—আচ্ছা যদি ন কোটি উদযোগী কর্মবীর ধনপতির আবির্ভাব হয় তা হলেতোমার আশা মিটবে?
—আপনি পরিহাস করছেন প্রভু। ন কোটি ব্যবসাদার কর্মবীরের স্থান কোথায়? কার ধন নিয়ে তাঁরা ধনপতি হবেন? অরণ্যের চার আনা পশু যদি বাঘ হয় আর বাকী বারো আনা যদি হরিণ হয়, তবে আগে হরিণরা লোপ পাবে তার পর বাঘরা না খেয়ে মরবে। আমার নিবেদনটি শুনুন। ন কোটি মুক্তাত্মা সন্ন্যাসী, বা ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, বা রাজনীতিজ্ঞ সুশাসক হলে চলবে না। আর ন কোটি ব্যবসায়ী তো উপদ্রব স্বরূপ। নানারকম সাধারণ সচ্চরিত্র কর্মীরই দরকার—চাষী কারিগর শিল্পী বাস্তুকার যন্ত্রী বিজ্ঞানী শিক্ষক বিচারক পরিচালক কেরানী ইত্যাদি। তা ছাড়া অল্প গুটিকতক কলাবিৎ অর্থাৎ লিখিয়ে আঁকিয়ে গাইয়ে বাজিয়ে নাচিয়েও চাই। লোকোত্তর পুরুষ কোটিতে এক—আধটি হলেই ঢের।
—তুমি যে রকম চাচ্ছ সেরকম কাজের লোক তো দেশে আছেই।
—কিন্তু তাদের মধ্যে যে বিস্তর মূর্খ আর দুর্বৃত্ত লোক আছে, তারাই মঙ্গল হতে দিচ্ছে না।
—ওহে নিধিরাম, ব্যস্ত হয়ো না। তোমার দেশে যত মূর্খ আর দুর্বৃত্ত আছে তারা খেয়োখেয়ি মারামারি করে আপনিই ধ্বংস হয়ে যাবে, তার পর কালক্রমে সুবুদ্ধি সৎপুরুষের আবির্ভাব হবে।
—তবেই হয়েছে। আপনি অনন্তকাল এক্সপেরিমেণ্ট করতে পারেন, কিন্তু দেশের লোকের অত ধৈর্য নেই, তারা নানা দলে বিভক্ত হয়ে ছিন্ন ভিন্ন ভাল মন্দ উপায় খুঁজছে। আপনি ইচ্ছা করলেই তাদের সুপথে চালাতে পারেন।
—আমার ইচ্ছা—অনিচ্ছা নেই। সৃষ্টি স্থিতি আর লয় ঘড়ির কাঁটার মতন যথানিয়মে হচ্ছে, জাগতিক ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করি না।
—ভগবান, বেশী কিছু তো চাচ্ছি না, লোকে যাতে অংসযমী উচ্ছৃঙ্খল আর সমাজদ্রোহী না হয় সেই ব্যবস্থা করুন।
—দেখ নিধিরাম, সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থার উদ্দেশ্যে তোমার দেশে চাতুর্বর্ণ্য স্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু এখন তার পরিণাম কি হয়েছে দেখছ তো? তুমি যে রকম চাচ্ছ তা পাবে ইতর প্রাণীর মধ্যে, তারা কখনও স্বজাতির ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট হয় না। কিন্তু মানুষ চিরকালই মতলবে চলে।
—প্রভু, যদি একজন জবরদস্ত অবতার পাঠিয়ে দেন তবে তিনি তো অবলীলাক্রমে সাধুদের পরিত্রাণ দুষ্কৃতদের বিনাশ আর ধর্মসংস্থাপন করতে পারবেন।
—তুমি কি মনে কর সিভিলিয়ানদের মতন একদল অবতার আমি পুষে রেখেছি আর তোমাদের দরকার হলেই পাঠাব? মানুষ মাত্রেই অবতার, কেউ কম কেউ বেশী। জনসমাজের অল্পাধিক মঙ্গল যে করতে পারে সেই অবতার। তোমারও সেই শক্তি আছে। যদি ইচ্ছা কর তুমি আবার জন্মগ্রহণ করে তোমার জাতভাইদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে পার।
—আমার কতটুকু ক্ষমতা প্রভু? আমার কথা শুনবেই বা কে?
