রাখাল একুট কুণ্ঠিত হয়ে বলল, শুধু এইটুকু জানি, ইনি এই প্রথম এদেশে এসেছেন, কিন্তু আপনি নতুন আসেন নি।
লম্বা সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন, দ্যাটস ফাইন! আর কি জানেন মিস্টার মুস্তৌফী?
—কাল রাত্রে আপনাদের ভাল ঘুম হয় নি।
—ভেরি ভেরি গুড! আর কি জানেন?
—আপনারা কাল লংকা খেয়েছিলেন।
—লংকা? ইউ মীন সীলোন, আইল্যাণ্ড অভ রাবণ?
—আজ্ঞে সে লংকা নয়। হিন্দী নাম মিরচাই, ইংরেজী নামটা মনে আসছে না। রেড অ্যাণ্ড গ্রীন পড—হাঁ হাঁ মনে পড়েছে, চিলি, রেড পেপার, ক্যাপসিকম, ভেরি হট স্পাইস।
লম্বা সাহেব তাঁর বন্ধুকে বললেন, ওহে ওআটসন, দেখছ তো, সায়েন্স অভ ডিডকশন এই বেঙ্গলী জেণ্টলম্যান ভালই জানেন। নাঃ, এদেশে শারলক হোমসের পসার হবে না।
ওআটসন বললেন, মুস্তৌফী বাবু, আপনি কি ইয়োগা প্রাকটিস করেন?
রাখাল বলল, যোগশাস্ত্র? না, তা আমার জানা নেই। আমার বাবা কবিরাজি করতেন—ইণ্ডিয়ান সিস্টেম অভ মেডিসিন, তাঁর কাছ থেকে আমি কিছু শিখেছি। সমস্ত লক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে কারণ অনুমান করা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।
ওআটসন প্রশ্ন করলেন, কাল রাত্রে আমাদের ভাল ঘুম হয় নি তা বুঝলেন কি করে?
শারলক হোমস বললেন, এলিমেণ্টারি ওআটসন, অতি সহজ। আমাদের মুখে মশার কামড়ের দাগ রয়েছে। আমরা মশারির মধ্যে শুই নি, পাংখাপুলারও মাঝরাত্রে পালিয়েছিল। কিন্তু আর দুটো বিষয় টের পেলেন কি করে?
রাখাল বলল, খুব সহজে। আপনি এসেই টুপি খুলে আমাকে ‘সার’ বললেন। অভিজ্ঞ সাহেবরা সামান্য নেটিভকে এত খাতির করে না। এতে বুঝলাম আপনি এই প্রথমবার বিলাত থেকে এসেছেন। ডক্টর ওআটসন টুপি খোলেন নি, আমাকে ‘বাবু’ বললেন, তাতে বুঝলাম ইনি পাক্কা সাহেব, নতুন আসেন নি, এদেশের দস্তুর জানেন।
—লংকা খাওয়া জানলেন কি করে?
—আপনার আঙুলে তামাকের রং ধরেছে, দেখেই বোঝা যায় আপনি খুব সিগারেট সিগার বা পাইপ টানেন। ডক্টর ওআটসনের মুখে সিগারেট ছিল, কিন্তু আপনার ছিল না। আপনি মাঝে মাঝে জিবের ডগা বার করছিলেন, অর্থাৎ জিব জ্বালা করছে। অনভ্যস্ত লোকে লংকা খেলে এইরকম হয়, সিগারেট টানতে পারে না। ডক্টর ওআটসন পাকা লোক, লংকায় ওঁর কিছু হয় নি।
হোমস হেসে বললেন। চমৎকার! এই ওআটসনের কথা শুনেই কাল রাত্রে হোটেলে মাল্লিগাটানি সূপ, চিকেন কারি, আর বেঙ্গল ক্লাব চাটনি খেয়েছিলাম, তিনটেই প্রচণ্ড ঝাল। আচ্ছা, আমাদের সঙ্গী এই মিস্টার খাঞ্জা সম্বন্ধে কিছু বলতে পারেন?
বাঞ্ছারামকে নিরীক্ষণ করে রাখাল বলল, ইনি তো পুলিসের লোক, চুলের ছাঁট, গোঁফের তা আর ড্রিলের কোট দেখলেই বোঝা যায়। তা ছাড়া থুতনির নীচে টুপির ফিতের দাগ রয়েছে।
বাঞ্ছারাম খাঞ্জা মাতৃভাষায় বললেন, হঃ তুমি খুব চালাক লোক বট হে। আর ভি কিছু শুনাও তো দেখি?
