–ভয় নেই দিদি। তোমার ক্রমিক রপান্তর ধ্রুবর চোখের সামনে একটু একটু করে হবে, ও টেরই পাবে না, ডায়ারিতেও নোট করবে না। শেষ বয়সে যদি হাড়গিলে কি শকুনি গৃধিনী হয়ে পড় তাতেও ধ্রুব শকড হবে না। প্রেমের দুই অল্প, একটা দেহাশ্রিত, আর একটা দেহাতীত। তোমাদের মনে এখন এক সঙ্গে দুটো মিশে আছে। কিন্তু যতই বয়স বাড়বে ততই প্রথমটা লোপ পাবে, শুধু দ্বিতীয়টাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে।
রাকা বলল, পঞ্চান্ন বছর পরে ঠাকুমাকে হঠাৎ দেখে আপনার মনে একটা ধাক্কা লেগেছিল তা বুঝলুম, কিন্তু তার ফলে আপনার হদয়ের অবস্থা অর্থাৎ ঠাকুমার প্রতি আপনার মনোভাব কি রকম দাঁড়াল?
–পর পর দুটো অনুভূতি হল, যশোমতীর দুই রূপে দেখলুম। ওঁকে ভুলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু ওঁর হাসি দেখে আর গলার স্বর শনে পঞ্চান্ন বছর আগেকার সেই তন্বী কিশোরী মতি মনের মধ্যে ফটে উঠল। তার কিছুমাত্র বিকার হয় নি, একবারে যথাযথ অক্ষয় হয়ে আছে। তার যে পরিবর্তন পরে ঘটেছে তা তো আমি দেখি নি, সেজন্যে তার কোনও প্রভাবই আমার চিত্তস্থিত মুতির ওপর পড়ে নি। তার পরেই যশোর অন্য এক রুপ দেখলুম, দেহের নয়, আত্মার। আমার বুদ্ধিতে মন আর আত্মা একই বস্তু, বয়সের সঙ্গে তার পরিবর্তন হয়, কিন্তু ধারা বজায় থাকে সেজন্য চিনতে পারা যায়। যেমন, নদীর জলপ্রবাহ নিত্য নতন, কিন্তু প্রবাহিণী একই। যশোমতীর কথায় বুঝলম, উনি সেই আগের মতন সংস্কারের দাসী গরজনের আজ্ঞাপালিকা ভীর মেয়ে নন, ওঁর স্বাধীন বিচারের শক্তি হয়েছে, মনের কথা বলবার সাহস হয়েছে। উনি যদি সেকালের কিশোরী না হয়ে একুশ-বাইশ বছরের আধুনিকী হতেন তবে সমস্ত বাধা অগ্রাহ্য করে আমাকেই বরণ করতেন।
যশোমতী বললেন, এই, তোরা চুপ কর, কেন ওঁকে অত বকাচ্ছিস, খেতে দিবি না?
রাকা বলল, বা রে, উনি নিজেই তো বকবক করছেন, আমরা শুধ; একটু উসকে দিচ্ছি। আসন দাদ, এইবার খেতে বসুন।
যশোমতী বললেন, টেবিলে খাবার দেব কি, না আসন পেতে দেব?
