–এখানে দেখবার বিশেষ কিছু নেই। আপনি উঠেছেন কোথায়?
–তমিস্রা নাগকে চেনেন? তাঁদেরই বাড়িতে আছি।
–তমিস্রাকে খুব চিনি। সেই তো আপনাকে দেখাতে পারবে, আমার চাইতে ঢের বেশী দিন এখানে বাস করছে, সব খবরও রাখে। আমার সময়ও কম, বেলা দশটার সময় স্কুলে যেতে হয়।
–সকালে ঘণ্টা খানিক সময় হবে না?
–আচ্ছা, চেষ্টা করব, কিন্তু সব দিন আপনার সঙ্গে যেতে পারব। কাল সকালে আসতে পারেন।
আরও কিছুক্ষণ থেকে কাঞ্চন চলে গেল। দুপুর বেলা ডায়ারিতে লিখল-মিস শম্পা সেন, তোমাকে ঠিক বুঝতে পারছি না। এখানে আসবার আগে ভাল করেই খোঁজ নিয়েছিলুম, সবাই বলেছে এখনও তুমি কারও সঙ্গে প্রেমে পড় নি। আমি এখানে এসে দেরি না করে তোমার কাছে গিয়েছি, এতে তোমার খুব ফ্ল্যাটার্ড আর রীতিমত উৎফুল্ল হবার কথা। তুমি সুন্দরী, বিদুষীও বটে, কিন্তু আমার চাইতে তোমার মুল্য টের কম। রুপে গুণে বিত্তে আমার মতন পাত্র তুমি কটা পাবে? মনে হচ্ছে তুমি একটু অহংকেরে, মানুষ চেনবার শক্তিও তোমার কম।
কাঞ্চন প্রায় প্রতিদিন সকালে শম্পার সঙ্গে আর বিকালে তমিস্রার সঙ্গে বেড়াতে লাগল। গণেশমূল্ডায় একটি মাত্র বড় রাস্তা, তারই ওপর তমিস্রাদের বাড়ি। একটু এগিয়ে গেলেই গোটাকতক দোকান পড়ে, তার মধ্যে বড় হচ্ছে রামসেবক পাঁড়ের মদীখানা আর কহেলিরাম বজাজের কাপড়ের দোকান। এইসব দোকানের সামনে দিয়েই কাঞ্চন আর তার সঙ্গিনী শম্পা বা তমিস্রার যাতায়াতের পথ। দোকানদাররা খুব নিরীক্ষণ করে ওদের দেখে।
একদিন বেড়িয়ে ফেরবার সময় তমিস্রা রামসেবকের দোকানে এসে বলল পাঁড়েজী, এই ফদটা নাও, সব জিনিস কাল পাঠিয়ে দিও। চিনিতে যেন পিপড়ে না থাকে।
রামসেবক বলল, আপনি কিছু ভাববেন না দিদিমণি, সব খাঁটী মাল দিব। এই বাসাহেবকে তো চিনছি না, আপনাদের মেহমান (অতিথি)?
-হাঁ, ইনি এখানে বেড়াতে এসেছেন।
–রাম রাম বাবজী। আমার কাছে সব ভাল ভাল জিনিস পাবেন, মহীন বাসমতী চাউল, খাঁটী ঘিউ, পোলাওএর সব মসালা, কাশ্মীরী জাফরান, পিস্তা বাদাম কিশমিশ। আসেটিলীন বাত্তি ভি আমি রাখি।
কাঞ্চন বলল, ও সবের দরকার আমার নেই।
-না হুজুর, ভোজের দরকার তো হতে পারে, তখন আমার বাত ইয়াদ রাখবেন।
দোকান থেকে বেরিয়ে কাঞ্চন বলল, লোকটা আমাকে ভোজন বিলাসী ঠাউরেছে।
তমিস্রা হেসে বলল, তা নয়। ডিকেন্স-এর সারা গ্যাম্পকে মনে আছে? তার পেশা ধাইগিরি আর রোগী আগলানো। সদ্য বিবাহিত বর-কনে গির্জা থেকে বেরচ্ছে দেখলেই সারা গ্যাম্প তাদের হাতে নিজের একটা কার্ড দিত। তার মানে, প্রসবের সময় আমাকে খবর দেবেন। গণেশমণ্ডর দোকানদাররাও সেই রকম। কুমারী মেয়ে কোনও জোয়ান পুরুষের সঙ্গে বেড়াচ্ছে দেখলেই মনে করে বিবাহ আসন্ন, তাই নিজের আজি আগে থাকতেই জানিয়ে রাখে।
-এদের আক্কেল কিছুমাত্র নেই। আমার সঙ্গে আপনাকে দেখে
