—লাভ কোথায়, এখনও ঘর থেকে গচ্চা দিতে হয়।
—তবে বলি শোন। প্রতি মাসে আমি পাঁচ—ছটা কবিতা আনব, প্রত্যেকটি ছাপবার জন্যে পাঁচ টাকা হিসেবে দেব। তাতে পঁচিশ—তিরিশ টাকা পাবে। রাজী আছ?
তরণী সেন বলল, তা মন্দ কি, কাগজের খরচটা তো উঠবে। টাকা পেলে প্রতি সংখ্যায় দশটা কবিতা ছাপতে রাজী আছি। কিন্তু দেখো ভাই, নিতান্ত রাবিশ না হয়।
—আরে না না। শংকরী দেবীর নামে ছাপা হবে বটে, কিন্তু বেশীর ভাগ আমার বউদিই লিখবেন। তাঁর হাত খুব পাকা।
নিস্যন্দিনী পত্রিকায় শংকরী দেবীর নামে কবিতা ছাপা হতে লাগল। তা দেখে ধূর্জটির মনে কিঞ্চিত কৌতূক আর করুণার উদয় হল। সে তার স্ত্রীকে বলল, বেশ তো, শখ যখন হয়েছে লিখতে থাক। এখন বড্ড কাঁচা, লিখতে লিখতে হাত পাকতে পারে। চাও তো আমি সংশোধন করে দিতে পারি। শংকরী বলল, না, না, তোমায় কিছু করতে হবে না, যা পারি আমিই লিখব। বদনাম হয় তো আমারই হবে, তোমার ক্ষতি হবে না।
শংকরী দেবীর কবিতা ক্রমশ কাঁচা থেকে পাকা, ঠাণ্ডা থেকে গরম এবং গরম থেকে গরমতর হতে লাগল। পাঠকরা বলল, কি চমৎকার! একজন আধুনিক সমালোচক লিখলেন—এক অনাস্বাদিতপূর্ব রসঘন কাব্যমধুরিমা, নারীর অন্তর্নিহিত ফলগুধারার স্বতঃউৎসারিত উৎস, এর তুলনা নেই। নিস্যন্দিনী পত্রিকার কাটতি হু হু করে বেড়ে গেল। তরণী সেনকে রমেশ বলল, আর টাকা দিচ্ছি না, এখন থেকে তুমিই দেবে, প্রতি কবিতায় দশ টাকা। ‘প্রগামিনী’র সম্পাদক অনুকূল চৌধুরী তাই দেবেন বলেছেন। তরণী বলল, আচ্ছা, আচ্ছা, শংকরী দেবী টাকা না হয় নাই দেবেন। কিন্তু দক্ষিণা দেবার সার্মথ্য এখনও আমাদের হয় নি, আরও কিছু দিন সবুর করতে হবে।
উপেন দত্ত বলল, শংকরী দেবীর কবিতা পড়েছি বলে মনে হয় না। আপিসের যা খাটুনি, সাহিত্য চর্চার ফুরসতই নেই। এই আড্ডায় এসে পাঁচ জনের মুখে যা একটু শুনতে পাই। আচ্ছা যতীশ—দা, তোমার কাছে নিস্যন্দিনী নেই?