—পঞ্চকোটে বাড়ি। সম্প্রতি খুব মার খেয়েছিলেন, কাঁধে আর হাতে লাঠির চোট লেগেছিল। তার জড়ানো মির্জাপুরী লাঠি, তার ছাপ এখনও চামড়ার ওপর রয়েছে।
—আমার গায়ের দাগটাই দেখলে হে? শালা বলদেও পানওয়ালাকে কি পিটান পিটাঁইছি তার খবর রাখ মাস্টার?
হোমস বললেন, মুস্তৌফী, আওয়ার ফ্রেণ্ড খাঞ্জার মুখ দেখে বুঝেছি এঁর সম্বন্ধেও আপনার অনুমান ঠিক হয়েছে। আচ্ছা, আপনিও কি টোবাকো খাচ্ছিলেন? ভার্জিনিয়া টার্কিশ ম্যানিলা জাভা কিউবা কইম্বাটুর প্রভৃতি তেষট্টি রকম টোবাকো আমি ধোঁয়া শুঁখেই চিনতে পারি, কিন্তু আপনারটা বুঝতে পারছি না। স্মেলস গুড।
—এর নাম দা—কাটা তামাক, খুব সস্তা আর কড়া।
ড্যাকোটা? আমি যে শ্যাগ খাই তার চাইতে ভাল গন্ধ। কোথা পাওয়া যায়? আমি কিছু নিয়ে যেতে চাই।
—আমিই আপনাকে দু—তিন সের দিতে পারি, আমার বাড়ির তৈরি। কিন্তু পাইপে খাওয়া চলবে না, এইরকম হাবুলবাবুল চাই, হুক্কা, কিংবা গড়গড়া। তার কায়দা আপনাকে শিখতে হবে। বিউটিফুল সায়েণ্টিফিক ইনভেনশন সার, জলের মধ্যে দিয়ে ধোঁয়া রিফাইণ্ড হয়ে আসে, জিব জ্বালা করে না।
—আপনার কাছ থেকে শিখে নেব। আচ্ছা, এখন কাজের কথা হোক। আমাদের আসার উদ্দেশ্য বোধ হয় বুঝেছেন?
—আপনারও পুলিসের লোক?
—না, আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, তবে দরকার হলে পুলিসকে সাহায্য করি বটে। আর আমার বন্ধু এই ডক্টর ওআটসন আমার সহকর্মী।
—রূপচাঁদপুরের কুমার স্বর্ণেন্দ্রনারায়ণ আপনাকে পাঠিয়েছেন তো? আগেই বলে দিচ্ছি, আমি কিছু জানি না, আমার কাছে কোনও খবর পাবেন না।
হোমস বললেন, মিস্টার খাঞ্জা, আপনার সাহায্য দরকার হবে না, আপনি ওই গাড়িতে গিয়ে বসুন।
বাঞ্ছারাম চোখ পাকিয়ে রাখালকে বললেন, ও মশয়, বেশী ফড়ফড় ক’রো না, তোমাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, সাহেবদের কাছে যা জবানবন্দি করবে তাতে তুমিই ফাঁদে পড়বে।
বাঞ্ছারাম চলে গেলে হোমস বললেন, মুস্তৌফী, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনার কিছুমাত্র অনিষ্ট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার চেষ্টার ফলে আপনার ভালই হবে।
রাখাল বলল, কুমার বাহাদুর আপনার মারফত আমাকে ঘুষ দিয়ে সন্ধান নিতে চান নাকি?
—তিনি ভাল মন্দ যে কোনও উপায়ে কার্যসিদ্ধি করতে চান, কিন্তু আমার পলিসি তা নয়। তাঁর স্বার্থ আর আপনার মঙ্গল দুইই আমি সাধন করতে চাই। আমি জানি, আপনি একজন সরলস্বভাব শিক্ষিত সৎলোক, আপনার উপর অনেক পীড়ন হয়েছে। আমি আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী। আপনাকে কিছুই বলতে হবে না, এদেশে আসবার আগে যা শুনেছি এবং এখানে এসে অনুসন্ধান করে যা জেনেছি, সবই আমি বলে যাচ্ছি, যদি কোথাও ভুল হয়, আপনি জানাবেন।
