আড্ডারম্ভে গোপালবাবু বললেন, ওহে সিদ্ধিনাথ, তুমি ডক্টরেট পেয়েছ তাতে আমরা সবাই খুশী হয়েছি। সম্মান তোমার বিদ্যের তুলনায় অবশ্য কিছুই নয়, তবে শোনায় ভাল—ডক্টর সিদ্ধিনাথ ভট্টাচার্জি। নমিতা তোমাকে আর অশ্রদ্ধা করতে পারবে না।
নমিতা বললেন, ডক্টর একটা নিতান্ত বাজে উপাধি, গণ্ডা গণ্ডা ডক্টর পথেঘাটে গড়াগাড়ি খাচ্ছে। আমি ও’কে একটি ভাল উপাধি দিচ্ছি—বকবক্তা।
অসিতা বলল, মানে কি দিদি?
—মানে খুব সোজা। যে বকে সে বক্তা, আর যে বকবক করে সে বকবক্তা।
সিদ্ধিনাথ বললেন, থ্যাংক ইউ নমিতা দেবী, আপনার প্রদত্ত উপাধিটির মর্যাদা রাখতে আমি সর্বদাই চেষ্টা করব।
নমিতা বললেন, তবে আর সময় নষ্ট করেন কেন, আপনার বকবক্তৃতা এখনই শুরু করুন না।
—কোন বিষয় শুনতে চান? শংকরের অদ্বৈতবাদ, মার্কসের দ্বান্দ্বিক জড়বাদ, শরীরতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব না পরলোকতত্ত্ব?
গোপালবাবু বললেন, ওসব নীরস তত্ত্ব শুনতে চাই না। প্রেমের কথা যদি তোমার কিছু জানা থাকে তো তাই বল।
—হাড়ে হাড়ে জানা আছে। আমি নিজেই একবার বিশ্রী রকম প্রেমে পড়েছিলুম।
নমিতা বললেন, আস্পর্ধা কম নয়! বাড়িতে পাহারাওয়ালী গিন্নী থাকতে প্রেমে পড়লেন কোন আক্কেলে? বলতে লজ্জা হয় না?
—মানুষের যা স্বাভাবিক ধর্ম তা স্বীকার করতে লজ্জা হবে কেন। আপনার মুখেই তো শুনেছি যে অসিতার বউভাতের ভোজে আপনি গবগব করে চার গণ্ডা ভেটকি মাছের ফ্রাই খেয়েছিলেন। তার জন্যে তো আপনাকে রাক্কুসী কি মেছো পেতনী বলছি না।
গোপালবাবু বললেন, আঃ ঝগড়া কর কেন। নমিতা, সিধুকে বলতে চাও, তোমার মন্তব্য শেষে ক’রো।
সিদ্ধিনাথ বলতে লাগলেন।—ব্যাপারটা ঘটেছিল বিবাহের আগে, গিন্নী থাকতে প্রেম হবার জো কি! তখন বয়স বাইশ—তেইশ, প্রোস্টগ্রাজুয়েটে পড়ি, বাবা মা দুজনেই বর্তমান। ওহে রমেশ ডাক্তার, তোমাদের শাস্ত্রে এই কথা বলে তো—কোনও দেশে একটা নতুন ব্যাধি যদি আসে তবে প্রথম প্রথম তা মারাত্মক হয়, কিন্তু দু—এক শ বছর পরে তার প্রকোপ অনেক কমে যায়?