—বুড়োরা না শুনুক, তারা আর কদিনই বা বাঁচবে। ছেলেরা শুনতে পারে, তারা এখনও ঝানু হয়ে যায় নি।
—হা ভগবান, আপনি দেখছি কোনও খবরই রাখেন না।
—শোনো নিধিরাম। ছেলেরা বুড়োদের কথা না শুনুক, সমবয়সীদের কথা শুনতে পারে। তুমি পৃথিবীতে ফিরে যাও, জাতিস্মর না হলেও তোমার সদিচ্ছার সংস্কার থাকবে। বালক কিশোর আর যুবকদের তুমি সুমন্ত্রণা দিও।
—আমি একটি মন্ত্রণাই জানি— আগে বিনয় ও শিক্ষা তারপর কর্মপথ।
—বেশ তো, ওই মন্ত্রণাই দিও।
—আমার কথায় কেউ যদি কান না দেয়?
—তোমার চাইতে যাঁরা ঢের বড় অবতার তাঁদের কথাও সকলে শোনে নি। তুমি যথাসাধ্য চেষ্টা ক’রো, তাতেই তোমার জন্ম সার্থক হবে। এক বারে কিছু করতে না পারলে বার বার অবতরণ ক’রো। যদি অনন্তকালেও কিছু করতে না পার তা হলেও বিশ্ব—ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষতি হবে না।
১৩৬২ (১৯৫৫)
নিরামিষাশী বাঘ
অনেক বৎসর আগেকার কথা, তখন আলীপুর জন্তু বাগানের কর্তা ডাক্তার যোগীন মুখুজ্যে। যোগীন আমার বন্ধু। একদিন টেলিফোনে বললে, ওহে, বড় বড় একজোড়া তিব্বতী পাণ্ডা এসেছে, খাসা জানোয়ার, দেখলেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। সাদা গা, কালো পা, কাজলপরা চোখ, ভাল্লুককে টেনে লম্বা করলে যেমন হয় সেইরকম চেহারা। তোমারই মতন নিরামিষ খায়। দুদিন পরেই হামবুর্গ জু—তে চলে যাবে, দেখতে চাও তো কাল বিকেলে এস।
পরদিন বিকালে যোগীনের কাছে গেলুম। পাণ্ডা, কাঙ্গারু, হিপ্পো, কালো রাজহাঁস, সাদা ময়ূর প্রভৃতি সব রকম দুর্লভ প্রাণী দেখা হল। তারপর বাঘ সিংগির খাওয়া দেখছি এমন সময় নজরে পড়ল একটা বাঘ ভাল করে খাচ্ছে না, যেন অরুচি হয়েছে। মাংসের চার দিকে তিন পায়ে খুঁড়িয়ে বেড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে একটু কামড় দিচ্ছে। যোগীনকে বললুম, আহা, বেচারার একটা পা জখম হয়েছে, খানিকটা মাংস কেউ যেন খাবলে নিয়েছে। গুলি লেগেছিল নাকি?
যোগীন বললে, গুলি লাগে নি। বাঘটির নাম রামখেলাওন, এর ইতিহাস বড় করুণ। পাশের খাঁচার বাঘিনীটিকে দেখ।
পাশের খাঁচায় দেখলুম একটি খোঁড়া বাঘিনী রয়েছে। এরও অরুচি, কিন্তু তবুও কিছু খাচ্ছে। প্রশ্ন করলুম দুটোই খোঁড়া দেখছি, কি করে এমন হল?
যোগীন বললে, এই বাঘিনীটির নাম রামপিয়ারী। রামখেলাওন আর রামপিয়ারী দুটোই বছর—দুই আগে গয়া জেলার গড়বড়িয়ার জঙ্গলে ধরা পড়ে। এদের দস্তুর মত মন্ত্র পড়িয়ে বিবাহ হয়েছিল, কিন্তু মনের মিল হল না, তাই আলাদা খাঁচায় রাখতে হয়েছে।
