ডাকিনী ঘোমটাটা সরাইল। শিবু চমকিত হইয়া সভয়ে বলিল—’অ্যাঁ! তুমি নেত্য!’
নৃত্যকালী বলিল—’হ্যাঁরে মিনসে। মনে করেছিলে ম’রে আমার কবল থেকে বাঁচবে! পেত্নী শাঁকচুন্নীর পিছু পিছু ঘুরতে—বড় মজা না?’
শিবু। এলে কি ক’রে? ওলাউঠোয় নাকি?
নৃত্যকালী। ওলাউঠো শত্তুরের হ’ক। কেন, ঘরে কি কেরোসিন ছিল না?
শিবু। তাই চেহারাটা ফরসাপানা দেখাচ্ছে। পোড় খেলে সোনার জলুস বাড়ে। ধাতটাও একটু নরম হয়েছে নাকি?
শুভকর্মে বাধা পড়িল। বাহিরে ও কিসের গোলযোগ? যেন একপাল শকুনি—গৃধিনী ঝুটোপটি কাড়াকাড়ি ছেঁড়াছিঁড়ি করিতেছে। সহসা উলকার মত ছুটিয়া আসিয়া পেত্নী ও শাঁকচুন্নী উঠানের বেড়ার আগড়া ঠেলিয়া ভীষণ চেঁচামেচি আরম্ভ করিল (ছাপাখানার দেবতাগণের সুবিধার জন্য চন্দ্রবিন্দু বাদ দিলাম, পাঠকগণ ইচ্ছামত বসাইয়া লইবেন)।
পেত্নী। আমার সোয়ামী তোকে কেন দেব লা?
শাঁকচুন্নী। আ মর বুড়ী, ও যে তোর নাতির বয়সী।
পেত্নী। আহা, কি আমার কনে বউ গা!
শাঁকচুন্নী। দূর মেছোপেত্নী,আমি যে ওর দু—জন্ম আগেকার বউ।
পেত্নী। দূর গোবরচুন্নী, আমি যে ওর তিন জন্ম আগেকার বউ।
শাঁকচুন্নী। মর চেঁচিয়ে, ওদিকে ডাইনি মাগী মিনসেকে নিয়ে উধাও হ’ক।
তখন পেত্নী বিড়বিড় করিযা মন্ত্র পড়িয়া আগড় বন্ধ করিয়া বলিল—’আগে তোর ঘাড় মটকাব তার পর ডাইনি বেটীকে খাব।’
কামড়াকামড়ি চুলোচুলি আরম্ভ হইল। একা নৃত্যকালীতেই রক্ষা নাই তাহার উপর পূর্বতন দুই জন্মের আরও দুই পত্নী হাজির। শিবু হাতে পইতা জড়াইয়া ইষ্টমন্ত্র জপিতে লাগিল। নৃত্যকালী রাগে ফুলিতে লাগিল।
এমন সময় নেপথ্যে যক্ষের গলা শোনা গেল—
ধনী, শুনছ কিবা আনমনে,
ভাবছ বুঝি শ্যামের বাঁশি ডাকছে তোমায় বাঁশবনে।
ওটা যে খ্যাঁকশেয়ালী, দিও না কুলে কালী।
রাত—বিরেতে শ্যালকুকুরের ছুঁচোপ্যাঁচার ডাক শুনে।
যক্ষ বেড়ার কাছে আসিয়া বলিলেন—’ভায়া, এখানে হচ্ছে কি? এত গোল কিসের?’
কারিয়া পিরেত হাঁকিল—’এ বরম পিচাস, আরে দরবাজা তো খোল।’ শিবুর সাড়া নাই।
প্রচণ্ড ধাক্কা পড়িল, কিন্তু মন্ত্রবদ্ধ আগড় খুলিল না, বেড়াও ভাঙ্গিল না। তখন কারিয়া পিরেত তারস্বরে উৎপাটন—মন্ত্র পড়িল—
মারে জ জুয়ান—হেঁইয়া
আউর ভি থোঁড়া—হেঁইয়া
পর্বত তোড়ি—হেঁইয়া
চলে ইঞ্জন—হেঁইয়া।
ফটে বয়লট—হেঁইয়া।
খবরদার—হা—ফিজ।
মড় মড় করিয়া ঘরের চাল, দেওয়াল, বেড়া, আগড় সমস্ত আকাশে উঠিয়া দূরে নিক্ষিপ্ত হইল।
ডাকিনী, অর্থাৎ নৃত্যকালীকে দেখিয়া যক্ষ বলিলেন—’একি, গিন্নি এখানে! বেহ্মদত্যিটার সঙ্গে! ছি ছি—লজ্জার মাথা খেয়েচ?’ ডাকিনী ঘোমটা টানিয়া কাঠ হইয়া বসিয়া রহিল।
কারিয়া পিরেত বলিল—’আরে মুংরি, তোহর শরম নহি বা?’
