পঞ্চপাণ্ডব বিন্ধ্যাবটীতে মৃগয়া করিতে গিয়াছেন। মধ্যম পাণ্ডব একটু বেশী চঞ্চল ও দুঃসাহসিক,তাই দল হইতে ছিটকাইয়া পথভ্রষ্ট হইয়া বনমধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন। সহসা একটি রাক্ষস তাঁহার সম্মুখে আসিয়া বলিল—’যুদ্ধং দেহি।’
রাক্ষসটি তরুণ, আষাঢ়ের সজলজলদ তুল্য তাহার কান্তি, কণ্ঠস্বরে বাল্যের মধুরতা যৌবনের গাম্ভীর্য এখনও দ্বন্দ্ব করিতেছে। তাহাকে দেখিয়া ভীমের মনে যুগপৎ বীর ও বাৎসল্য রসের সঞ্চার হইল। বলিলেন—’অয়ে বালক, তোমার সঙ্গে আমি লড়িব না, বরং তোমার পিতাকে ডাক।’
রাক্ষস ঘাড় নাড়িয়া বলিল—’চাতুরী চলিবে না। হয় যুদ্ধ কর নতুবা পরাজয় স্বীকার করিয়া আমার সঙ্গে চল। আমার জননী ব্রতপালন করিয়া অভুক্ত আছে আজ তাঁহার পারণ্য। একটি হৃষ্টপুষ্ট মানুষ আনিতে বলিয়াছেন। তোমাকে বেশ স্থূলকায় দেখিতেছি, তোমার দ্বারাই তাঁহার ক্ষুন্নিবৃত্তি হইবে।’
ভীমের কৌতূহল হইল। বলিলেন—’বেশ, চল।’
অনেক বনজঙ্গল গিরি নদী অতিক্রম করিয়া রাক্ষস ভীমকে একটি প্রকাণ্ড পর্বতগুহার দ্বারদেশে আনিল। ডাকিল—’মাতঃ, আহার্য উপস্থিত।’
ভিতর হইতে রাক্ষসী বলিল—’চিরজীবী হও বৎস, তোমাকে গর্ভে ধারণ করা সার্থক হইল।’
অতঃপর ভীম রোমাঞ্চিত হইয়া শুনিলেন রাক্ষসী তাহার এক চেটীকে বলিতেছে—’হঞ্জে, মনুষ্যটিকে বড় বড় করিয়া কর্তন কর। উত্তমরূপে সিদ্ধ হইলে কিঞ্চিৎ গন্ধক স্ফোটন দিয়া সন্তলন করিয়া নামাইও। বক্ষস্থল ও বাহুদ্বয় ছেলের জন্য রাখিও, পদদ্বয় তোমার, মুণ্ডটি আমি খাইব।’
রাক্ষস বলিল—’মাতঃ, একবার বাহিরে আসিয়া দেখ কেমন শিকার আনিয়াছি।’
রাক্ষসী বলিল—’ও আর দেখিব কি। সব মানুষই সমান, ভাল করিয়া রাঁধিলে কে ঋষি কে চণ্ডাল টের পাওয়া যায় না। আমার এখন সময় নাই, চুল বাঁধিতেছি।’
রাক্ষস বলিল—’চুল বাঁধা এখন থাকুক, একবার বাহিরে আসিয়া দেখ।’
পুত্রের নির্বন্ধাতিশয়ে রাক্ষসী গুহা হইতে নির্গত হইয়া বাহিরে আসিল। ভীমকে দেখিয়া চমকিত হইয়া জিহ্বা দংশন করিয়া কহিল—’ওমা, আর্যপুত্র যে! ছি ছি লজ্জায় মরি! ওরে উন্মাদ, ওরে ঘটোৎকচ, প্রণাম কর বেটা।’
ভীম বলিলেন—’কে ও, দেবী হিড়িম্বা? প্রিয়ে, আজ ধন্য আমি।’
রাক্ষসী কি খাইল ভাস তাহা লেখেন নাই।
১৩৩৬(১৯২৯)
প্রাচীন কথা
[এই সব ঘটনার ৭০-৮০% সত্য, ২০-৩০% মিথ্যা, অর্থাৎ স্মৃতিকথায় যতটা ভেজাল দেওয়া দস্তুর তার চাইতে বেশী নেই। নাম সবই কাল্পনিক।]
১। বনোয়ারী বাবু
স্থান—উত্তর বিহারের একটি ছোট শহর। কাল প্রায় সত্তর বৎসর আগে। বেলা তিনটে, আমাদের মিডল ইংলিশ অর্থাৎ মাইনর স্কুলের থার্ড ক্লাসে পাটীগণিত পড়ানো হচ্ছে। ক্লাসের ছেলেরা উসখুস ফিসফিস করছে দেখে বিধু মাষ্টার বললেন, কি হয়েছে রে?