যতীশ বলল, আমি পয়সা দিয়ে রাবিশ কিনি না।
ভূপতি বলল, শংকরী দেবীর কবিতা শুনতে চাও? কিছু কিছু আমার মনে আছে, বলছি শোন। একটা হচ্ছে এই রকম—
আমি চিনি গো চিনি তোমারে,
তুমি থাক মহাপ্রাচীরের এপারে।
কি মিষ্টি তোমার আধো আধো বুলি,
রুশকে বল লুশ, দু টাকাকে তু লুপি।
ওগো লাল চীনের জঙ্গী জওয়ান,
তোমার নয়ন বাঁকা, বর্ণ স্বর্ণচাঁপা,
সিল্কমসৃণ শ্যাময় লেদার তোমার চামড়া,
ওই নির্লোম বুকে ঠাঁই চাই ঠাঁই চাই।
আর একটা বলি শোন—
ও বিদেশী পাখতুনিস্তানবাসী,
তাগড়া জাক্কাখেল, আমি তোমায় ভালবাসি।
নর্ডিক নীল তোমার সূর্মা পরা চোখ,
সেমেটিক নাকের নীচে মোটা ছাঁটা গোঁফ।
তোমার লোমজঙ্গল বুকে টেনে নাও আমাকে,
ক্র্যাংক—শাফটের মতন দুই হাতে জাপটে ধর,
মড়মড়িয়ে ভেঙে দাও আমার পাঁজরা,
পিষে ফেল, পিষে ফেল।
এই সব কবিতা নিস্যন্দিনী পত্রিকায় দেদার ছাপা হতে লাগল। ‘কাঙ্ক্ষার ঝংকার’ নাম দিয়ে শংকরীর একটা কবিতাসংগ্রহ প্রকাশিত হল, তিন মাসের মধ্যেই তিনটে সংস্করণ ফুরিয়ে গেল। ধূর্জটি নিজের রচনা নিয়েই মেতে থাকত, তার বউ কি লিখছে, তা পড়ে লোকে কি বলছে, এ সব খবর রাখত না। একদিন তার এক সাহিত্যিক বন্ধু একখানা কাঙ্ক্ষার ঝংকার দেখিয়ে বলল, ওহে ধূর্জটি, এই শংকরী দেবী তোমারই গৃহিণী তো? ওঃ, ভদ্রমহিলা কি সব অদ্ভুত কবিতা লিখছেন, রেগুলার হট স্টফ। পড়ে তোমার মনে একটু ইয়ে হয় না? আমাদের সাইকোলজিস্ট প্রফেসার ভড় বলেছিলেন, এ হচ্ছে উদ্দাম লিবিডো।
ধূর্জটির ভাবনা হল। স্ত্রীর কাছ থেকে তার কবিতার বই চেয়ে নিয়ে খুব মন দিয়ে পড়ল। তার মেজাজ বিগড়ে গেল। শংকরীকে বলল, এ সব কি ছাই ভস্ম লেখা হচ্ছে? লোকে যে ছি ছি করছে।
শংকরী বলল, করুক গে ছি ছি, খুব বিক্রি তো হচ্ছে। আরও একখানা বই ছাপবার জন্যে প্রেসে দিয়েছি।
মাথা নেড়ে ধূর্জটি বলল, ওসব চলবে না বলছি।
—বা রে মজা! তুমি লিখলে দোষ হয় না, আর আমার বেলা দোষ! ওগো সর্বনাশী, আমি ভালবাসি তোমার ঠোঁটের ওই মোনালিসা হাসি’—তুমি এই সব ছাই ভস্ম লেখ কেন?
—আমার সঙ্গে তোমার তুলনা। কাল্পনিক রমণীর ওপর কবিতা লিখলে পুরুষের দোষ হয় না, কিন্তু মেয়েদের সে রকম লেখা অতি গর্হিত।
—বেশ, তুমি কবিতা লেখা বন্ধ কর, তোমার সব বই পুড়িয়ে ফেল, আমিও তাই করব।
ধূর্জটি রেগে আগুন হয়ে বেরিয়ে গেল।
উপেন দত্ত বলল, যত নষ্টের গোড়া আপনার শালী বিশাখা। খামকা এই ঝগড়া বাঁধিয়ে তার কি লাভ হল?
ভূপতি বলল, হুঁ, বিশাখার স্বামী নরেশও তাই বলেছে, খুব ধমকও দিয়েছে। তার পর শোন। শংকরীর কাছে সব কথা শুনে বিশাখা তার সখীর হয়ে লড়তে গেল। ধূর্জটিকে বলল, আপনার বুদ্ধি—সুদ্ধি লোপ পেয়েছে নাকি? ঘরে অমন সুন্দরী বউ থাকতে কোথাকার কে অচিন প্রিয়ার উদ্দেশ্যে আপনি কবিতা লেখেন কোন আক্কেলে? তাতে শংকরীর রাগ হবে না? শোধ তোলবার জন্যে সেও যদি ওই রকম লেখে তাতে অন্যায়টা কি মশাই?
ধূর্জটি বলল, তা বলে চীনেম্যান আর কাবলীওয়ালার উদ্দেশ্যে প্রেমের কবিতা লিখবে?
—আচ্ছা, আচ্ছা, এখন থেকে না হয় বাঙালী তরুণদের উদ্দেশ্যেই লিখবে। কিন্তু তার চাইতে ভাল—আপনি আজ থেকে নিজের গিন্নীর নামে কবিতা লিখুন, যেমন প্রথম প্রথম লিখতেন। আর সেও আপনার নামে লিখুক। এক বাড়িতে যখন বাস করছেন, দুইজনেই যখন কবি, তখন রেসিপ্রোসিটি না হলে চলবে কেন?