পুরঞ্জয় বললেন, খাওয়াবে তো ফলার। টেবিলে তা মানায় না, আসনই ভাল। মেজেতেই বসব।
খাদ্যের আয়োজন দেখে পুরঞ্জয় বললেন, বাঃ, কি সুন্দর! সাত্ত্বিক ভোজন একেই বলে। সাদা কম্বলের আসন, সাদা পাথরের থালায় ধপধপে সাদা চিড়ে, সাদা কলা, সাদা সন্দেশ, সাদা বরফি, সাদা নারকেল কোরা, সাদা পাথরবাটিতে সাদা দই। আবার, সামনে একটি সাদা বেরাল বসে আছে। যশো, তোমার রুচির তুলনা নেই।
রাকা বলল, আসল জিনিসেরই তো বর্ণনা করলেন না। এই পবিত্র শুভ্র খাদ্যসম্ভার পরিবেশন করেছেন কে? একজন শুভ্রবসনা শুভ্রকেশা শুভ্রকান্তি শুচিস্মিতা সুন্দরী, যাঁর দুটো মতি আপনার চিত্তপটে পার্মানেন্ট হয়ে আছে।
পুরঞ্জয় বললেন, সাধু, সাধু চমৎকার, বহুত আচ্ছা, ওআহ, খুব, একসেলেন্ট।
রাকা বলল, দাদ, একটি কথা নিবেদন করি। আমাদের দুজনকে যশোমতী তো আপনি শুকসারী বলেছেন। আমি বলি কি, আপনিও আমাদের এই নীড়ে ঢুকে পড়ন, ঠাঁই আছে। যশোমতী দেবীর পাণিগ্রহণ করুন। দুটিতে ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর মতন আমাদের কাছে থাকবেন, সবাই মিলে পরমানন্দে দিন যাপন করব।
যশোমতী বললেন, যা যাঃ, বেশী জেঠামি করিস নি।
পুরঞ্জয় বললেন, শোন রাকা দিদি। বড়ো বড়েীর বিয়ে বিলাতে খুব চলে, ভবিষ্যতে হয়তো এদেশেও চলবে, যেমন স্মোকড হ্যাম আর সার্ডিন চলছে। কিন্তু আপাতত এদেশের রচিতে তা বিকট। তার দরকারও কিছু নেই। যশোমতীর পবরপের ছাপ আমার মনে পাকা হয়ে আছে, ওঁর আত্মার স্বরুপও আমি উপলব্ধি করেছি, উনিও আমাকে ভাল করেই বুঝেছেন। এর চাইতে বেশী উনিও চান না, আমিও চাই না।
রটন্তীকুমার
স্কুলের ছুটির পর মানিক বললে, এই রটাই, আজ বিকেলে পাঁচটার সময় আমাদের বাড়ি আসবি, চায়ের নেমন্তন্ন।
রটাই বললে, আজ তোর জন্মদিন বুঝি?
—দূর বোকা, জন্মদিন বছরে ক বার হয়? এই তো সেদিন হয়ে গেল, ভোজ খেয়ে তোর পেটের অসুখ হল, মনে নেই?
—তবে কিসের নেমন্তন্ন ভাই?
—আজ বিকেলে দিদিমণির বর আসবে।
—তোর রুবি—দিদিমণির বিয়ে হয়ে গেছে নাকি?
—দূর বোকা, বিয়ের এখন কিছুই ঠিক হয় নি। আজ খগেনবাবু দিদিমণির সঙ্গে ভাব করতে আসবে। যদি খুব ভাব হয়ে যায় তবেই বিয়ে হবে।
রটাই সমঝদারের মতন বললে, অ। সে নিমন্ত্রণে যেতে সর্বদাই প্রস্তুত, উপলক্ষ্য যাই হোক, ভাব বা আড়ি বিয়ে বা বউভাত, অন্নপ্রাশন বা শ্রাদ্ধ। মুড়ি—ছোলাভাজা, কেক—বিস্কুট, কচুরি—সন্দেশ, পোলাও—কালিয়া, কিছুতেই তার আপত্তি নেই।
বিকালে পৌঁনে পাঁচটার সময় রটাই যথাসাধ্য পরিচ্ছন্ন হয়ে মানিকদের বাড়ি যাচ্ছে এমন সময় তার বড়দিদি বললে, এই রটাই, এই টিফিন ক্যারিয়ারটা নে, মানিকের মাকে দিবি। সাবধানে নিয়ে যাবি, ফেলে দিস নি যেন। খালি হলে আসবার সময় ফেরত আনবি।
টিফিন ক্যারিয়ারটা হাতে নিয়ে রটাই বললে, উঃ কি ভারী! কি কি আছে বড়দি? বাদামের নিমকি আর মাছের কচুরি আর মাংসের প্যাটি আর পেস্তার বরফি আর ল্যাংড়া আমের ল্যাংচা?
হ্যাঁ হ্যাঁ, সব আছে। মানিকদের বাড়ি গিয়ে তো দেখতেই পাবি, খেতেও পাবি।
—ওদের বাড়িতে খাওয়ানো হবে তো তুমি খাবার করে দিলে কেন? বল না দিদিমণি!
আঃ, তোর অত খোঁজে দরকার কি? মানিকের মা তৈরি করে দিতে বলেছেন তাই দিয়েছি।
