যযাতি বললেন, সুন্দরী, তুমি আমাকে বড়ই সমস্যায় ফেললে, এই বিভীতক আর হরীতকের মধ্যে আমি কোনও ইতরবিশেষ দেখছি না। আচ্ছা, এক কাজ করলে হয় না? আমার দিকে একবার দৃষ্টিপাত কর।
নিজের কুচকুচে কালো বাবরি চুলে হাত বুলিয়ে আর রাজকীয় মোটা গোঁফে চাড়া দিয়ে যযাতি বললেন, যৌবন তো আমার রয়েইছে, বেশ পরিপুষ্ট যৌবন, তা যদি দান না করে রেখেই দিই? আমিই যদি তোমাকে বিবাহ করি তা হলে কেমন হয় মনোহরা?
বিভীতক আর হরীতক ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, এ কি রকম কথা মহারাজ! আপনি ঢাক পিটিয়ে ঘোষণা করেছেন যে আপনার যৌবন অন্যকে দান করবেন, এখন বিপরীত কথা বলছেন কেন?
সমবেত বৃদ্ধদের কয়েকজন চিৎকার করে হাত নেড়ে বললেন, মহারাজ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আপনি রৌরব নরকে যাবেন। আমাদের ডেকে এনে বঞ্চনা করবেন এত দূর আস্পর্ধা।
জনতা থেকে নিনাদ উঠল—চলবে না, চলবে না।
ব্যাপার গুরুতর হচ্ছে দেখে নারদ আর অশ্বিনীকুমারদ্বয় আত্মপ্রকাশ করলেন। যযাতি সসম্ভ্রমে তাঁদের পাদ্য অর্ঘ্যyদি দিতে গেলেন, কিন্তু নারদ বললেন, মহারাজ, ব্যস্ত হয়ো না, উপস্থিত সংকট থেকে আগে মুক্ত হও।
যযাতি বললেন, দেবর্ষি, আমার মাথা গুলিয়ে গেছে, আপনিই বলুন এখন আমার কর্তব্য কি।
নারদ বললেন, তুমি সত্যভ্রষ্ট হয়েছ। পুরুকে ডাক, সেই তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যবস্থা করবে।
যযাতির আহ্বানে পুরু জনসভায় এলেন। পূজনীয়গণকে বন্দনা করে বললেন, পিতা, আমাকে আবার এর মধ্যে জড়াতে চান কেন? আমার যজ্ঞীয় অনুষ্ঠান এখনও সমাপ্ত হয়নি, যজ্ঞান্ত স্নান করেই আপনার আদেশে এসেছি। বলুন কি করতে হবে।
যযাতি নীরব রইলেন। নারদ বললেন, রাজপুত্র, তোমার পিতার কিঞ্চিৎ চিত্তবিকার হয়েছে, তাঁর সংকল্পসিদ্ধির ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। এই সভায় উপস্থিত বৃদ্ধগণের মধ্যে কে যোগ্যতম, কার সঙ্গে যযাতি বয়স বিনিময় করবেন তা তুমিই স্থির কর।
পুরু প্রশ্ন করলেন, ওই বিদ্যুদবল্লরী তুল্য ললনা যাঁর দুটি হাত দুই বৃদ্ধ ধরে আছেন, উনি কে?
নারদ বললেন, উনি স্বর্গত সুবর্তরাজ মিত্রসেনের কন্যা মনোহরা। ওই দুই বৃদ্ধ ওঁর পিতার গুরুপুত্র, বিভীতক ও হরীতক। ওঁরা দুজনেই মনোহরার পাণিপ্রার্থী, যযাতির যৌবনও ওঁরা চান। কিন্তু তোমার পিতা বড় সমস্যায় পড়েছেন, কার সঙ্গে বয়স বিনিময় করবেন তা স্থির করতে পারছেন না।
পুরু বললেন, সমস্যা তো কিছুই দেখছি না, আমি এখনই মীমাংসা করে দিচ্ছি। রাজকন্যা, ওই দুই বৃদ্ধের মধ্যে কাকে যোগ্যতর মনে কর?
