বিধু চুপিচুপি ভবতোষকে বললে, এঁদের একমাত্র ছেলেটি টাইফয়েডে ভুগে কাল মারা গেছে।
ভবতোষ বললেন, স্থির হয়ে ব’স মা, আমার পা ছাড়। চোখে মুখে একটু জল দাও,—বিধু, শিগগির একটু জল আন। আগে একটু শান্ত হও, নইলে আমার কথা বুঝতে পারবে কেন।
সুভদ্রা। আমার তিন বছরের খোকা, পদ্মফুলের মতন ছেলে, কোথায় গেল বাবা?
ভবতোষ। মা, তোমার নিষ্পাপ খোকা ভগবানের কোলে সুখে আছে। স্বর্গে গিয়ে কিংবা পরজন্মে তুমি তাকে ফিরে পাবে।
সুভদ্রা। ভগবান কেন তাকে নিলেন? তার খেলনা যে চারদিকে ছড়ানো রয়েছে, তার হাসি কান্না আবদার কি করে ভুলব বাবা, এই শোক কি করে সইব?
ভবতোষ। মহা মহা দুঃখও ক্রমশ সয়ে যায়, তুমিও সইতে পারবে। ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন—একথা বিশ্বাস কর তো?
সুভদ্রা। না বাবা, করি না। এই সর্বনাশ করে ভগবান আমার কি মঙ্গল করলেন? এত সব বুড়ো বুড়ী রয়েছে, তাদের ছেড়ে আমার খোকাকে নিলেন কেন?
ভবতোষ। ভগবান কেন কি করেন তা বোঝা তো আমাদের সাধ্য নয়। পূর্বজন্মের কর্মফলে লোকে ইহজন্মে সুখ দুঃখ ভোগ করে—একথা বিশ্বাস কর তো?
সুভদ্রা। পূর্বজন্মের কথা জানি না বাবা। কার পাপের ফলে আমার খোকা অকালে গেল? তার নিজের পাপ, না তার বাপের না আমার? দয়াময় ভগবান আমাদের পাপ করতে দিয়েছিলেন কেন? ঢের বড় বড় পাপীকে তো তিনি সুখে রেখেছেন।
ভবতোষ। মা এখন তুমি বড় ব্যাকুল হয়ে আছ, পাপ পুণ্য কর্মফল এসব কথা এখন থাক, আগে তুমি একটু স্থির হও। তোমার মনে ভক্তি আছে?
সুভদ্রা। ভক্তি তো ছিল বাবা, এখন যে হতাশ হয়ে গেছি। যিনি আমার ছেলেকে কেড়ে নিলেন তাঁকে কি করে ভক্তি করব?
ভবতোষ। আচ্ছা, সে কথা পরে হবে, এখন শুধু মন শান্ত কর। যত পার জপ কর, স্তব পাঠ কর।
সুভদ্রা। কি জপ করব? কি স্তব করব, বলে দিন বাবা।
ভবতোষ। যা তোমার ভাল লাগে—হরিনাম, শিবনাম, দুর্গানাম, সত্যং শিবসুন্দরম। এই স্তবমালা বইখানি নিয়ে যাও, যে স্তব তোমার পছন্দ হয় আবৃত্তি ক’রো। ভগবানকে ব’লো—’দুঃখ—তাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্ত্বনা, দুঃখ যেন করিতে পারি জয়।’
সুভদ্রা। আবার কবে আসব বাবা?
ভবতোষ। তুমি ব্যস্ত হয়ো না, আমি তোমাকে ডেকে পাঠাব।
সুভদ্রার ছোট ভাই বাইরে অপেক্ষা করছিল, সে তার দিদিকে নিয়ে চলে গেল।
সুভদ্রার স্বামী অজয় বললে, আমার ব্যবস্থা কি করবেন ঠাকুর?
ভবতোষ। তোমার স্ত্রী আর তোমার একই ব্যবস্থা। তুমি পুরুষ মানুষ, সহজেই শোক দমন করতে পারবে, স্ত্রীকেও সান্ত্বনা দেবে। ওঁকে নিয়ে দিনকতক তীর্থভ্রমণ করে এস।
অজয়। ঠাকুর এত শোকের মধ্যেও আপনার কাছে স্বীকার করছি—আমি বড় অবিশ্বাসী, দয়াময় ভগবানে আমার আস্থা নেই। সুভদ্রাকে যা বললেন, তাতে আমি শান্তি পাব না।
নিখিল। আপনাদের কথার মধ্যে আমি কথা বলছি, অপরাধ নেবেন না ঠাকুর। এই অজয়কে আমি খুব জানি, এর অহেতুকী ভক্তি হবে এমন মনে হয় না। কর্মফল, জন্মান্তর, পরলোকে পুনর্মিলন, মঙ্গলময় ঈশ্বর—ইত্যাদি মামুলী প্রবোধবাক্যে অজয় সান্ত্বনা পাবে না। তোতা পাখির মতন স্তবপাঠেও এর কিছু হবে না।
ভবতোষ। দু—চার দিন যাক, এরা দুজনে একটু শান্ত হোক, তারপর আমি যথাসাধ্য প্রবোধ দেবার চেষ্টা করব।
নিখিল। ঠাকুর, আর একটা কথা নিবেদন করি। অজয়ের স্ত্রী বড়ই কাতর হয়েছে। সে যদি একটি বালগোপালের মূর্তি গড়িয়ে তার সেবা করে, তবে কেমন হয়? সন্তানহারা অনেক স্ত্রী এতে ভুলে থাকে দেখেছি। তাদের ধারণা হয়, শিশুকৃষ্ণের সেই বিগ্রহেই নিজের সন্তান লীন হয়ে আছে।
অজয়। না না নিখিলবাবু, ওসব চলবে না। সুভদ্রার আবার সন্তান হতে পারে, এখনকার শোকও ক্রমশ কমে যাবে, তখন ওই বালগোপাল একটি বোঝা হয়ে পড়বেন, লোকলজ্জায় তাঁকে ফেলাও চলবে না। যন্ত্রণা কমাবার জন্য এক—আধবার মরফীন দেওয়া চলে, কিন্তু একটি মানুষকে চিরকাল নেশাখোর করে রাখা কি উচিত?
