়ে চলেছে। গাড়ি থামিয়ে খগেন ডাকল, ও খোকা! রটাই থমকে দাঁড়িয়ে বললে, আমাকে ডাকছেন?
—হ্যাঁ হ্যাঁ। তোমার নাম কি ভাই?
—রটাই।
—এস, গাড়িতে ওঠ, তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।
রটাই উঠে বসল। খগেন বললে, তুমি বুঝি খুব রটিয়ে বেড়াও তাই রটাই নাম?
রটাই উত্তর দিলে, দূর তা কেন। আমার ভাল নাম শ্রীরটন্তীকুমার রায়চৌধুরী, আমি রটন্তীপূজার দিন জন্মেছিলুম কিনা তাই আমার দাদামশাই ওই নাম রেখেছেন। আর বড়দির নাম জয়ন্তীমঙ্গলা, ছোড়দির না প্রত্যঙ্গিরা।
—উঃ, তোমাদের খুব জাঁকালো নাম দেখছি? বাড়ি কত দূরে? কোন ক্লাসে পড়? বাড়িতে কে কে আছেন?
রটাই জানালে, তার বাড়ি বেশী দূরে নয়। সে ক্লাস সিকসে পড়ে। বাবা রেলে কাজ করেন, বাইরে ঘুরে বেড়াতে হয়, মাঝে মাঝে আসেন। বাড়িতে আছেন তার মা, দুই দিদি আর সে নিজে। দিদিদের এখনও বিয়ে হয় নি। তা ছাড়া ভুঁদো কুকুর আর রূপুসী বেড়াল আছে। ভুঁদোটা ভীষণ লোভী, সেদিন মালপো চুরি করে খেয়েছিল। কিন্তু রূপুসী হচ্ছে ভদ্র মহিলা খেতে না বললে খায় না। শীঘ্রই তার বাচ্চা হবে, খগেনের যদি দরকার থাকে তবে যতগুলো ইচ্ছে নিতে পারে।
রটাই মোটেই লাজুক নয়, অপরিচয়ের জন্য যেটুকু সংকোচ ছিল তা অল্পক্ষণ আলাপে সহজেই কেটে গেল। সে প্রশ্ন করলে রুবিদির সঙ্গে আপনার ভাব হল?
খগেন হেসে বললে, কই আর হল। চায়ের টেবিলে তুমি যে বোমা ছুঁড়েছ তাতে তো সবাইকার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে।
—আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন? আমার কিন্তু কিচ্ছু দোষ নেই।
—না না, তুমি খুব ভাল ছেলে, শুধু একটু কাণ্ডজ্ঞানের অভাব, যা বলতে নেই তাই বলে ফেলেছ।
আমি তো সত্যি কথাই বলেছি। আমার বড়দির কাছেই শুনেছি যে মানিকের মা বলেছিলেন তাই খাবার তৈরি করে দিয়েছে।
—না হে না। তুমি কিচ্ছু জান না, রুবি—দিই সব নিজের হাতে তৈরি করেছে।
—কখখনো নয়, আপনিই কিচ্ছু জানেন না। রুবি—দি শুধু আলু সেদ্ধ আর ডিম সেদ্ধ করতে পারে। ব্যাঙের ছবিটা তার আঁকা বটে, কিন্তু সেই যে পদ্মফুলের আর মুরগির ছবিওয়ালা টেবিল ক্লথটা আপনাকে দেখিয়েছে সেটা রুবি—দি তৈরি করে নি। মানিকদের বাড়ির পাশের বাড়িতে আমাদের ক্লাসের কেল্টে থাকে, তারই পিসীমা ওটা বানিয়েছে। আমি ওদের বাড়ি যাই কিনা, তাই সব জানি।
—উঃ, তুমি অতি সাংঘাতিক ছেলে, আঁফাঁ তেরিবল! কিন্তু তোমার সেই জয়ন্তীমঙ্গলা দিদিমণিই যে খাবার তৈরি করেছেন তার প্রমাণ কি? তোমাদের বাড়ি গেলে আমাকে ওই রকম খাওয়াতে পারবে?
—খুব পারব, না পারলে আমার দু কান মলে দেবেন।
—আর যদি পার তবে তুমি আমার দু কান মলে দেবে নাকি?
—দূর, আপনি যে বড়। যদি হেরে যান তো আমাকে ফাইন দেবেন।
—কত ফাইন দিতে হবে?
একটু ভেবে রটাই বললে, একটা টাকা দেবেন।
—মোটে এক টাকা দিলেই হবে?
—দু—টাকা যদি দেন তো আরও ভাল, আমার দু কানের বদলে আপনার দু টাকা। এখুনি চলুন না আমাদের বাড়ি।
—পাগল নাকি! এই মাত্র এত খেয়ে আবার তোমাদের বাড়িতে খাব কি করে?
—আচ্ছা, পরশু রবিবার, সেদিন বিকেলে ঠিক আসবেন বলুন।
—তুমিই বাড়ির কত্তামশাই নাকি? ওখানে কেউ তো আমাকে চেনেন না. যদি গায়ে পড়ে খেতে যাই তবে যে আমাকে অসভ্য হ্যাংলা মনে করবেন।
—ইশ, মনে করলেই হল! আমি তো আপনাকে চিনি, আমার কথায় যদি আপনি আসেন তবে কেউ কিচ্ছু মনে করবে না। কিন্তু দেখুন, আমরা হচ্ছি গরিব, অত রকম খাবার হবে না। মানিকের মা মাছ মাংস পেস্তা বাদাম এইসব পাঠিয়ে দিয়েছিল তাই বড়দি করে দিয়েছে। রবিবার বিকেলে ঠিক আসবেন কিন্তু।