তারপর যে ব্যাপার আরম্ভ হইল তাহা মনে করিলেও কলমের কালি শুখাইয়া যায়। শিবুর তিন জন্মের তিন স্ত্রী এবং নৃত্যকালীর তিন জন্মের তিন স্বামী—এই ডবল ত্র্যহস্পর্শযোগে ভুশণ্ডীর মাঠে যুগপৎ জলস্তম্ভ, দাবানল ও ভূমিকম্প শুরু হইল। ভূত, প্রেত, দৈত্য, পিশাচ, তাল, বেতাল প্রভৃতি দেশী উপদেবতা যে যেখানে ছিল, তামাশা দেখিতে আসিল। স্পূক, পিক্সি, নোম, গরলিন প্রভৃতি গোঁফ—কামানো বিলাতি ভূত বাঁশি বাজাইয়া নাচিতে লাগিল। জিন, জান, আফ্রিদ, মারীদ প্রভৃতি লম্বা—দাড়িওয়ালা কাবুলী ভূত দাপা—দাপি আরম্ভ করিল। চিং চ্যাং, ফ্যাচাং ইত্যাদি মাকুন্দে চীনে—ভূত ডিগবাজি খাইতে লাগিল।
রাম রাম রাম। জয় হাড়িঝি চণ্ডী আজ্ঞা কর মা! কে এই উৎকট দাম্পত্যসমস্যার সমাধান করিবে? আমার কম্ম নয়। ভূতজাতি অতি নাছোড়বান্দা, ন্যায্যগণ্ডা ছাড়িবে না। পুরুষের পুরুষত্ব, নারীর নারীত্ব, ভূতের ভূতত্ব, পেত্নীর পেত্নীত্ব—এসব তাহারা বিলক্ষণ বোঝে। অতএব সনির্বন্ধ অনুরোধ করিতেছি—শ্রীযুক্ত শরৎ চাটুজ্যে, চারু বাঁড়ুজ্যে, নরেশ সেন এবং যতীন সিংহ মহাশয়গণ যুক্তি করিয়া একটা বিলি—ব্যবস্থা করিয়া দিন—যাহাতে এই ভূতের সংসারটি ছারেখারে না যায় এবং কোনও রকম নীতি—বিগর্হিত বিদকুটে ব্যাপারে না ঘটে। নিতান্ত যদি না পারেন, তবে চাঁদা তুলিয়া গয়ায় পিণ্ড দিবার চেষ্টা দেখুন, যাহাতে বেচারারা অতঃপর শান্তিতে থাকিতে পারে।
ভারতবর্ষ, ফাল্গুন ১৩৩০ (১৯২৩)
ভূষণ পাল
ভূষণ পাল তার এককালের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও প্রতিবেশী নবীন সাঁতরাকে খুন করেছিল, সেসন্স জজ তার ফাঁসির হুকুম দিয়েছেন। আসামীকে যারা চেনে তারা সকলেই ক্ষপ্ত হয়েছে, তাদের আশা ছিল বড় জোর আট-দশ বছর জেল হবে। কিন্তু ভূষণের উকিলের কোনও যুক্তি হাকিম শুনলেন না। বললেন, আসামী ঝোঁকের মাথায় কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে খুন করে নি, অনেকদিন থেকে মতলব এটে মারবার চেষ্টায় ছিল, অবশেষে সুযোগ পেয়ে ছোরা বসিয়েছে। আসামীর আক্রোশের যতই কারণ থাক তাতে তার অপরাধের গুরুত্ব কমে না। জরি একমত হয়ে ভূষণকে দোষী সাব্যস্ত করলেও একটু দয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু হাকিম দয়া করলেন না, চরম দণ্ডই দিলেন।
ভূষণ পাল হিন্দুস্থান মোটর ওআকস-এ মিস্ত্রীর কাজ করত। ফাটা তোবড়া মডগার্ড বেমালুম মেরামত করতে তার জুড়ী ছিল না, সেজন্য মাইনে ভালই পেত। সেখানে তার গরস্থানীয় হেডমিস্ত্রী ছিল সাগর সামন্ত। কারখানার লোকে তাকে সামন্ত মশাই বলে ডাকে, কিন্তু একটা দূর সম্পর্ক থাকায় ভূষণ তাকে সাগর কাকা বলে।