তখন শিক্ষককে সার বলা রীতি ছিল না, মাষ্টার মশাই বলা হত। আমাদের মুখপাত্র কেষ্ট বলল, এইবার দুটি দিন মাষ্টার মশাই, সবাই চাদরাবাগ যাব।
-সেখানে কিজন্যে যাবি?
–কলকাতা থেকে একজন বাবু এসেছেন, তাঁর দাড়ি গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা। তাই আমরা দেখতে যাব। হেই মাষ্টার মশাই ছুটি দিন।
-চারটের সময় ছুটি হলে তার পরে তো যেতে পারিস।
-অনেক দূর যেতে হবে, বেলা হয়ে যাবে। শুনেছি রোজ বিকেলে তিনি রায়সাহেবদের বাড়ি দাবা খেলতে যান। দেরি করে গেলে দেখা হবে না।
বিধু মাষ্টার বললেন, বেশ, সাড়ে তিনটেয় ছুটি দেব। আমিও তোদের সঙ্গে যাব। দাড়িবাবুর কথা শুনেছি বটে।
চাদরাবাগ অনেক দুরে, আমরা প্রায় সাড়ে চারটের সময় বিভূতি বাবার বাড়ি পৌঁছুলুম, দাড়িবাবু সেখানেই উঠেছেন। বারান্দায় একটা দড়ির খাটিয়ায় বসে তিনি হুঁকো টানছিলেন। আমাদের দলটিকে দেখে তাঁর বোধ হয় একটু আমোদ হল, নিবিড় কালো দাড়ি গোঁফের তিমির ভেদ করে সাদা দাঁতে একটু হাসির ঝিলিক ফটে উঠল। সেকালে ব্রাহ্মরা প্রায় সকলেই দাড়ি রাখতেন, অব্রাহ্মদেরও অনেকের বড় বড় দাড়ি ছিল। কিন্তু সেসব দাড়ি এই নবাগত ভদ্রলোকের দাড়ির কাছে দাঁড়াতেই পারে না।
বিধু মাষ্টার নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, এই ছেলেরা আপনাকে দেখতে এসেছে মশাই, কিছুতেই ছাড়বে না, তাই আধ ঘণ্টা আগেই ক্লাস বন্ধ করতে হল।
দাড়িধারী ভদ্রলোকের নাম বনোয়ারী বাব। তিনি প্রসন্ন বদনে বললেন, বেশ বেশ, দেখবে বইকি, দেখাবার জন্যেই তো রেখেছি। যত ইচ্ছে হয় দেখ বাবারা, পয়সা দিতে হবে না।
দাড়িটি বনোয়ারী বাবুর গলায় কম্ফটরের মতন জড়ানো ছিল, এখন তিনি দাঁড়িয়ে উঠে আলুলায়িত করলেন। হাঁটর নীচে পর্যন্ত ঝুলে পড়ল।
সবিস্ময় আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে আমরা একযোগে বলে উঠলম, উ রে বাবা!
বনোয়ারী বব বললেন, কিছু জিজ্ঞাস্য আছে কি? টেনে দেখতে পার, আমার দাড়ি যাত্রার দলের মুনি-ঋষিদের মতন টেরিটিবাজারের নকল দাড়ি নয়। এই বলে তিনি দাড়ি ধরে বারকতক হেচকা টান দিলেন।
বিধু মাষ্টার বললেন, আচ্ছা বনোয়ারী বাবু, আপনার দাড়ির বর্তমান ঝুলে কত? সাড়ে তিন ফুট হবে কি?
-থুতনি থেকে পাক্কা বিশ গিরে, মানে পৌঁনে চার ফুট। পরশু আবদুল দরজী ফিতে দিয়ে মেপেছিল, তার ইচ্ছে একটা মলমলের খোল করে দেয়, যাতে দাড়িতে গরদা না লাগে। আমি তাতে রাজী হই নি।
—এতখানি গজাতে ক বছর লেগেছে?
–তা প্রায় দশ বছর। চব্বিশ বছর বয়সে কামানো বন্ধ করেছিলাম, এখন বয়স হল চৌত্রিশ।