ভবতোষ। অজয়ের কথা খুব ঠিক। নিখিল যা বললে তা ক্ষেত্রবিশেষে চলতে পারে, যেখানে শোক সইবার শক্তি নেই, যুক্তি বোঝবার মতন বুদ্ধি নেই, অন্য সন্তানের সম্ভাবনাও নেই। সুভদ্রার ওপর কোনও ভার চাপানো উচিত নয়। এখন তাকে নানা রকমে অন্যমনস্ক আর প্রফুল্ল রাখবার চেষ্টা করতে হবে।
নিখিল। আচ্ছা, অজয়ের স্ত্রী যদি মন্ত্র নিয়ে পূজাঅর্চায় মগ্ন থাকে তো কেমন হয়?
অজয়। তাতেও আমার আপত্তি আছে। সেদিন এক বনেদী বড়লোকের বাড়ি গিয়েছিলাম। তাঁর বৈঠকখানায় তিনটি বড় বড় অয়েল পেণ্টিং আছে, প্রত্যেকটিতে একজন মহিলা সেজেগুজে আসনে বসে পূজো করছেন। সামনে সোনারুপোর হরেক রকম পূজোর বাসন ঝকমক করছে, নানা উপচার সাজানো রয়েছে, সন্দেশের ওপর পেস্তাটি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। তাঁদের দৃষ্টি বিগ্রহের দিকে নয়, আগন্তুকের দিকে। যেন বলছেন, সবাই দেখ গো, আমরা পূজো করছি। খোঁজ নিয়ে জানলাম, একটি ছবি গৃহস্বামীর স্ত্রীর, আর দুটি তাঁর স্বর্গতা মা আর ঠাকুমার। এঁদের পূজো একটা উপলক্ষ্য মাত্র, আসল উদ্দেশ্য আড়ম্বর, যেমন আজকালকার সর্বজনীন।
ভবতোষ। সকলেই লোক দেখানো পূজা করে না। সুভদ্রার যদি নিজের আগ্রহ হয় তবে সে মন্ত্র নিয়ে পূজো করুক, কিংবা বিনা আড়ম্বরে উপাসনা করুক, কিন্তু তার জন্যে তাকে হুকুম করা চলবে না। হুজুক থেকেও তাকে বাঁচাতে হবে। কালক্রমে অনেকের নিষ্ঠা কমে যায়, তবু তারা চক্ষুলজ্জায় ঠাট বজায় রাখে। আমি একজনকে জানতুম, তিনি অহিংসার ব্রত নিয়ে নিরামিষাশী হয়েছিলেন। সাধুপুরুষ বলে তাঁর খ্যাতি হল। কিন্তু তিনি লোভ দমন করতে পারেন নি, একদিন হোটেলে লুকিয়ে খেতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন। নিখাকী মায়েরা বোধ হয় পুণ্যকর্ম ভেবেই উপবাস আরম্ভ করে, কিন্তু লোকের বাহবা শুনে শুনে তাদের কুবুদ্ধি হয় শেষটায় প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ভক্তি বা নিষ্ঠার অভাব, সন্ধ্যা—আহ্নিক পূজা—অর্চনা না করা, আমিষ ভোজন, কোনওটাই অপরাধ নয়। অনুষ্ঠানহীন নাস্তিকদের মধ্যেও সাধুপুরুষ আছেন। যার ভাল লাগে, সে চিরজীবন একনিষ্ঠ হয়ে অনুষ্ঠান পালন করতে পারে। যদি ভাল না লাগে, তবে যেদিন খুশি ছেড়ে দিলেও কিছুমাত্র দোষ হয় না। কিন্তু নিষ্ঠা হারিয়ে লোক দেখানো অনুষ্ঠান পালন মহাপাপ। সুভদ্রাকে শান্ত করতে হবে, কিন্তু কোনও রকম বন্ধনে পড়ে তার বুদ্ধি যেন মোহগ্রস্ত না হয়।