-অমন ভুল বোঝা ওদের উচিত হয় নি, তাই না? কি জানেন, এরা হচ্ছে ব্যবসাদার, সরপ কুরপ গ্রাহ্য করে না, শুধু লাভ-লোকসান বোঝে। আপনি যে মস্ত ধনী লোক তা এরা জানে না। ভেবেছে, আমার মায়ের বাড়ি আছে, অন্য সম্পত্তিও আছে, আমি একমাত্র সন্তান, রোজগারও করি, অতএব বিশ্রী হলেও আমি সুপাত্রী।
–এরা অতি অসভ্য, এদের ভুল ভেঙে দেওয়া দরকার।
–আপনি শম্পাকে নিয়ে ওদের দোকানে গেলেই ভুল ভাঙবে।
পরদিন সকালে শম্পার সঙ্গে যেতে যেতে কাঞ্চন বলল, আমার এক জোড়া সকস দরকার।
শম্পা বলল, চলন কহেলিরামের দোকানে।
কহেলিরাম সসম্রমে বলল, নমস্তে বাসাহেব, আসেন সেন মিসিবাবা। মোজ। চাহি? নাইলন, সিল্ক, পশমী, সূতী–
কাঞ্চন বলল, দশ ইঞ্চ গ্রে উলন একজোড়া দাও।
মোজা দিয়ে কহেলিরাম বলল, যা দরকার হবে সব এখানে পাবেন হুজুর। হাওআই বশশার্ট আছে, লিবার্টি আছে, ট্রাউজার ভি
আছে। জর্জেট ভয়েল নাইলন শাড়ি আছে, বনারসী ভি আমি রাখি, ভেলভোট সাটিন কিংখাব ভি। ভাল ভাল বিলাতী এসে ভি রাখি। দেখবেন হুজুর?
দোকান থেকে বেরিয়ে কাঞ্চন সহাস্যে বলল, বর-কনের পোশাক সবই আছে, এরা একবারে স্থির করে ফেলেছে দেখছি।
বিকালে কাঞ্চনের সঙ্গে তমিস্রী রামসেবকের দোকানে এসে এক বাণ্ডিল বাতি কিনল। রামসেবক বলল, দিদিমণি, একঠো ছোকরা চাকর রাখবেন? খুব কাজের লোক, আপনার বাজার করবে, চা বানাবে, বিছানা করবে, বাসাহেবের জুতি ভি বশ করবে। দরমাহা বহত কম, দশ টাকা দিবেন। আমি ওর জামিন থাকব। এ মালাল, ইধর আ।
তমিস্রার একটা চাকরের দরকার ছিল, মুন্নালালকে পেয়ে খুশী হল। বয়স আন্দাজ ষোল, খুব চালাক আর কাজের লোক।
রাত্রে কাঞ্চন তার ডায়ারিতে লিখল, শম্পা, তোমার কি উচ্চাশা নেই, নিজের ভাল মন্দ বোঝবার শক্তি নেই? আমাকে তো কদিন ধরে দেখলে, কিন্তু তোমার তরফ থেকে কোনও সাড়া পাচ্ছি না কেন? তমিস্রা তো আমাকে খুশী করবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। যাই হক, আর দুদিন দেখে তোমার সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করব।
তিন দিন পরে বিকালে তমিস্রা চায়ের ট্রে আনল দেখে কাঞ্চন বলল, আপনি আনলেন কেন, মুন্নালাল কোথায়?
তমিস্রা সহাস্যে বলল, সে শম্পার বাড়ি বদলী হয়েছে।
–আপনিই তাকে পাঠিয়েছেন?
–আমি নয়, তার আসল মনিব রামসেবক পাঁড়ে, সেই মাকে ট্রান্সফার করেছে, এখানে তাকে রেখে আর লাভ নেই।
–কিছুই বুঝলাম না।
-আপনি একবারে চক্ষুকর্ণহীন। শম্পা, আমি, আর আপনি এই তিনজনকে নিয়ে গণেশমুণ্ডার বাজারে কি তুমল কাণ্ড হচ্ছে তার কোনও খবরই রাখেন না। শুনন।—মন্নালাল হচ্ছে রামসেবকের পাই, গুপ্তচর। ওর ডিউটি ছিল আপনার আর আমার প্রেম কতটা অগ্রসর হচ্ছে তার দৈনিক রিপোর্ট দেওয়া। যখন সে জানাল যে কুছ ভি নহি, নথিং ডুইং, তখন তার মনিব তাকে শম্পার বাড়ি পাঠাল, শম্পা আর আপনার ওপর নজর রাখবার জন্যে।