মনোহরা বললেন, দুজনেই সমান।
একটু চিন্তা করে পুরু বললেন, বরবর্ণিনী মনোহরা, তোমার সহিত নিভৃতে কিছু পরামর্শ করতে চাই। ওই অশোক তরুর ছায়ায় চল।
অশোকতরুতলে কিছুক্ষণ আলাপের পর পুরু সকলের সমক্ষে এসে বললেন, পরমারাধ্য পিতৃদেব, ত্রিলোকপূজ্য দেবর্ষি, দেববৈদ্য অশ্বিনীদ্বয়, এবং সমবেত ভদ্রগণ, অবধান করুন। আজ সহসা আমার উপলব্ধি হয়েছে, পিতার আজ্ঞা পালন না করে আমি অপরাধী হয়েছি। এখন উনি আমাকে ক্ষমা করুন, ওঁর যৌবনের পরিবর্তে আমার জরা গ্রহণ করুন। এই রাজকুমারী মনোহরা আমাকেই পতিত্বে বরণ করবেন।
নারদ আর দুই অশ্বিনীকুমার বললেন, সাধু সাধু! জনতা থেকে ধ্বনি উঠল, রাজা যযাতির জয়, যুবরাজ পুরুর জয়! বিভীতক আর হরীতক বিরস বদনে নিঃশব্দে প্রস্থান করলেন।
যযাতি মৃদুস্বরে আপনমনে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ছি ছি ছি, এই যদি করবি তবে সেদিন অমন তেজ দেখিয়ে আমার কথায় ‘না’ বললি কেন? এত লোকের সামনে ধাষ্টামো করবার কি দরকার ছিল?
দুই অশ্বিনীকুমার বললেন, মহারাজ যযাতি, রাজপুত্র পুরু, আমরা এখনই অস্ত্রোপচার করে তোমাদের জরা—যৌবন পরিবর্তিত করে দিচ্ছি, অস্ত্রভাণ্ড আমাদের সঙ্গেই আছে।
নারদ বললেন, তোমাদের কিছুই করতে হবে না, পিতা—পুত্রের পুণ্যবলে বিনা অস্ত্রেই পরিবর্তন ঘটবে।
পুরু তাঁর পিতার চরণ স্পর্শ করলেন। পুরুর মস্তকে করার্পণ করে যযাতি বললেন, পুত্র, আমার যৌবন তোমাতে সংক্রমিত হ’ক, তোমার জরা আমাতে প্রবেশ করুক।
তৎক্ষণাৎ বিনিময় হয়ে গেল।
১৮৭৯ শক (১৯৫৭)
চমৎকুমারী ইত্যাদি গল্প
যশোমতী
মেজর পুরঞ্জয় ভঞ্জ এম. ডি, আই. এম. এস অনেক কাল হল অবসর নিয়েছেন, রোগী দেখাও এখন ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর বয়স পচাত্তর পেরিয়েছে। কলকাতায় নিজের বাড়ি আছে, কিন্তু স্থির হয়ে সেখানে থাকতে পারেন না, বছরের মধ্যে আট-ন মাস বাইরে ঘুরে বেড়ান।
শীত কাল। পুরঞ্জয় দেরাদুনে এসেছেন, আট-দশ দিন এখানে থাকবেন। রাজপুর রোডে শিবালিক হোটেলে উঠেছেন, সঙ্গে আছে তাঁর পুরনো চাকর বন্দাবন। রাত প্রায় আটটা, পুরঞ্জয় তাঁর ঘরে ইজি চেয়ারে বসে একটা বই পড়ছেন। বৃন্দাবন এসে জানাল, এক বড়ী গিন্নীমা দেখা করতে চান। পুরঞ্জয় বললেন, আসতে বল তাঁকে।
যিনি এলেন তিনি খুব ফরসা, একটু মোটা, গাল আর তনিতে বলি পড়েছে। মাথায় প্রচুর চুল, কিন্তু প্রায় সবই পেকে গেছে। পরনে সাদা গরদ, সাদা ফ্লানেলের জাম্য, তার উপর সাদা আলোয়ান। গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করে পরেঞ্জয়ের দিকে একদষ্টে চেয়ে রইলেন।
পুরঞ্জয় বললেন, কোথা থেকে আসা হচ্ছে? চিনতে পারছি না তো।
আগন্তুকা বললেন, আমি যশো, আলীপুরের যশোমতী।