রমেশ বলল, আজ্ঞে হাঁ, কোনও কোনও রোগের বেলা তাই হয় বটে।
—প্রেমও সেই রকম ব্যাধি। এর তিন দশা আছে। প্রাইমারি স্টেজে প্রেম হল নাইণ্টি পারসেণ্ট লালসা, টেন পারসেণ্ট ভালবাসা। সেকণ্ডারি স্টেজে হাফ অ্যাণ্ড হাফ। টারশারিতে প্রায় সবটাই ভালবাসা, নামমাত্র লালসা। পুরাকালে পূর্বরাগ অর্থাৎ প্রেমের প্রথম আক্রমণ অতি সাংঘাতিক হত। কাদম্বরীতে বানভট্ট লিখেছেন—মহাশ্বেতার প্রেমে পড়ে পুণ্ডরীক হার্ট ফেল করে মারা যায়। আরব্য উপন্যাসের অনেক নায়ক—নায়িকা প্রেমে শয্যাশায়ী হত। অমন যে জবরদস্ত রাজর্ষি আরংজেব বাদশা, তিনিও প্রথম যৌবনে গোলকণ্ডার এক নবাবনন্দিনীকে দেখে মরণাপন্ন হয়েছিলেন। আজকাল এরকম বড় একটা দেখা যায় না, কারণ মেয়ে পুরুষ সবাই খুব হিসেবী হয়েছে, তা ছাড়া দেদার প্রেমের গল্প প’ড়ে আর সিনেমার ছবি দেখে খানিকটা ইমিউনিটিও এসেছে। কিন্তু দৈবক্রমে আমি যে প্রেমের কবলে পড়েছিলুম তা সেই সেকেলে ভিরুলেণ্ট টাইপের। তবে বেশী ভুগতে হয়নি, পাঁচ দিনের মধ্যেই সেরে উঠি।
নমিতা বললেন, কিসে সারল, পেনিসিলিন না খ্যাপা কুকুরের ইনজেকশনে?
—ওষুধের কাজ নয়। গুরুর কৃপায় সেরেছিল।
—আপনি তো পাষণ্ড লোক, আপনার আবার গুরু কে?
—যিনি জ্ঞানদাতা বা শিক্ষাদাতা তিনিই গুরু। সম্প্রতি আমার দুটি গুরু জুটেছে—আমার ছাত্র পরাশর হোড়, আর এ পাড়ার বকাটে ছোকরা গুলচাঁদ। পরাশরের কাছে কবিতা রচনা শিখছি, আর গুলচাঁদের কাছে বাইসিকল চড়া।
অসিতা বলল, সার, আপনি তো বলতেন যে কাব্যচর্চা আর গাঁজা খাওয়া দুই সমান, তবে শিখছেন কেন? কিছু লিখছেন নাকি?
—রাম বল। লেখবার জন্যে শিখছি, শুধু কবিতা লেখার প্যাঁচটা জানতে চাই। আর বাইসিকল শিখছি ট্রাম—বাসের ভাড়া বাঁচবার জন্যে। দেখ অসিতা, কবিতা লেখা অতি সোজা কাজ, মাস খানিক প্র্যাকটিস করলে তুমিও পারবে, হয়তো তোমার দিদিও বছর খানিক চেষ্টা করলে পারবেন। কেন যে লোকে কবিদের খাতির করে—
নমিতা বললেন, বাজে কথা রাখুন। কার সঙ্গে প্রেম হয়েছিল? অত চট করে সারলই বা কি করে? প্রতিদ্বন্দ্বী আপনাকে ঠেঙিয়েছিল নাকি?
—ধৈর্য ধরুন, যথাক্রমে সবই শুনবেন। প্রেমে পড়ার চার—পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই কাবু হয়েছিলুম। আহারে রুচি নেই, মাথা টিপটিপ করে, বুক ঢিপঢিপ করে, ঘুম মোটেই হয় না, লেখাপড়া চুলোয় গেল, চব্বিশ ঘণ্টা শয্যাশায়ী। মা বললেন, হাঁরে সিধু তোর হয়েছে কি? কপালটা যেন ছ্যাঁকছ্যাঁক করছে। বাবা ডাক্তার ডাকালেন। নাড়ী জিব বুক পেট সব দেখে ডাক্তার বললেন, ডেঙ্গু মনে হচ্ছে, ভয়ের কারণ নেই, নড়াচড়া বন্ধ রাখবে, লিকুইড ডায়েট চলবে। এক আউন্স ক্যাস্টর অয়েল এখনই খাইয়ে দিন, আর দশ গ্রেন কুইনীন নেবুর রস দিয়ে জলে গুলে এবেলা একবার ওবেলা একবার। মুখটা তেতো রাখা দরকার।
রামদাস কাব্যসাংখ্যবেদান্তচুঞ্চু তখন ইউনিভার্সিটিতে প্রাচ্যদর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। এখন তিনি নাগপুরে আছেন। বয়স বেশী নয়, আমার চাইতে ছ—সাত বছরের বড়। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা একটু রসিক হয়ে থাকেন। রামদাসও রসিক লোক, ছাত্রদের সঙ্গে ইয়ারকি দিতেন, কিন্তু সকলেই তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করত। আমাকে তিনি বিশেষ রকম স্নেহ করতেন, কারণ বিদ্যায় আর রূপে ক্লাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলুম।
